উদ্বোধনের দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নতুন ভবনের তেমন কোনো ব্যবহার নেই। সেখানে ওঠেনি দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। একমাত্র ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো সহযোগী সংগঠনের কার্যালয় নেই ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক ভবনটিতে। অথচ কথা ছিল রাজধানীর ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের এই কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকেই পরিচালিত হবে আওয়ামী লীগের সব ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম। সেখানে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ (উত্তর ও দক্ষিণ), ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রধান কার্যালয় থাকার কথা। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, অফিসের তত্ত্বাবধান ও সংগঠনগুলোর পছন্দ অনুযায়ী স্পেস বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দেওয়ায় কালক্ষেপণ হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ভাড়ায় থাকা ভবনের ভাড়ার টাকা জোগানোর নামে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে এমন কারণেও এক নেতা নতুন ভবনে উঠতে অনীহা দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নতুন ১০তলা ভবনটি চালু হয় ২০১৮ সালের ২৩ জুন দলের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে। দেশের সর্বাধুনিক রাজনৈতিক এই কার্যালয়ে রয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বসার জন্যও কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। নতুন ভবন উদ্বোধনের পর আওয়ামী লীগের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম এ কার্যালয় থেকেই চলবে বলে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভবনটি ব্যবহারের সুযোগ হয়নি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর। চাবিও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি কাউকে। গত দুই বছরে হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়েছে সেখানে। কেন্দ্রীয় নেতারাও বেশিরভাগই বসেন ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কার্যালয় অথবা নিজ নিজ বাসভবনে। আবার কেউ কেউ বসেন ধানম-িতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের বড় ভবন থাকলেও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সবগুলো সংগঠনের কার্যালয় ভাড়া ভবনেই চলছে। সুদৃশ্য কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবনের ঠিক উল্টোপাশের ১৯ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর জরাজীর্ণ একটি ভবনে গাদাগাদি করে অফিস করে ক্ষমতাসীন দলটির অন্যতম সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া সহযোগী সংগঠনের সবগুলো কার্যালয় জরাজীর্ণ ওই ভবনেই। পৌনে ১ লাখ টাকার ভাড়া জোগাড় করতে হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বকে। ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউকে আধুনিক কার্যালয় বা ভবন হিসেবে বলা হলেও ভাড়া কার্যালয়ে চলা সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া নেই। ফটোকপি করা ও প্রেস রিলিজ পাঠানো হয় বিভিন্ন দোকান থেকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর পাঁচতলা ‘ঢাকা হাউজ’ ভবনটি শুধু জরাজীর্ণই নয়, ঢোকার পথ অমাবস্যার অন্ধকারের মতোই। প্রবেশপথে রয়েছে ফুটপাতের হকারদের গাদাগাদি। ধাক্কাধাক্কি ছাড়া কোনো নেতাকর্মীর ভাড়া ভবনের ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই। পুরনো এই ভবনে ঢুকতেই প্রস্রাবের দুর্গন্ধ যে কারও মেজাজকে খিটখিটে করে তুলবে। এই ভবনে ক্ষমতাসীন দলের কোনো সংগঠনের কার্যালয় থাকতে পারে তা যেকোনো মানুষের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। ভাড়া নেওয়া এই ভবনে ঢুকলে এটিকে প্রথম দেখায় শৌচাগার হিসেবেই মনে হবে সবার। রাস্তার ওপারেই নিজেদের সুপরিসর দলীয় ভবন, তারপরও কেন ভাড়ায় থাকতে হবে ক্ষমতাসীন দলের দুটি ইউনিট ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে, এই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছেই।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালের শেষের দিকে মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মুরাদকে নতুন ভবনে তার ইউনিটের কার্যালয়ের জন্য চাবি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন তিনি ভাড়া ভবনেই থাকার আগ্রহ পোষণ করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, দলীয় কার্যালয় ভাড়া বাবদ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন ক্লাব থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা তুলতেন মুরাদ। নতুন অফিসে চলে গেলে সেই চাঁদার টাকা নিজের পকেটে ঢুকবে না বলে নতুন ভবনে কার্যালয় নেওয়ার ব্যাপারে অনীহা ছিল তার। ভবনের ভাড়া বাবদ ভবনমালিককে দেওয়া হতো ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে মুরাদ চাঁদা আদায় করতেন পাঁচ লাখ টাকারও বেশি। গত সম্মেলনে মুরাদ দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কমিটি থেকে বাদ পড়ে যান। নেতৃত্বে আসেন নতুন দুই নেতা আবু আহম্মেদ মান্নাফি ও হুমায়ুন কবির। এখন ভাড়ার টাকা গুনতে হচ্ছে নতুন এই দুই নেতাকে। কারণ করোনা পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলের ক্লাবগুলো বন্ধ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি যখন নেতৃত্বে ছিলাম, তখন ভবনটি উদ্বোধন হলেও সম্পূর্ণ কাজ শেষ হয়নি। তাই একটি ডিড করে ১৯ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর একটি ভবনে আমরাসহ অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যালয় করি। এসব অফিস ভাড়ায় চলে। এখন পর্যন্ত নতুন অফিসে না যাওয়ার কারণ আমার জানা নেই।