পান বিক্রিতে আয় কমে অর্ধেক, আর্থিক সংকটে খাসিয়ারা

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৩৮ এএম

সিলেটের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বাস। প্রায় ৩০ হাজার খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস করছেন মৌলভীবাজারের ৪০টিসহ সিলেট বিভাগের ৭৫টি পুঞ্জিতে (খাসিয়া গ্রাম)।

৫ হাজারের বেশি খাসিয়া পরিবারের সবার রয়েছে এক বা একাধিক পান জুম। সে হিসেবে সিলেট বিভাগে প্রায় ৬ হাজার পান চাষের জুম রয়েছে (একেকটি জুমে ১ থেকে ৫ হাজার পানের গাছ থাকে)। বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পান বিক্রি হয় স্বাভাবিক বছরগুলোতে।

প্রতিটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা দেয় এই সব পান জুম। কিন্তু চলতি বছর করোনার কারণে পান বিক্রি কমে গেলে অর্থনৈতিকভাবে কঠিন একটি বছর কাটিয়েছেন খাসিয়া সম্প্রদায়। চলতি বছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকার আর্থিক সংকটে পড়েছেন তারা।

পানের বাজার চাঙ্গা থাকে যে সময়ে ঠিক তখন আসে লকডাউন ফলে পান বিক্রির দোকান এবং বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ৮০ শতাংশ কমে যায় পান বিক্রি। আবার যখন লকডাউন তুলে নেওয়া হয় তখন পানের উৎপাদন বেশি থাকায় কমে যায় দাম যার কারণে এই বছর চরম সংকটে পড়তে হয়েছে।

খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিলের তথ্য মতে, মৌলভীবাজারে ৪০টিসহ সিলেট বিভাগে ৭৫টি খাসিয়া পুঞ্জি (গ্রাম) রয়েছে সেখানে একেকটি পরিবারে ৫ থেকে ৬ জন বসবার করেন এবং প্রতিটি পরিবারের রয়েছে এক বা একাধিক পানের জুম। সিলেট বিভাগে প্রায় ৬ হাজার জুম রয়েছে।

প্রতিটি জুম থেকে সপ্তাহে ৩ দিন পান উত্তোলন করা হয়। তবে বিবাহসহ সামাজিক কোনো অনুষ্ঠান বা কেউ মারা গেলে বন্ধ থাকে পান উত্তোলন ও বিক্রি।  ছোট একটি জুম থেকে দিনে  ন্যূনতম ২ কুড়ি পান বিক্রির জন্য তুলা যায়। (১৪৪টি পানে এক কান্তা আর ২০ কান্তায় ১ কুড়ি)।

বাজার ভালো থাকলে এক কুড়ি পান গড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয় আবার যখন উৎপাদন বেশি থাকে তখন পানের দাম কমে ৭০০/৮০০ টাকা বিক্রি হয়।

প্রায় ৬ হাজার জুম থেকে বছরে ৫০ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়। সাধারণ মার্চ-এপ্রিল এবং মে মাসে পানের দাম বেশি থাকে তখন ৩ থেকে  ৪ হাজার টাকা কুড়ি বিক্রি হয়।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর পানের দর থাকে ২৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা কুড়ি (এ সময় পানের উৎপাদন বেশি থাকে), অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পানের দর ৬০০-৯০০ টাকা। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি সময়ে ১ থেকে আড়াই হাজার টাকা কুড়ি।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চ কোনো পান উত্তোলন হয় না। এ সময় পান চাষিরা পান জুমের গাছের পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন।

তবে প্রায় ৬ হাজার জুম থেকে বছরে কত টাকার পান বিক্রি হয় তার হিসেব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কেউ। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে ৪৫ থেকে ৫৫ কোটি টাকার পান এই সব জুম থেকে বছরে বিক্রি হয়।

কিন্তু চলতি বছরে লকডাউনের কারণে চায়ের দোকান এবং পানের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পান খাওয়া এড়িয়ে চললে ৬০ ভাগ দাম কমে যায় পানের সেই সঙ্গে অবিক্রীত থাকে ৪০ ভাগ।

image

খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি এলিসন সুঙ জানান, সাধারণ সময়ে মার্চ-এপ্রিল এবং মে মাসে ১ কুড়ি পানের দাম যেখানে ৩ থেকে ৪ হাজার থাকে সেখানে এই বছর করোনা আসার পর তা নেমে আসে ১২/১৩শ টাকায়। সেই সঙ্গে ৪০ শতাংশ পান অবিক্রীত থাকে যার কারণে এর কারণে গত বছরের তুলনায় এই বছর পান বিক্রি থেকে আয় কমেছে ৬০ শতাংশ।

আরেক পানচাষি সাজু মারছিয়াং জানান, লকডাউনের সুযোগ নিয়ে পানের ক্রেতারা পুঞ্জিতে প্রবেশ করতে না দেয়ার অজুহাতে পানের দাম কম দিয়ে থাকে তবে লকডাউন তুলে নেওয়ার পর পানের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু এখন পানের উৎপাদন বেশি সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পানের উৎপাদন বেশি থাকায় দাম কমে যায়। বর্তমানে বাজারে পানের দাম ৭০০-৮০০ টাকা কুড়ি। ফলে এ বছর খাসিয়া সম্প্রদায়ের জন্য কঠিনতম একটা বছর।

বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরামের মহাসচিব এবং লাউয়াছড়া পুঞ্জির মন্ত্রী ফিলা পতমী বলেন, এই বছর আমাদের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২৫ কোটি টাকা। খাসি সম্প্রদায়ের প্রতিটি পরিবারের একটি জুম থাকে সাধারণত এই জুমের আয় দিয়েই চলতে হয়। আগামী বছর আমরা এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব বলে প্রত্যাশা করছি।

তিনি আরও জানান, সারা দেশে প্রতিটা সেক্টর করোনার কারণে সংকটে পড়েছে আমরাও তার বাইরে নেই। সরকার অনেকের পাশে দাঁড়িয়েছে যদি সম্ভব হয় আমাদের পাশেও দাঁড়াবেন সেই প্রত্যাশা রাখছি।

এদিকে খাসি পান চাষিরা জানান, তারা নিজেরা আদি ফর্মুলায় পান চাষ করে থাকে। কৃষি বিভাগের কোন সহযোগিতা ছাড়াই তারা এ চাষাবাদ করে আসছে। পানের রোগ নির্মূল করার জন্য সরকারভাবে উদ্যোগ নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন (কুবরাজ) এর সাধারণ সম্পাদক ও কুলাউড়া মুরইছড়া পান পুঞ্জির মন্ত্রী ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, এ পান দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তাই সরকারি আর্থিক সহায়তা পেলে খাসিয়া পান চাষিরা আরও লাভবান হতে পারতেন।’

মেঘা টিলা পুঞ্জির মন্ত্রী মনিকা খংলা বলেন, পান চাষকে এখনো সরকারিভাবে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।  পান চাষকে কেন্দ্র করে আদিবাসী ছাড়া অনেক বাঙালি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন। পান চাষকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

উল্লেখ্য, পান চাষকে কেন্দ্র করে চা জনগোষ্ঠীর অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সবগুলো পুঞ্জিতে বিশেষ করে বড় পুঞ্জিতে ২০-৩০ জন কাজ করেন। প্রতিজন শ্রমিক দৈনিক পারিশ্রমিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকে। পানের চারা রোপণের ৩ বছর পর গাছ থেকে পান সংগ্রহ করা হয়। পান গাছের আলো বাতাসের জন্য বছরে একবার গাছের এক-তৃতীয়াংশ ডাল পালা ছেঁটে দেয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত