ভক্তদের কাছে ম্যারাডোনা শুধু নায়ক নন, ফুটবলের ঈশ্বর। আর্জেন্টাইন এ মহাতারকা জীবনের সেরা সময়টি কাটিয়েছেন ইতালির নেপলস শহরে। নাপোলি ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলতে খেলতেই জড়িয়ে পড়েছিলেন অন্ধকার জগতের সঙ্গে। ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ তথ্যচিত্র অবলম্বনে লিখেছেন পরাগ মাঝি
রাত সাড়ে ৩টার ফোন কল
১৯৯১ সালে জানুয়ারি মাসের একটি রাত। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবল তারকা ম্যারাডোনা তখনো ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলির হয়ে খেলছেন। সেই রাতে মাফিয়া চক্রের সঙ্গে যুক্ত এক নারীর কাছে ফোন করে দুজন যৌনকর্মী পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন ম্যারাডোনা।
আলোচিত সেই কলটি করার সময় ম্যারাডোনা ছিলেন পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন এক মহাতারকা। চাইলেই তিনি যেখানে সেখানে যেতে পারেন না। তাকে হন্যে হয়ে অনুসরণ করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। প্রিয় নাপোলি ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন। আর মাত্রা ছাড়িয়েছিল কোকেন আসক্তি। রাত সাড়ে ৩টার সেই কলে ম্যারাডোনা যে নারীর কাছে যৌনকর্মী চেয়েছিলেন তিনি ছিলেন ক্যামোরা মাফিয়া চক্রের সদস্য।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যৌনকর্মীর অর্ডার দেওয়ার পর টেলিফোনের ওপাশে থাকা নারীটি একটি আবদার করে বসেন ম্যারাডোনার কাছে। আলাপের শেষ পর্যায়ে তিনি ম্যারাডোনাকে বলেন যে, তার ছেলে নাপোলি ফুটবল ক্লাবের এক অন্ধ সমর্থক। তাই সে তার স্বপ্নের তারকা ম্যারাডোনার সঙ্গে কথা বলতে চায়!
কথোপকথনের এ অংশটিকে ‘ট্র্যাজিক কমেডি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গত বছর এইচবিও চ্যানেলে মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্র ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’র পরিচালক আসিফ কাপাডিয়া। বলছিলেন, ‘তিনি তখন তারকাখ্যাতি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছিলেন এবং যৌনতা ও মাদকে ডুবে গিয়েছিলেন। আর এ সময়ই কি না ভোররাতে এক শিশু তাকে হেরে যাওয়া গত ম্যাচের ব্যাপারে প্রশ্ন করছিল। ম্যারাডোনার জীবনে এমনটি সত্যি সত্যিই ঘটেছিল।’
কিন্তু আসল ব্যাপার হলো ম্যারাডোনার সেই ফোন কলের সব কথাই এখন জেনে গেছে বিশ্ব। কারণ তার অগোচরে সেই ফোন কলটিতে আড়ি পেতেছিল কর্র্তৃপক্ষ। এ ঘটনার পরপরই তার বিরুদ্ধে কোকেন সংগ্রহ ও বিতরণেরও অভিযোগ আনা হয়। কোকেন বিতরণের অভিযোগ আনা হয়েছিল এজন্য যে, যৌনকর্মীদের তিনি এ মাদকটি গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সে বছরেরই এপ্রিলে একটি ডোপ টেস্টে ম্যারাডোনার রক্তে কোকেনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ অপরাধে তাকে ১৫ মাসের জন্য ফুটবল খেলায় নিষিদ্ধ করা হয়। নিষেধাজ্ঞা পেয়েই তিনি ব্যাগপত্র গুছিয়ে ইতালি থেকে নিজের দেশ আর্জেন্টিনায় চলে যান। পরে কিছুদিনের মধ্যেই আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সে নিজের ফ্ল্যাট থেকে ক্লান্ত বিধ্বস্ত ম্যারাডোনাকে প্রায় দেড় কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কাপাডিয়ার ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’
‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ তথ্যচিত্রের পরিচালক আসিফ কাপাডিয়া বলেন, ‘ম্যারাডোনা যখন প্রথম নেপলসে আসেন তখন তার চোখ ছিল উজ্জ্বল আর ছিল প্রাণখোলা হাসি।’ তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে আসিফ কাপাডিয়া ম্যারাডোনার কয়েকশ ব্যক্তিগত ও দুর্লভ ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। এছাড়া ফুটবল ঈশ্বরের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও তিনি নিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনার বিভিন্ন বক্তব্য তথ্যচিত্রটির বেশকিছু ভিডিও ফুটেজে নেপথ্য কণ্ঠ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কাপাডিয়ার মতে, মাঠের মতো মাঠের বাইরেও নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারতেন ম্যারাডোনা। আট ভাইবোন ছিল তার। ১৯৬০ সালে বুয়েনস আয়ার্সের একটি নোংরা বস্তি এলাকায় জন্মেছিলেন। খুব কম বয়সেই ফুটবলে পারদর্শিতা দেখাতে শুরু করেন। বালক ম্যারাডোনার প্রতিভা সে সময় এতটাই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছিল যে, মাঠের মধ্যে তার কলাকৌশল ক্যামেরায় ধারণ করতে শুরু করেছিলেন এক চলচ্চিত্র নির্মাতা। ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ তথ্যচিত্রে সেসব দুর্লভ ফুটেজও সংযুক্ত করেছেন আসিফ কাপাডিয়া।
নাপোলির ম্যারাডোনা
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার একটি জুনিয়র ক্লাবে যোগ দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণের সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। পরে ১৯৮১ সালে আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়র্সে যোগ দেন। পরের বছরই রেকর্ড দামে তাকে কিনে নেয় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। কিন্তু ২২ বছর বয়সে ইউরোপে পা রেখে নানা প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাকে। শুরুতেই তিনি একাধিক ইনজুরির মুখোমুখি হন। তখন থেকেই বিতর্ক তার পিছু নেয়। উদ্দাম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মেজাজ হারাতেন অল্পতেই।
১৯৮৪ সালে স্পেনের নকআউট টুর্নামেন্ট ‘কোপা দেল রে’র ফাইনালে অ্যাথলেতিক বিলবাও ফুটবল ক্লাবের মুখোমুখি হয় বার্সেলোনা। খেলার মাঝামাঝিতে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন ম্যারাডোনা। প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের মুখে হাঁটু দিয়ে সজোরে মারা ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজনকে আঘাত করেছিলেন তিনি। স্প্যানিশ রাজপরিবারের সদস্যরাও টেলিভিশনের পর্দায় খেলাটি উপভোগ করছিলেন। ম্যারাডোনার উগ্র মেজাজ তাদেরও ক্ষেপিয়ে তোলে।
স্পেনের মাঠে লজ্জাজনক সেই অধ্যায়ের পর একমাত্র ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিই ম্যারাডোনাকে কেনার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। নাপোলি তখন একটি নড়বড়ে ক্লাব। এ ক্লাবে যোগ দেওয়াকে ম্যারাডোনার অবনতি হিসেবেই দেখছিল সবাই। ১৯৮৪ সালে ইতালিয়ান মৌসুম শুরুর আগে চুক্তি স্বাক্ষরের পর নাপোলির ঘরের মাঠে ম্যারাডোনাকে স্বাগত জানায় উপস্থিত ৮০ হাজার সমর্থক।
আসিফ কাপাডিয়া বলেন, ‘ম্যারাডোনা যখন নাপোলিতে যোগ দেন তখন নেপলস ছিল ইউরোপের সবচেয়ে গরিব ও বিশৃঙ্খল এলাকা। এ শহরের বাসিন্দাদের একজন নায়কের প্রয়োজন ছিল।’
জীবনের সেরা সময়টিতে ছোটখাটো, কিন্তু ক্ষিপ্র ও শক্তিশালী পদচারণায় মাঠের মধ্যে ম্যারাডোনা যেসব নৈপুণ্য দেখাতে শুরু করেছিলেন, এমনটি পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না তখন। শিগগিরই তিনি নাপোলি ফুটবল ক্লাবকে নিজের কাঁধে তুলে নেন। শুধু ক্লাব নয়, নেপলস শহরে বসবাসকারী নাপোলিটিয়ানদেরও যেন ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। সেবার সিরি-আ লিগে আট নম্বর অবস্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে নাপোলি। কিন্তু এ ফলাফল নাপোলিটিয়ানদের কাছে ছিল আশাব্যঞ্জক। নাপোলির হয়ে প্রথম বছরেই মাঠের মধ্যে ম্যারাডোনা যেসব নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন তাতে মন ভরে যায় নাপোলিটিয়ানদের। মৌসুম শেষ করার পর এক ক্রীড়া সাংবাদিক ম্যারাডোনাকে প্রশ্ন করেন, ‘মনের ভেতরে আপনার কেমন অনুভূতি হচ্ছে?’ উত্তরে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমি অনুভব করছি নেপলস শহরের মানুষরা আমাকে ভালোবাসে।’
১৯৮৫ সালে নতুন মৌসুমের প্রথম খেলাতেই শক্তিশালী জুভেন্টাসকে হারিয়ে দেয় নাপোলি। এ বিজয় নাপোলিটিয়ানদের মধ্যে এতটাই উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয় যে, খেলার মাঠেই অন্তত পাঁচজন জ্ঞান হারান এবং দুজন হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। খেলায় একমাত্র গোলটি করেছিলেন ম্যারাডোনা। এ ম্যাচের পর নেপলসের এমন কোনো ঘর ছিল না যেখানে ম্যারাডোনার একটি ছবি টানানো নেই। খেলা শেষে এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, ‘ম্যারাডোনা, আপনি তো গোল করে অভ্যস্ত। কিন্তু জুভেন্টাসের বিপক্ষে গোলটি করে আপনি যখন নাপোলিটিয়ান সমর্থকদের উদ্দেশে দৌড়ে যাচ্ছিলেন তখন আপনি কী ভাবছিলেন? এ গোলটির রং কী?’ এ প্রশ্নে ম্যারাডোনা জবাব দেন, ‘আজকের গোলটির রং নীল। এই নীল নেপলসের মানুষের জন্য।’ সেবার তৃতীয় অবস্থানে থেকে লিগ শেষ করে নাপোলি।
সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে
এরপরই আসে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। সেবার আর্জেন্টিনার জাতীয় দল ছিল গড়পড়তা মানের। ম্যারাডোনার বয়স ততদিনে ২৬ বছর। মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দেন তিনি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে তার অসাধারণ সব আক্রমণ ও নেতৃত্ব দৃষ্টি কাড়ে সবার। ম্যারাডোনার অনেকটা একক নৈপুণ্যের ওপর ভর করে কোয়ার্টার ফাইনালও উতরে যায় আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচটিকে অনেকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন। কারণ কয়েক বছর আগেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আধিপত্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ হয়। সত্যিকারের সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে মর্মান্তিক পরাজয় বরণ করে নিতে হয়। নিহত হয় অসংখ্য আর্জেন্টাইন সৈন্য। তাই ’৮৬-এর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ম্যাচটিকে অনেকে প্রতিশোধের ম্যাচ হিসেবে আখ্যায়িত করে। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের সেই ম্যাচে ২-১ গোলে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। খেলায় দুটি গোলই করেছিলেন ম্যারাডোনা। এর মধ্যে প্রথম গোলটি ছিল সেই আলোচিত ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে করা গোল। আক্রমণের মুহূর্তে নিজের হাত দিয়ে বলটিকে এতটাই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে প্রতিপক্ষের জালে পাঠিয়েছিলেন যে, তা রেফারি ও লাইন্সম্যানদের দৃষ্টিও এড়িয়ে যায়। গোলটি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক হলেও শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনাকেই সবাই কৃতিত্ব দেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, প্রথম গোলটি করার কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঝমাঠ থেকে একা বল টেনে বেশ কয়েকজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে শুধু নয়, শতাব্দীসেরা গোলটি করেছিলেন তিনি। এ ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার মানুষের হৃদয় জয় করে রাতারাতি জাতীয় বীরে পরিণত হন। এরপর সেমিফাইনালে আবারও ম্যারাডোনা ঝলক। এবার তার নৈপুণ্যে উড়ে গেল বেলজিয়াম। ফল ২-০ এবং দুই গোলই ম্যারাডোনার। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টাইনদের মনে চিরদিনের জন্য নিজের নামটিকে খোদাই করে ফেলেন ম্যারাডোনা।
বিশ্বকাপ জয়ের পর সফলতার ধারা অব্যাহত থাকে নাপোলিতেও। ১৯৮৭ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরেই প্রথমবার শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় নাপোলি ফুটবল ক্লাব। শিরোপা জয়ের পর নাপোলিটিয়ানদের কাছে রাতারাতি দেবতায় পরিণত হন তিনি। ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ তথ্যচিত্রে সেই সময়ের একটি ফুটেজে এক নাপোলিটিয়ানকে বলতে শোনা যায় ‘ম্যারাডোনার নামে কোনো মন্দ কথা বলা মানে, আপনি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে মন্দ কথা বলেছেন।’ নাপোলিটিয়ানদের মুখে তখন একটিই গান, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘ও মাম্মা, মাম্মা, মাম্মা/ তুমি কি জানো?/ আমার হৃদয় কেন লাফাচ্ছে/ কারণ আমি ম্যারাডোনাকে দেখেছি।’
ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক ফার্নান্দো সিগোরিনি জানান, একবার রক্ত পরীক্ষা করতে গেলে হাসপাতালের এক নার্স তার শরীরের কিছুটা রক্ত একটি শিশিতে করে চুরি করে নিয়ে যান এবং এটিকে স্থানীয় একটি গির্জার মধ্যে স্থাপন করেন। নেপলসে ম্যারাডোনাকে সবাই একজন উপদেবতা হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছিল সে সময়। কিন্তু সিগোরিনি মনে করেন, এ অবস্থাটি শেষ পর্যন্ত বিরক্তির উদ্রেক করেছিল ম্যারাডোনার মধ্যে।
ট্র্যাজেডির শুরু যেভাবে
নেপলসে ম্যারাডোনার অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, অনেকে বাড়ির ভেতরে শোয়ার ঘরে মাথার ওপরে যিশুর ছবির পাশেই তার ছবি স্থাপন করেছিল। এ অবস্থায় নেপলসের কোথাও মুক্তভাবে চলাফেরা করা তার জন্য এক অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাই কুখ্যাত মাফিয়া গ্যাং ক্যামোরার এক বস ম্যারাডোনাকে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়। এ ক্যামোরা গ্যাংয়ের সাহায্যেই অন্ধকার জগতে চলাফেরা শুরু করেছিলেন ম্যারাডোনা। পরে ক্যামোরা গ্যাংয়ের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে থেকে বিভিন্ন পার্টিতে অংশগ্রহণ, মাদক সেবন চালিয়ে যেতে শুরু করেন এবং নারীদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ছোটবেলার প্রেমিকা ক্লাউদিয়াকে বিয়ে করলেও ক্রিস্টিনা সিনাগ্রা নামে এক নারীর সঙ্গেও প্রেম শুরু করেছিলেন। ক্রিস্টিনা ছিলেন তার ছোট বোনের বান্ধবী। এ প্রেমের পরিণতি হিসেবেই ১৯৮৭ সালের শুরুর দিকে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন ক্রিস্টিনা। একটি ইতালিয়ান টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে নিজের সন্তানকে ম্যারাডোনার ঔরসে জন্ম হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সত্যিটা ম্যারাডোনা জানলেও সে সময় সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করেছিলেন তিনি।
‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ তথ্যচিত্রের পরিচালক আসিফ কাপাডিয়া মনে করেন, ‘সন্তানকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই ম্যারাডোনার মিথ্যা যাত্রা শুরু হয়। সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে উঠে তিনি ভেবেছিলেন, তিনি কোনো ভুল করতে পারেন না, তার কোনো দুর্বলতা থাকতে পারে না। তাই এসব ঢাকতেই একের পর এক মিথ্যা বলতে শুরু করেছিলেন তিনি। আর এভাবেই তার অধঃপতন শুরু হয়।’
এসবের মধ্যেও মাঠে তার সফলতার ধারা অক্ষুণœ ছিল। ১৯৮৯ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস কাপ জিতে যায় নাপোলি। পরের বছর আবারও ইতালিয়ান সিরি-আ লিগ জয় করে ক্লাবটি। কিন্তু এসব অর্জনের মধ্যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ম্যারাডোনা। এ অবস্থায়ই ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেন। সেবারের বিশ্বকাপ হচ্ছিল ইতালিতেই। স্বাগতিক দল হিসেবে বিশ্বকাপ জয় করার তীব্র বাসনা ছিল ইতালিয়ানদের মধ্যে। সেমিফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল আর্জেন্টিনা। নাপোলির মাঠেই হয়েছিল খেলাটি। নিজের ক্লাবের মাঠেই দেশের হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ম্যারাডোনা। দর্শক সারিতে বসে যারা এতদিন ‘ম্যারাডোনা’ ‘ম্যারাডোনা’ বলে চিৎকার করেছে সেবার টাইব্রেকারে ইতালির বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে তাদের সবাইকে স্তব্ধ করে দেন ফুটবল ঈশ্বর। নাপোলিটিয়ানদের কাছে রাতারাতি এবার নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হন। সেই ক্ষোভ থেকেই কয়েক মাসের মধ্যেই তার ফোনে আড়ি পেতেছিল ইতালিয়ান কর্র্তৃপক্ষ এবং তার বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও সরবরাহের অভিযোগ এনেছিল।
ক্লাব ফুটবলে নিষিদ্ধ হয়ে নীরবে ইতালি ছাড়েন ম্যারাডোনা। আসিফ কাপাডিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যখন আমি নেপলসে পা রেখেছিলাম তখন ৮০ হাজার মানুষ আমাকে স্বাগত জানায়। আর নেপলস ছেড়ে আসার সময় আমি ছিলাম পুরোপুরি একা। নীরবে চলে এসেছি।’
আর্জেন্টিনায় ফিরে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হলেও ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু দুই ম্যাচ খেলেই নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ার অপরাধে বিদায় নিতে হয়েছিল তাকে।