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তররেক বলেন, ‘ভাড়া ভবনের অফিসে কাজ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রিতভাবে পালন করতে হয়। নেতারা এলে ভবনের ছোট্ট একটি রুমে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকেরও বসার মতো পরিস্থিতি থাকে না। অথচ রাস্তার ঠিক উল্টোপাশেই আমাদের নতুন ভবন, তবুও কষ্ট করতে হচ্ছে আমাদের।’
ক্ষমতাসীন দলের একই ইউনিটের আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুরাদের সময়ে চাঁদাবাজি করে এই ভবনের সবগুলো রাজনৈতিক কার্যালয়ের ভাড়া তিনিই দিতেন। এখন মুরাদও নেই, তার চাঁদাবাজিও নেই। তবু ভবনের সবগুলো অফিসের ভাড়া গুনতে হয় নতুন নেতৃত্বকে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আহম্মেদ মান্নাফি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাড়া করা অফিসে রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পন্ন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অফিস স্থানান্তর করা জরুরি। আশা করছি দ্রুতই যাব নতুন অফিসে।’
ভাড়া ভবনের অফিসে সাংগঠনিক কাজ চালাতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্বেচ্চাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাড়া অফিসে কাজ করতে ভীষণ সমস্যা হয়। নতুন অফিসে কার্যালয় দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলাম। জবাবে তিনি বলেন, বরাদ্দ দিব, কিন্তু তোমরা একটু পরিষ্কার রেখো। দ্রুততম সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে আশা করছি।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও বলছেন, দ্রুতই দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর ঠাঁই হবে নতুন ভবনে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ঠিকানা ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। আমাদের সব কার্যক্রম চলে ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ কার্যালয় থেকে। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংগঠনকে কার্যালয় বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নতুন ভবনে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যালয় স্থাপনে কালক্ষেপণের কারণ জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো অফিস কেন বরাদ্দ হয়নি, সে ব্যাপারে আমার জানা নেই।’
সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকও বলেছেন প্রায় একই কথা।
৯৯ বছরের জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের জন্য ১০তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল। ভবনে প্রবেশ করেই হাতের বামে রয়েছে অভ্যর্থনা ডেস্ক। সিঁড়ির দুপাশে দুটি লিফট রয়েছে বহুতল এই ভবনে। ভবনের বেজমেন্ট ও প্রথম তলায় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ভবনের তৃতীয় তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোর ৪ হাজার ১০০ বর্গফুট এবং চতুর্থ তলা থেকে প্রতিটি ফ্লোর ৩ হাজার ১০০ বর্গফুটের। বুলেটপ্রুফ নবম তলায় আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়। অষ্টম তলায় সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয়। তৃতীয় তলার সামনের অংশ ‘ওপেন স্কাই টেরেস’। এখানে কৃত্রিম বাগানের ফাঁকে ফাঁকে চেয়ার-টেবিল দিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ফ্লোরে ২৪০ জন বসার ব্যবস্থা রয়েছে। দশ তলায় রয়েছে ক্যাফেটেরিয়া। দ্বিতীয় তলায় ৩৫০ জনের বসার ব্যবস্থা সম্পন্ন কনফারেন্স রুম রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফ্লোরে রয়েছে সাধারণ কার্যালয়, ডিজিটাল লাইব্রেরি, মিডিয়া রুম, বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্য কক্ষ রাখা হয়েছে।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা হয়। এর আগে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাশ লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে বেশ কয়েকবার ঠিকানা বদল হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের। ১৯৫৩ সাল থেকে ৯ কানকুন বাড়ি লেনে অস্থায়ী একটি কার্যালয় ব্যবহার করা হতো। ১৯৫৬ সালে পুরান ঢাকার ৫৬ সিমসন রোডে আওয়ামী লীগের কার্যালয় হয়। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার পর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৯১ নবাবপুর রোডে আওয়ামী লীগের কার্যালয় নেন। এর কিছুদিন পর অস্থায়ীভাবে সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলি এবং পরে পুরানা পল্টনে দুটি স্থানে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল।
