বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন বদরুদ্দীন উমর

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:২৮ পিএম

বদরুদ্দীন উমরের জন্ম ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমান শহরে। ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর। বাবা আবুল হাশিম ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা। মুসলিম লীগের হলেও  আবুল হাশিম ছিলেন একজন সাম্যবাদী—পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী ছিলেন। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। উমর ১৯৪৮ সালে বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। দর্শন বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৫৫ সালে। ১৯৬১ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.পি.ই ডিগ্রি লাভ করেন।

প্রথমে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। বদরুদ্দীন উমর ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু হয় তারই হাত ধরে। ১৯৬৮তে পদত্যাগ করেন। তিনি সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ছিলেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের। তিনি সভাপতি আছেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের এবং বাংলাদেশ লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে 'সংস্কৃতি' নামে একটি রাজনৈতিক সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। তিনি ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। তাকে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি অনুষ্ঠেয় বিশেষ কংগ্রেসের প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়।

বাংলাদেশের মননশীল বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার জগতে তার অবদান অনেক। বদরুদ্দীন উমরের লেখালেখা নিয়ে আনু মুহম্মদ এক প্রবন্ধে বলেন, ‘ষাটের দশকে বদরুদ্দীন উমর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে লেখাগুলো লিখেছিলেন, তা ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের’ পথ দেখিয়েছিল। সে সময় বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজকে শিক্ষিত ও আত্মোপলব্ধিতে সক্ষম করে তুলতে, পাকিস্তানের শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকা নির্দিষ্ট করতে উমরের এই কাজগুলোর প্রভাব ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

আনু মুহম্মদ ওই প্রবন্ধে আরও বলেন, ‘শুধু লেখক, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে উমরের যে অবদান, তার তুলনাই খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু তিনি এর মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখতে পারেননি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে তাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর যে বিপ্লবী অবস্থান তৈরি হয়, তার পূর্ণতার জন্যই তিনি সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।’

ষাটের দশকের শেষ থেকে তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার কাজ শুরু করেন। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই তিনি ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ নামের বৃহৎ গবেষণা সমাপ্ত করেন। তিন খণ্ডে এটি প্রকাশিত হয় এটি। বদরুদ্দীন উমরের এই কাজ নিয়ে আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘আর কিছু দরকার নেই, উমর যদি জীবনে আর কিছু না–ও করতেন, তবু এই গ্রন্থের জন্যই তিনি বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’

সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে তার গবেষণা ও লেখার পদ্ধতি অসাধারণ। এরপরও তিনি আরও অনেক কাজ করেছেন, এখনো একই রকম সক্রিয়তায় করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তার শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত