রাজধানীর আদাবরের যে মাইন্ড এইড হাসপাতালে গত সোমবার মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম মারা গেছেন, সেই বেসরকারি হাসপাতালের মানসিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার অনুমোদন ছিল না। হাসপাতালটি মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে চলছিল। সেখানে মাদকসেবীদের মাদকসংক্রান্ত সমস্যার সেবা দেওয়ার কথা। চিকিৎসা দিতে হলে তাদের অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘হাসপাতাল-ক্লিনিক’ অনুমোদন নিতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাইন্ড এইড মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে ৩০ শয্যার মাদকাসক্ত চিকিৎসার জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন নিয়েছে। আমরা ওই প্রতিষ্ঠানকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিতে বলেছি। কিন্তু তারা সেটা করেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স ছাড়া মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। সে হিসেবে এটা অননুমোদিত হাসপাতাল। তারা মাদকাসক্ত নিরায়ম কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন নিয়েছে, কিন্তু হাসপাতালের অনুমোদন নেই এবং তারা চিকিৎসা দিতে পারে না।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাইন্ড এইড হাসপাতালের বয়স খুব বেশি না। তারা অধিদপ্তরের কাছে মানসিক হাসপাতালের অনুমোদনের জন্য যে আবেদন করেছে এবং সেখানে যে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে, সে অনুযায়ী ২০১৮-১৯ সাল থেকে চালু হয়েছে। মাদক নিরায়ম কেন্দ্রের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বলা আছে, এ ধরনের কেন্দ্র শুধু মাদক সম্পর্কিত চিকিৎসা দিতে পারবে। কিন্তু মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে পারবে না। এর আগেও একবার এই হাসপাতালকে আমরা বলেছিলাম, লাইসেন্স নেওয়ার কথা। কিন্তু তারা তখন আগ্রহ দেখায়নি। তারা বলেছে, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিয়েই সেবা দেবে। পরে সরকার অননুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিলে তারা সম্প্রতি নামমাত্র আবেদন করে। পরে অনুমোদনের ব্যাপারে আর কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীতে ১৫টির মতো মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক বা হাসপাতালের অনুমোদন আছে। তার মধ্যে মাইন্ড এইড নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।
অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান মানসিক রোগীর চিকিৎসা করে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন দেয় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ওদের চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু তারা দিচ্ছে। এটা অবৈধ। বেসরকারি ক্লিনিক বলতে বোঝায়, যেখানে রোগী ভর্তি হয়, চিকিৎসা দেওয়া হয়, যেখানে রাতে রোগী থাকে, রোগীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, প্রয়োজনে অপারেশন করা হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমাদের লাইসেন্স নিতে হয়। লাইসেন্স না নিয়ে যদি কেউ চালায়, সেটা অবৈধ বলে গণ্য হবে। মানসিক চিকিৎসা ও সাধারণ ক্লিনিকের ধরন একই। পার্থক্য হলো মানসিক হাসপাতালে শুধু মানসিক রোগীদের চিকিৎসা হয় ও সেখানে মানসিক রোগের চিকিৎসক থাকে।
এই কর্মকর্তা বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্র ওখানেও চিকিৎসক দরকার। কারণ একজন মাদকসেবনকারীর মাদক নেওয়ার কারণে তার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটার চিকিৎসা দিতে হয় এবং তাকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হয়। আর যখন একজন মাদকসেবীকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হয়, তখন তার শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। সেটার জন্য চিকিৎসা দিতে হয়। সুতরাং নিরায়ম কেন্দ্রকেও চিকিৎসা দিতে হয়। সে কারণেই তাদেরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন দরকার।
মাইন্ড এইড হাসপাতালের অনুমোদন প্রসঙ্গে জানতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে অধিদপ্তরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শাখার পরিচালকের নম্বরে যোগাযোগ করে জানা যায়, এই পদটি অনেক দিন ধরে শূন্য রয়েছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একজন উপ-পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের অধিদপ্তরের নিজস্ব নিয়মকানুন ও শর্ত পূরণ করলেই আমরা অনুমোদন দিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আছে কি না তা দেখা হয় না। তাদের সঙ্গে আমাদের অনুমোদন দেওয়া বা না দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
