করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বন্ধ থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাস চলছে। দেশে বিদ্যমান সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলে তা সম্পর্কে আগে কিছুটা জানা থাকলেও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর কার্যক্রম এবারই (করোনাকালীন) দেশবাসীর নজরে আসে। তাদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়া এবং বেতন আদায়কে কেন্দ্র করে নানা রকম ঘটনা গণমাধ্যমের কল্যাণে অনেকেই এবার দেখেছে। স্কুল মালিক এবং অভিভাবক পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে, আন্দোলন করেছে, প্রেস কনফারেন্স করছে ইত্যাদি এসব ঘটনা পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখানো হয়েছে। টকশোতে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে অনেক। অবশেষে সরকার বিদেশি কারিকুলামে চলা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে বিধিনিষেধের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থাৎ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে নিয়মের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গতিশীলতা আনার জন্য সাধারণ স্কুলগুলোর মতো ম্যানেজিং কমিটি তৈরি, আয়-ব্যয়ের বিবরণী তৈরি, প্রতি অর্থবছরের শেষে হিসাব নিরীক্ষা সম্পাদন করার ওপর তৈরি রিপোর্ট নিবন্ধনকারী কর্র্তৃপক্ষের কাছে আনয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে সরকারের এটা প্রশংসনীয় কাজ যা আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিয়ে সরকারের এসব উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ ও ধন্যবাদ জানাই।
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সন্তানদের লেখাপড়া করা নিয়ে সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে? অনেকে মনে করেন, যাদের অনেক টাকা আছে কিংবা অবৈধ টাকার উৎস আছে, তারা তাদের স্ট্যাটাস বজায় রাখার জন্য সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠান। কিন্তু কথাটা মোটেও ঠিক নয়। ইউরোপ আমেরিকায় সন্তানদের ইমিগ্রেন্ট হয়ে যেতে চাইলে বাংলাদেশে ‘ঙ’ ষবাবষ ও ‘অ’ ষবাবষ করালে ঐ সমস্ত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে ও স্কলারশিপ পেতে সহজ হয়। এভাবে অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়ামে ‘অ’ ষবাবষ দিয়ে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়াশুনা করে ভালো ভালো চাকরি করছে। দেশে টাকা পাঠাচ্ছে। অবশ্য উচ্চবিত্তের শিশুদের উন্নত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবসা হিসেবে এদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের যাত্রা শুরু হলেও, বর্তমানে এসব স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী মধ্যবিত্ত পরিবারের। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সন্তানের উন্নত ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং ন্যূনতম শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পিতা-মাতারা নিজেদের অভুক্ত রেখেও সন্তানদের এসব স্কুলে ভর্তি করান। কেবল নিজেদের আর্থিক সচ্ছলতার কারণেই যে সামর্থ্যবানরা সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠান তা কিন্তু নয়। দেখা যায় যে তারা একদিকে স্কুলের চেয়ে কোচিংয়ে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা এবং দলীয় পরিচয়ে অযোগ্য লোক স্কুল কমিটিতে থাকায় দেশীয় শিক্ষার মান দিন দিন কমে যাওয়া, অন্যদিকে পছন্দের বাংলা মাধ্যম স্কুলে সন্তানদের ভর্তি না করতে পেরে ইংরেজি শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
দেশে বর্তমানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যার কোনো সঠিক তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সূত্র মতে, দেশে ৪ শতাধিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অধিকাংশই চলছে সরকারের নিবন্ধন ছাড়া। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড সূত্র মতে, দেশে নিবন্ধনকৃত ১১৫টি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। তারমধ্যে ১১১টি ঢাকায়, বাকি চারটির মধ্যে গাজীপুরে দুটি এবং নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জে একটি করে। আবার বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৪৫টি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থী রয়েছে সাড়ে ১১ হাজারের মতো। আবার বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৩৫০ আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন লাখ। চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইংরেজির মতো আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষ করা আজ দেশি-বিদেশি সব প্রেক্ষাপটে শুধু জরুরি নয়, আবশ্যক হয়ে পড়েছে। ইংরেজি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত ও মূল্যবান কমিউনিকেশন মাধ্যম হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই মাতৃভাষা জানার পাশাপাশি এই ভাষা জানা যেমন আশীর্বাদ তেমনি একটি মূল্যবান ব্যক্তিগত সম্পদ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল মানেই লাখ লাখ টাকার খেলা। বছর বছর ভর্তি ফি, সেশন ফি, মাসিক বেতন, স্কুলের গেট থেকে শুরু করে বুয়া, আয়া, গার্ড, ট্রান্সপোর্ট বিল, এমনকি শিক্ষকদেরও নানা রকম উপহার/বকশিশ দেওয়া শুধু বেমানান বললে ভুল হবে, এটা রীতিমতো নির্যাতন। বইয়ের ভারে ছোট ছোট বাচ্চারা কুঁজো হয়ে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়াদৌড়ি করে স্কুলে ঢুকে। অনেক ক্ষেত্রে লিফট থাকলেও তা শুধু শিক্ষকরাই ব্যবহার করেন, শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় না। উদ্বেগের বিষয়, এসব স্কুল কর্র্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, স্টেশনারি দ্রব্যাদি, স্কুল ড্রেস, পটেটো চিপস, চকলেট, আইসক্রিম ইত্যাদি নির্দিষ্ট দোকান থেকে কেনাকাটা করতে বাধ্য করে। করোনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে ক্লাস নেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ আদায় করছে পূর্ণ মাসিক বেতন। রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতোই গজিয়ে উঠছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। অথচ দেখা যাচ্ছে একটিমাত্র ভবনের কিছু অংশে স্কুল, কিছু অংশে মার্কেট কিংবা ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে। বাইরে থেকে বুঝাই যাচ্ছে না যে এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের শিক্ষানীতিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগ নেই, নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ। বলা যেতে পারে সরকার পুরোপুরি নির্বিকার। আবার সরকারি নীতিমালা না থাকায় স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে বলারও কিছু নেই। তারা চলছে তাদের মতো। ইচ্ছামতো বেতন ও সেশন ফি নির্ধারণ করছে এবং যথারীতি তা আদায়ও করছে। তোয়াক্কা করছে না কারও কথা। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে টিউশন ফি দিতে না পারায় অনলাইন ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে রাজধানীর কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বিরুদ্ধে। কিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল টিউশন ফি যথাসময়ে পরিশোধ করতে না পারায় নিয়েছে জরিমানাও। যদিও বর্তমানে টিউশন ফি ছাড়া অন্য কোনো ফি যেমন উন্নয়ন ফি, টিফিন ফি, খেলাধুলা ফি ইত্যাদি আদায় না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এভাবে টিউশন ফি আদায় করলেও শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ আছে। রাজধানীর লালমাটিয়ায় একটি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন না দেওয়ার অভিযোগ আছে। পাওনা বেতন চাওয়ায় দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। বাকি শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়েছে। এক কথায়, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে গিয়ে অভিভাবকরা যত বাধার সম্মুখীন হন না কেন, এর প্রতিকার নেই। এতকিছু সম্ভব হচ্ছে এসব স্কুলের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে।
শিক্ষাবিদদের মত, যদি আমাদের শিক্ষানীতিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবেই শিক্ষাক্ষেত্রের এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব। তাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা এবং নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা উচিত। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা সর্বোপরি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংবলিত আধুনিক পাঠ্যসূচি ইংলিশ মিডিয়ামের ক্ষেত্রেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া এবং দুর্যোগকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন এবং প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো পর্যাপ্ত তহবিল আছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে যারাই অনিয়ম করবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিভাবকদেরও সন্তানদের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিরপেক্ষ লোকদের স্কুল কমিটিতে রাখা উচিত এবং অভিজ্ঞ, দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকা বাঞ্ছনীয়। আজকের শিশুই আগামী দিনে জাতির ভবিষ্যৎ। তাই শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনোরকম ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। করোনার প্রাদুর্ভাব নিশ্চয়ই একদিন শেষ হবে এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হবে। তবে খোলার আগেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর জন্য নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ অতীব জরুরি। সর্বোপরি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কঠোর নজরদারি এবং সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করাই হবে যুক্তিসংগত।
লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
