টিফিন বক্সে পাচার ২ কোটি টাকা!

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:১৮ এএম

অষ্টম শ্রেণি পাস জাকির হোসেন। নরসিংদীর পলাশের ঘোড়াশালে বিদ্যুৎমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করছিল। ১৬-১৭ বছরের কিশোর জাকিরকে দেখে মায়া হয় রাজধানী ঢাকার ঠিকাদার আরশাদ আলীর। তাকে ঢাকায় এনে নিজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে সাইট সুপারভাইজারের চাকরি দেন আরশাদ। ধীরে ধীরে খুবই বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে জাকির। একপর্যায়ে আরশাদের মূল প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলী অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজার (ক্যাশ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় জাকিরকে। প্রথম কয়েক বছর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দায়িত্ব পালনও করে। এতে জাকিরের প্রতি আস্থা আরও বেড়ে যায় আরশাদের। আর এরপর থেকেই সুযোগ বুঝে প্রতিষ্ঠানের টাকা সরানো শুরু করে দেয় জাকির। অফিস থেকে স্ত্রী ও ভাতিজার মাধ্যমে টিফিন ক্যারিয়ারে করে নগদ টাকা পাচার করতে থাকে। এভাবে প্রায় দুই কোটি টাকা পাচার করেন সে। তবে কথায় আছে চোরের দশদিন তো গেরস্তের একদিন। তাই এক দিন ঠিকই মালিকের হাতে ধরা পড়ে জাকির।

তবে সেদিন নিজেকে বাঁচাতে উল্টো নিজেই অফিসের টাকার হদিস পাচ্ছে না জানিয়ে থানায় মামলা করে জাকির। এরপর টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জাকিরের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান মালিক আরশাদ মামলা করলেও ভুয়া আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনও নিয়ে ফেলে প্রতারক জাকির।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ৬ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় জাকির হোসেন। ৭ নভেম্বর তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আব্বাস উদ্দিন। শুনানি শেষে আদালত তার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্বাস উদ্দিন জানান, রিমান্ডে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করেছে জাকির। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মোশারেফ হোসেন বাদী হয়ে গত ১২ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর আগেই সে ঢাকার বাসা ছেড়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে সপরিবারে আত্মগোপন করে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে জাকির। প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও সে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। জানায়, টাকা আত্মসাতের মামলায় জামিনে আছে। এ সংক্রান্ত জামিননামা এবং আইনজীবীর দেওয়া সনদও দেখায় পুলিশকে। পরে যাচাই করে দেখা যায় এর সবই ছিল ভুয়া। জাকির একটি চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে ভুয়া আইনজীবীর সনদ ও জামিননামা নিয়েছে। ওই চক্রের কয়েকজন সদস্যের নাম জানা গেছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ কর্মকর্তা আব্বাস উদ্দিন আরও জানান, ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৮৬ লাখ ১৫ হাজার ২৮৬ টাকা আত্মসাৎ করেছে জাকির। তার মধ্যে ভাউচারের মাধ্যমে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০ টাকা হাতিয়েছে। বাকি টাকা অফিসের আলমারি থেকে চুরি করেছে। আর কেউ যাতে সন্দেহ করতে না পারেন সেজন্য জাকির খাবারের টিফিন বক্সের মাধ্যমে টাকাগুলো অন্যত্র সরানোর কাজ শেষ করে। তাতে সহায়তা করে তার স্ত্রী ও ভাতিজা। তাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, জাকির হোসেন ১৫-১৬ বছর আগে মেসার্স আলী অ্যান্ড কোম্পানিতে সাইট সুপারভাইজার হিসেবে যোগদান করে। নিজের কর্মদক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে চাকরিতে যোগদানের আট বছর পর তাকে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে সে ক্যাশ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টের দায়িত্বে ছিল। প্রতিষ্ঠানের সব নগদ অর্থ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব তার হাতেই ন্যস্ত ছিল। কয়েক বছর অডিটে সব নগদ অর্থ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সঠিক পাওয়া যায়। এতে তার ওপর আস্থা আরও বেড়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরশাদ আলী তার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেন। আর সেই কারণে ২০১৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ এবং আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব যাচাই-বাছাই করেনি মালিকপক্ষ। চলতি বছর ১ সেপ্টেম্বর থেকে জাকির অফিসে অনিয়মিত হতে শুরু করে। তার মধ্যে কাজের প্রতি অনীহা প্রকাশ পায়। গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। এই প্রেক্ষাপটে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরশাদ আলী ম্যানেজার মোশারেফ হোসেন ও মুনির মাহমুদকে ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। এতে ব্যাপক গরমিল পরিলক্ষিত হয়। হিসাবে দেখা গেছে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৪৪টি ভাউচারে ৬২ লাখ ৮৯৫ হাজার ৯৮০ টাকা, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ওই বছরের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৬৪১টি ভাউচারে ৭৯ লাখ ৭২ হাজার ৪২০ টাকা, ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৩টি ভাউচারে ১৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে জাকির। এছাড়া কোম্পানির বিভিন্ন সাইটের খরচ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানোর জন্য তার কাছে ২৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮৬ টাকাও ছিল। গত ২৪ সেপ্টেম্বর অফিসের আলমারি থেকে ওই টাকা নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে অফিস ত্যাগ করে। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

মামলার বাদী মোশারেফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাকির অফিসে থাকাকালে তার স্ত্রী লিলি বেগম এবং ভাতিজা আবু বক্কর মাঝেমধ্যেই টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে আসত। খাবার শেষে খালি টিফিন ক্যারিয়ারের ভেতর লিলি ও আবু বকরের মাধ্যমে টাকা বাসায় পাচার করত জাকির।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অফিসের নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন সাইট পরিচালনার হিসাব দুই জায়গায় রাখা হতো। একটি হিসাব ডায়েরিতে লিখে রাখা হতো। আরেকটি হিসাব ভাউচারের মাধ্যমে থাকত। ভাউচার এবং ডায়েরি দুটিই থাকত জাকিরের নিয়ন্ত্রণে। হিসাব যাচাইকালে দেখা যায়, ডায়েরির সব হিসাব ঠিক আছে। কিন্তু ভাউচার করার সময় সে নির্ধারিত অঙ্কের আগে একটি সংখ্যা বসিয়ে দিত। যেমন প্রকৃত খরচ ১০ হাজার হলে এর আগে একটি এক বা দুই বসিয়ে ফেলত। এই একটি সংখ্যার কারণেই বিল ১০ হাজারের জায়গায় ১ বা ২ লাখ হয়ে যেত। এভাবে বাড়তি টাকা সে আত্মসাৎ করত।’

মেসার্স আলী অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরশাদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজের ছেলেদের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতাম জাকিরকে। ছেলেদের কোনো টাকার দরকার হলে আমি সরাসরি তাদের কাছে দিতাম না। জাকিরের কাছে দিতাম। তারা জাকিরের কাছ থেকেই টাকা নিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকলেও তাকে বিদ্যুৎমিস্ত্রির হেলপার থেকে ম্যানেজার বানিয়েছি। আমি ও আমার স্ত্রী মিলে মেয়ে দেখে তাকে বিয়ে করিয়েছি। জাকির যে আমার সঙ্গে এত বড় প্রতারণা করবে তা বুঝতেই পারিনি। জাকির গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমার স্ত্রী থানায় গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেছে। সে আমাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছে। তাকে আমি ক্ষমা করতে পারব না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত