১০ নভেম্বর চার্লস জর্জ রেইনিয়ার কার্ভার মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৪।
জানি খবরটা শোনার পর, (অবশ্য যদি শুনে থাকেন) মন খারাপের পরিবর্তে একরাশ কৌতূহল আপনাকে ঘিরে ধরবে...জানতে চাইবেন কার্ভার কে? কী করতেন? ফুটবলের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? তাই রহস্য না বাড়িয়ে রয়্যাল ডাচ ফুটবল ফেডারেশনের বিবৃতি তুলে দিচ্ছি, ‘রোগভোগের পর মঙ্গলবার বিকেলে কার্ভার মারা গেছেন। সত্তর-আশির দশকে আর কোনো ডাচ রেফারি তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করেননি।’ খুব সত্যি কথা, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটাই তিনি খেলিয়েছিলেন। ‘৮২-র বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফ্রান্স-পশ্চিম জার্মানি ম্যাচের রেফারি ছিলেন কার্ভার। এমন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন যে, ৩৮ বছর পরেও লোকে ভুলতে পারেনি। ফরাসিরা সম্ভবত ক্ষমাও করতে পারেনি।
এমনিতে বিরাশির বিশ্বকাপ নানাভাবে কলঙ্কিত করেছিল পশ্চিম জার্মানি। আলজেরিয়াকে বিদায় করতে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে তারা পাতানো ম্যাচ খেলেছিল। ফুটবল মাঠে সেই প্রকাশ্য নোংরামি সহ্য করতে না পেরে টিভি বন্ধ করেন অস্ট্রিয়ার সমর্থকরাও। স্প্যানিশরা গ্যালারি থেকে চেঁচিয়ে বলেছিল, ফিউরা..ফিউরা। মানে দূর হ ! নোংরামি দেখে পশ্চিম জার্মানির ধারাভাষ্যকার এবেরহার্ড স্ট্যানজেক তো কেঁদেই ফেলেছিলেন। পরে বলেন, ‘মাঠে যা হয়েছে তা চূড়ান্ত নোংরামি। ফুটবলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’
ওভাবে নোংরামি করে সেমিফাইনালে উঠেছিলেন রুমেনিগেরা। মুখোমুখি হয়েছিলেন ফ্রান্সের। হিদেলগা’র কোচিংয়ে ফরাসি ফুটবলের মধ্য মাঠে তখন ফুল ফোটাচ্ছেন প্লাতিনি, তিগানা, জেনঝিনি, জিরেসরা। এমনই তাদের মহিমা যে, লোকে জিকো-সক্রেটিস-ফ্যালকাওদেরও মনে রাখতে চায়নি।
সেমিফাইনাল হয়েছিল ১৯৮২ সালের ৮ জুলাই। স্পেনের সেভিয়াতে সেদিন ভ্যাপসা গরম। ম্যাচ শুরু হয় রাত ৯টায়। অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি যখন ম্যাচ রেফারি চার্লস কার্ভারের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন তখনো জানেন না ঐ লোকটাই ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেবে। সেমিফাইনালে লাইন্সম্যানের দায়িত্বে ছিলেন সুইস ব্রুনো গ্যালের আর স্কটিশ রবার্ট ভ্যালেন্টাইন।
পশ্চিম জার্মানির হয়ে ১৭ মিনিটে প্রথম গোলটি করেন মিচেল লিবারস্কি। ২৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন প্লাতিনি। ম্যাচে তখন ১-১ সমতা। প্লাতিনি মাঝমাঠের ডানদিক থেকে জার্মান রক্ষণের ফাঁকা জায়গায় বল রাখেন। চোখের পলকে বাতিস্তঁ পৌঁছে গিয়েছিলেন জায়গামতো। জার্মান গোলরক্ষক টনি শুমাখারও ততক্ষণে পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। যদিও বল নয়, শুমাখারের লক্ষ্য ছিল বাতিস্তঁ’র মাথা। এত জোরে হাত দিয়ে পাঞ্চ করেছিলেন যে ফরাসি ডিফেন্ডার তিন মিনিট মাঠে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন। ডাচ রেফারি কার্ভার নাকি দেখতে পাননি। পরে বলেছিলেন, ‘ঘটনাটা আমার চোখ এড়িয়ে যায়। দু’দিন পর টিভি রিপ্লে দেখে বুঝেছিলাম। ফিফা আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি। (পরবর্তী খেলা থেকে) বাদও দেয়নি।’ ডাচ রেফারির কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সংজ্ঞাহীন বাতিস্তঁকে স্ট্রেচারে নিয়ে যাওয়ার সময় প্লাতিনি যখন বুকে ক্রসচিহ্ন আঁকছিলেন তখনো কি তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল? তিনি লাইন্সম্যানের পরামর্শই বা নেননি কেন? কার্ভারের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের কারণে নিশ্চিত পেনাল্টি বঞ্চিত হয়েছিল ফ্রান্স। লাল কার্ড থেকে বেঁচেছিলেন শুমাখার।
ওদিকে হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর বাতিস্তঁ জানতে পারেন তার দুটি দাঁত নেই। শুমাখার খবর শুনে বলেছিলেন, ‘ও, এই ব্যাপার। তাহলে সেই দাঁত দুটি বাঁধানোর খরচ না হয় আমিই দিয়ে দেব।’ এই নিষ্ঠুর মন্তব্য শোনার পর জার্মান সমর্থকরাও হ্যারল্ড ‘টনি’ শুমাখারকে ডাকতেন হ্যারল্ড ‘খুনি’ শুমাখার নামে।
যা হোক অতিরিক্ত সময়ে আরও দুই গোল করেছিল ফ্রান্স। রুমেনিগের পায়ের জাদু আর ফিশারের ব্যাকভলিতে ৩-৩ করে পশ্চিম জার্মানি। এরপর টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় ফরাসিরা। যা দেখে প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ব্রায়ান গ্ল্যানভিল ফুটবলকে বলেছিলেন ‘অযৌক্তিক, ক্ষমাহীন।’ আর হিদালগো বলেন, ‘আমাদের নৃশংসভাবে বিদায় করা হয়েছে।’ ‘উই হ্যাভ বিন এলিমিনেটেড ব্রুটালি...ঠিক এই বাক্যটাই ব্যবহার করেছিলেন ফরাসি কোচ। যদিও প্লাতিনি ফুটবল সৌন্দর্যের কথা মাথায় রেখে হিদালগোর মতো কঠোর শব্দ প্রয়োগ করতে চাননি। বলেছিলেন, ‘আমার খেলা সেরা ম্যাচ। জীবনের সব আবেগ যেন সেই দুটি ঘণ্টায় নিবদ্ধ হয়েছিল। আর কোনো ফিল্মে কিংবা ম্যাচে ওরকম বিতর্ক এবং আবেগের সম্মিলন ঘটবে না। পরিপূর্ণ এক ফুটবল ম্যাচ। অবিশ্বাস্যও।’
