ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১০৫ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি নতুন চাকরির সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গতকাল পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড আয়োজিত গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, পুরুষ উদ্যোক্তাদের চেয়ে মহিলা মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্যভাবে (১৪৬ দশমিক ২ শতাংশ) বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
‘কর্মসংস্থান তৈরিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভূমিকা’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপনা করেন পিআরআইয়ের গবেষক ড. বজলুল হক। আইডিএলসির ৭৮২ জন এসএমই উদ্যোক্তার ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ব্যবসায়ের ধরনের মধ্যে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা বিগত পাঁচ বছরে ১৭৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থান তৈরিও চোখে পড়ার মতো, যা গত পাঁচ বছরে ১৩১ শতাংশ বেড়েছে।
এসএমই খাতে ঋণ সহায়তা ও কর্মসংস্থানে এসএমই খাতের অবদান নিয়ে এক জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিতে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদান বিবেচনায় এই খাতে বিনিয়োগে আরও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এসএমই খাতকে সব সময় ঋণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হলেও অন্যান্য শিল্পের তুলনায় এই খাত থেকে ব্যাংকঋণ খুব সফলভাবে ফিরে আসছে বলেও জানান তিনি।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, জরিপে দেখা গেল এসএমই খাতে জব ক্রিয়েশন ভালো, গ্রোথ রেট ভালো এবং ঋণ পরিশোধের হার ভালো। তাই এসএমই খাতের অর্থায়নের দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে। এই খাতে বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জটা বোঝা যায় যখন দেখা যায় ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থ দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। মাত্র এক থেকে দেড় শতাংশ প্রতিষ্ঠান শুরুতেই বিনিয়োগ পেয়েছিল। এটা নিয়ে পলিসি মেকারকে ভাবতে হবে। একজন উদ্যোক্তাকে সব সময় নিজের টাকা দিয়ে শুরু করতে হবে, ব্যাপারটি তা নয়। এর উল্টো চিত্রটা দেখতে পারলে খুশি হতাম বলে জানান মনসুর।
এসএমই খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৯৯ শতাংশই এসএমই খাতের। কাজেই এদের বাদ দিয়ে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও অর্থনীতি চিন্তা করা সম্ভব নয়। এই খাত থেকেই দুই কোটির ওপর কর্মসংস্থান হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে কৃষির পরেই এসএমইর অবস্থান। ওই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা অনেক বড় একটা খাত।
জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে অধ্যাপক বজলুল হক খন্দকার বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে গড় বিনিয়োগ ছিল ৩ কোটি টাকার মতো। বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ৬ কোটি টাকা। ১৯৯০ থেকে ২০০০, ২০০৬ কিংবা ২০১৬ সালের মধ্যে এরা ব্যবসা শুরু করেছিল। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্যই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির ঋণ নিয়েছিল।
জরিপে দেখা যায়, ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১০৫ দশমিক ৭ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০০০ সালে শুরু করা প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৩৭ শতাংশ। তাদের বার্ষিক গড় কর্মসংস্থান ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৭৪ শতাংশ, শিল্পে ১৩১ শতাংশ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ৭৪ শতাংশ, কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় হয়েছে ৩০ শতাংশ। বেতনভুক্ত কর্মচারীর কর্মসংস্থান বেড়েছে ১৩৪ শতাংশ, দিনমজুরের কর্মসংস্থান হয়েছে ৯৪ শতাংশ, পারিবারিক শ্রমের কর্মসংস্থান হয়েছে ৪৬ শতাংশ। বাংলাদেশে জাতীয় কর্মসংস্থানের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশ।
বজলুল হক বলেন, বাংলাদেশে শিল্পমূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে এসএমই খাতের ভূমিকা প্রায় ৪৫ শতাংশ। শিল্পে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই খাতের ভূমিকা ৯০ শতাংশ এবং জাতীয় কর্মসংস্থানে ২৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক চিত্রও প্রায় একই ধরনের। ২০১৪-১৫ সালে আইএলওর এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে ৪-৫ কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর ৪৬ শতাংশ আছে পূর্ব এশিয়াতে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই শিল্পের অংশগ্রহণ ২২ শতাংশ। বৈশ্বিক জিডিপিতে এই খাতের ভূমিকা প্রায় ৬০ শতাংশ, কর্মসংস্থানে ভূমিকা ৫০ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার ঘটলে জাতীয় কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
চাকরির ধরনের মধ্যে সর্বাধিক বৃদ্ধির হার লক্ষ করা যায় বেতনভুক্ত চাকরির ক্ষেত্রে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শুরুর সময় থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে ১৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। একটি ইতিবাচক লক্ষণীয় পর্যবেক্ষণ হলো এই যে, এসএমই ব্যবসায়ীরা তাদের পারিবারিক কর্মীদের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বেতনভুক্ত কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছে।
আইডিএলসির সিইও আরিফ খান বলেন, ‘১৫ বছর আগে এসএমই ফাইন্যান্সিং শুরু করেছিল আইডিএলসি। তার আগে কেবল বড় করপোরেট লেবেলে ঋণ দিত আইডিএলসি। করপোরেট খাত থেকে ক্ষুদ্রঋণে যুক্ত হওয়াটা আইডিএলসির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এসএমই ফাইন্যান্সিংকে নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো। আমরা তবুও একটা ছোট টিম নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। ১৫ বছর পর দেখা যাচ্ছে আইডিএলসির ৪৬ শতাংশ ঋণই যাচ্ছে অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে।
‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নন-পারফরমিং লোন (এনপিএল) বা অলস/খারাপ ঋণের পরিমাণ ১০ শতাংশ। কিন্তু আইডিএলসির এনপিএল রয়েছে ৩ শতাংশের মধ্যে। তাহলে আমাদের দুশ্চিন্তাটি আর থাকল না। সঠিক নিয়মে কাজ করে যেতে পারলে এসএমই ফাইন্যান্সের একটা বিরাট ভবিষ্যৎ আছে বলেই মনে করি।’
গবেষণায় দেখা গেছে, সার্বিক শিল্পের শ্রমশক্তির মধ্যে ৭০ শতাংশ যুক্ত আছে ক্ষুদ্র শিল্পে। আর আইডিএলসি যখন শুরু করেছিল সেই সময় থেকে প্রায় ১৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মসংস্থানে।
ওয়েবিনারের সঞ্চালক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, আমাদের দেশে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পায়নে যেসব বাধা রয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে তেমনটি নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে এসএমই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অণু, ক্ষুদ্র ও মধ্যম আকারের শিল্পে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালে ১৩ হাজার ৯৩১টি প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তা ৮ দশমিক ৪ শতাংশ আর পুরুষ উদ্যোক্তা ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ। ঋণে সহায়তা নেওয়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাঝারি উদ্যোক্তা ৩০ শতাংশ আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ৭০ শতাংশ। ১৩ হাজার উদ্যোক্তার মধ্য থেকে ১ হাজার এসএমই উদ্যোক্তাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তার মধ্যে ৭৮২ জনের ওপর গবেষণা করা হয়।
