সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ‘রাজউক’-এর কর্মকা-ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে সংস্থাটির বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প নিয়ে। যদিও রাজধানীর নগরায়ণ পরিকল্পনা, নীতিমালা তৈরি এবং সে অনুযায়ী বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করাই রাজউকের মূল কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু বিগত দেড়-দুই দশকে বেশ কিছু আবাসন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, জালিয়াতি এবং সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা ক্ষতিগ্রস্ত আদিনিবাসীদের যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া নিয়ে দফায় দফায় আলোচনায় এসেছে রাজউক। সর্বশেষ রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্পের দুই শতাধিক প্লট দখলকারী ‘গোল্ডেন মনির’ নামে এক ব্যক্তির নাটকীয় উত্থানের সূত্র ধরে আবারও রাজউকের প্লট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে। জনমনে প্রশ্ন ওঠে যে, একজন মনিরই যদি অনিয়ম-জালিয়াতির মাধ্যমে দুই শতাধিক প্লটের মালিক বনে যায়, তাহলে রাজউকের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পগুলোতে প্লট বরাদ্দে কতটা অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা আছে বিভিন্ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত আদিনিবাসীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগও। এরই মধ্যে রাজউক মালিকানাধীন সব ধরনের প্রকল্পের প্লট-সংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)।
বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘রাজউক প্লটের হিসাব চেয়েছে পিএমও’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএমও’র নির্দেশনার পর রাজউক কর্তৃপক্ষ পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প, উত্তরা-তৃতীয় পর্ব আবাসিক প্রকল্প, ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পসহ বারিধারা, গুলশান, বনানী ও অন্যান্য এলাকার মোট প্লট, বরাদ্দকৃত ও খালি প্লটের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বরাদ্দকৃত প্লটের সংখ্যাসহ বিস্তারিত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। হঠাৎ করে এ ধরনের তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া আলাদা গুরুত্ব বহন করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা। তারা জানান, গোল্ডেন মনিরের নামে দুই শতাধিক প্লট থাকার বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি সরকার। এ জন্যই প্লট-সংক্রান্ত সব ধরনের তথ্য চাওয়া হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পসহ কয়েকটি প্রকল্পে অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই প্লট পাননি। তারা প্রকল্প এলাকায় বাড়িঘরসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করে রেখেছেন। এসব স্থাপনার কারণে দুই দশকের বেশি সময় পার হলেও পূর্বাচল প্রকল্প শেষ করতে পারেনি রাজউক।
রাজউকের অন্যতম আলোচিত প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহর। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী এ প্রকল্পে ৩ কাঠা, ৫ কাঠা, সাড়ে ৭ কাঠা, ১০ কাঠা আয়তনের সব প্লট মিলিয়ে এ প্রকল্পের মোট ২৫ হাজার ১৬টি প্লটের মধ্যে ২৪ হাজার ৮৪২টি বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। ‘উত্তরা-তৃতীয় পর্ব’ আবাসিক প্রকল্পে মোট প্লটের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৪৪টি। এর মধ্যে ৩ কাঠা আয়তনের আবাসিক প্লট ৬ হাজার ৯২৪টি, ৫ কাঠা আয়তনের ১ হাজার ৪৭০টি, ১ বিঘা আয়তনের বাণিজ্যিক প্লট ২২টি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্লট ১০৮টি। রাজউকের আরেকটি আলোচিত প্রকল্প ঝিলমিল আবাসিক। সংস্থাটি বলছে এই প্রকল্পে মোট ৪৮টি প্লট খালি রয়েছে। এর মধ্যে আড়াই কাঠা আয়তনের ২৭, ৩ কাঠা আয়তনের ৭টি ও ৫ কাঠা আয়তনের ১৪টি প্লট রয়েছে। এর বাইরে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী সমমর্যাদার ও সংসদ সদস্যদের জন্য আরও ১৯টি প্লট সংরক্ষিত রয়েছে। অন্যদিকে, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের গাজীপুর অংশে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে যথাযথ নিয়মে আবেদন পড়েছে ১ হাজার ৪৭০টি। নারায়ণগঞ্জ অংশে মোট ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনের সংখ্যা ২২৪টি হলেও যাচাই-বাছাই করে রাজউক ১৮১ জনকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত সনদ’ দিয়েছে। গাজীপুরের আরেক অংশে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ৯৫০ জনের তালিকা চূড়ান্ত করেছে রাজউক। আর ‘ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প’টিতে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এমন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় ২০০১ সালের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২৫ জন এবং ২০১১ সালে আরও ২১০ জনকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত সনদ’ দিয়েছে রাজউক। এছাড়া ‘উত্তরা-তৃতীয় পর্ব’ প্রকল্পে ২ হাজার ১৯৯টি প্লট ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে সনদ পাওয়া আবেদনকারীদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে রাউজকের আবাসন প্রকল্প ও প্লট বরাদ্দের মধ্য দিয়ে ওইসব এলাকার আদিনিবাসীরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি দখল করে শহর বানানো এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই বরাদ্দ পান বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবানরা। অন্যদিকে প্রকৃত আদিনিবাসীরা ক্ষতিপূরণের টাকা এবং প্লটের বরাদ্দের জন্য বছরের পর বছর ঘুরেও কোনো সুরাহা পান না। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এক সভায় বলেন ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসেই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্লট বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় রাজউকের প্লট বরাদ্দে সব ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতি তদন্ত এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
