বাহিনীর কর্মকর্তা হত্যা ও ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণে তোলপাড়

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০২:৫৩ এএম

বিদায়ী বছরে দেশজুড়ে খুন, ধর্ষণ ও কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ ছিল আলোচনার তুঙ্গে। বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনা জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তার মধ্যে কক্সবাজার চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যাকান্ড সারা দেশকে থমকে দেয়। সিনহা হত্যার পর ক্রসফায়ারের ঘটনা কমে যায় নাটকীয়ভাবে। তবে হত্যাকান্ড থেমে থাকেনি। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে এএসপি আনিসুল করিমকে হত্যা, ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে শহিদুন্নবী জুয়েল হত্যা, সিলেটে পুলিশের পিটুনিতে রায়হান হত্যার ঘটনা ছিল আলোচিত। বিভাগীয় কয়েকটি শহরে বেড়েছে কিশোর অপরাধ। গুজব রটিয়ে, মিথ্যা ট্যাগ দিয়ে জনসম্মুখে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে।

শুধু তাই নয়, বিকৃত মস্তিষ্কের মর্গের লাশকাটা ঘরে মৃত তরুণীদের লাশও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আর এসব ঘটনা বছরজুড়ে শুধু আলোচিতই নয়, প্রতিবাদের ঝড় তোলে। বছরের শুরুতেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনা। যা সারা দেশেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামে। হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলা, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলা ও থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের সাজা, ঢাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় ধর্ষক মজনুর সাজা ছিল আলোচিত, এছাড়া ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের আইন এ বছরই পাস হয়েছে। এর বাইরে সারা বছরই কিছুদিন পরপর হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ পেতে থাকে। কভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট ব্যবসায় নেমেছিলেন আলোচিত রিজেন্ট হসপিটালের মালিক ও প্রতারক শাহেদ করিম ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সাবেক চিকিৎসক ও জেকেজি হেলথকেয়ারের পরিচালক সাবরিনা শারমিন হোসাইন ওরফে সাবরিনা আরিফ চৌধুরী। পরে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

আলোচিত সিনহা রাশেদ হত্যা : চলতি বছর গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে বহনকারী গাড়ি দাঁড় করানো হয়। তিনি গাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। রক্ষক হয়ে উল্টো ভক্ষকের ভূমিকা পালন করায় অসংখ্য প্রশ্নের মুখে পড়ে গোটা পুলিশ বাহিনী। দ্রুত তদন্ত শেষে গত ১৩ ডিসেম্বর টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে র‌্যাব। র‌্যাবের তদন্তে বেরিয়ে আসে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীদের ইয়াবা ব্যবসার তথ্য জেনে যাওয়ায় মেজর (অব.) সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। চার্জশিটভুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। বর্তমানে আসামিরা কারাগারে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় গত ৫ আগস্ট নিহতের বড় বোন শারমিন শাহরিয়া কক্সবাজারের আদালতে মামলা করেন। মামলায় টেকনাফের ওসি প্রদীপসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। হত্যাকা-ের সময় সিনহার সঙ্গে কক্সবাজারে ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ করছিলেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থী শিপ্রা দেবনাথ, সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও তাহসিন রিফাত নূর। পরে পুলিশ তাদেরও গ্রেপ্তার করে। পুলিশ বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা করে। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় গত ২১ ডিসেম্বর চার্জশিট গ্রহণ করে আদালত। একই সঙ্গে এ মামলার পলাতক আসামি সাগরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এছাড়া এ হত্যার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা থেকে সিনহার সহযোগী সিফাতকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর আদালত এ আদেশ দেয়। একই আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম।

রাজধানীতে সিনিয়র এএসপি আনিসুল হত্যা : গত ৯ নভেম্বর মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় সিনিয়র এএসপি আনিসুলকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসকদের পরামর্শে আদাবরের মাইন্ড এইড নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। তার কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীদের মারধরের শিকার হন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এ হত্যাকা-ের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলেই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হতে পারে। এ ঘটনায় চার্জশিটে মাইন্ড এইড হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মাইন্ড এইড হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আনিসুলকে মারধরের ঘটনা ধরা পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ফুটেজ ভাইরাল হয়। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে আনিসুলকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পায় পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় আনিসুলের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ বাদী হয়ে গত ১০ নভেম্বর মাইন্ড এইডের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৫ জনকে আসামি করে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে ১২ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে হাসপাতালটির পরিচালক ডা. নিয়াজ মোর্শেদ রাজধানীর একটি হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন। বাকি ১১ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মধ্যে ছয়জন দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। আনিসুল হত্যাকান্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুনকেও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাকেও এ মামলায় অভিযুক্ত দেখানো হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার পরিদর্শক অপারেশন ফারুক হোসেন মোল্লা ঘটনার পর জানিয়েছেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে সব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই নতুন বছরের প্রথম মাসের প্রথম সপ্তাহেই চার্জশিট দেওয়া হতে পারে।

পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে মাইন্ড এইডের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্ট রুমে জোর করে তাকে ঢোকানো হয়। এরপর রুমে নিয়ে তাকে উপুড় করে শুইয়ে দুই হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা হয়। এ সময় তার ঘাড়, মাথা, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। আনিসুলকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান হত্যা : সিলেট মহানগরীর আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে গত ১১ অক্টোবর ভোরে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে ছিনতাইকারী অভিযোগে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে গুরুতর আহত হলে পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। এরপর গত ১২ অক্টোবর নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। তার আগেই রায়হান হত্যাকান্ডে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর গত ১৮ নভেম্বর রায়হান হত্যা মামলায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক সৌমেন মিত্র এবং এসআই আবদুল বাতেন ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পুলিশের সদর দপ্তরের তদন্ত দলের প্রতিবেদনের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর ঘটনায় এসআই আকবর হোসেনকে গত ৯ নভেম্বর দুপুরে কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

লালমনিরহাটে মুসল্লিকে পুড়িয়ে হত্যা : গত ২৯ অক্টোবর গুজব ছড়িয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে আবু ইউনুস মো. শহিদুন্নবী জুয়েল (৪৫) নামে এক মুসল্লিকে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, নিহতের লাশ লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের ওপর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলায় এজাহারনামীয় ১১৪ আসামি এবং অজ্ঞাত শত শত আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার মধ্যে প্রথম মারধরকারী জুয়েল আলী ওরফে জুবেদ আলী এবং মুয়াজ্জিন আফিজ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, লালমনিরহাটের আগুনে মানুষ পড়িয়ে হত্যার ঘটনার দিন মসজিদে আসরের নামাজের পর জুয়েল নামে এক ব্যক্তি ধর্মের অবমাননার অভিযোগে গুজব ছড়ানো হয়। এরপর শত শত মানুষ জড়ো হয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। আর তাকে পিটিয়ে হত্যার পর তার রক্তাক্ত লাশ আগুনে পোড়ানো হয়। শুধু তাই নয়, আগুনে পোড়ানোর ভিডিও সামাজিকমাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হলে প্রতিবাদের ঝড় উঠে দেশ-বিদেশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনা : ২০২০ সালের গত ৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী এক আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াতে যাচ্ছিলেন ক্ষণিকা বাসে। তিনি বান্ধবীর বাসা শেওড়ার উদ্দেশে রওনা হন। সন্ধ্যা ৭টায় শেওড়া বাসস্ট্যান্ডে না নেমে কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে যান। তখন ওই শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন যে, তিনি ভুল করে নেমে পড়েছেন। ভুল বুঝতে পেরে তিনি ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে থাকেন। হঠাৎ তার পেছন থেকে এক ব্যক্তি তাকে পাশের কাঁটা ঝোপের ভেতরে ফেলে দেয়। তখন ওই ছাত্রী চিৎকার করতে থাকলে তার গলা চেপে ধরে তার মুখে, বুকে ও পেটে কিল-ঘুষি মারে। এরপর ওই ছাত্রী নিস্তেজ হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পর তার ব্যাগ থেকে একটি প্যান্ট বের করে তাকে পরিয়ে দেন। ছাত্রীর জ্ঞান ফেরার পর দেখেন তার পরনে যে প্যান্ট ছিল সেটা আর নেই। এ ঘটনায় করা মামলায় মজনু নামে একজনকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হয়। ওই মামলার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় গত ১৯ নভেম্বর তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করে আদালত।

নোয়াখালীতে স্বামীকে বেঁধে গৃহবধূকে ধর্ষণ : নোয়াখালীতে স্বামীকে বেঁধে গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এক গৃহবধূর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় ছেলেমেয়েকে নিয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুরে বাবার বাড়িতে থাকতেন ওই নারী। এরপর ১০ বছর পর গত ২ সেপ্টেম্বর স্বামী তার কাছে আসেন। এতে স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনীর ক্যাডাররা ঘরের দরজা ভেঙে ওই নারীর ঘরে ঢোকে। পরে নারীর স্বামীকে পাশের রুমে বেঁধে রেখে ওই নারীকে উলঙ্গ করে নির্যাতন ও তার ভিডিও ধারণ করে। পরে ওই নারী এলাকা ছাড়া হলেও তাকে মোবাইল ফোনে নানা ধরনের হুমকি ও কুপ্রস্তাব দিত স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে গত ৪ অক্টোবর সেই ভিডিও ফেইসবুকে প্রকাশ করে দুর্বৃত্তরা। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে পুলিশ ও র‌্যাব তাদের গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় নয়জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এদের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে নববধূকে ধর্ষণ : সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে নববধূকে ধর্ষণের ঘটনাটি খোদ সরকারি দলের নেতাকর্মীরাই প্রতিবাদে মাঠে নামেন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের টিলাগড় এলাকায় মুরারি চাঁদ কলেজ (এমসি) স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যান এক নববধূ। সেখানে ক্যাম্পাস থেকে তুলে ছাত্রাবাসে নিয়ে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে। পরে তার স্বামী শাহপরাণ থানায় ছাত্রলীগকর্মী সাইফুর রহমানকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। মামলায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই আটজনকে গ্রেপ্তার ও তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। আর আট আসামির ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মামলার আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যায়। পরে তাদের বিরুদ্ধে গত ৩ ডিসেম্বর সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। ওই চার্জশিটে প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, রাজন মিয়া, আইনুদ্দিন, মাহফুজুর রহমান ও তারিকুল ইসলাম তারেকের নাম উল্লেখ রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের রোমহর্ষক ঘটনার মধ্যে এবার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আর তা হচ্ছে মর্গের মৃত নারীদের লাশ ধর্ষণের ঘটনা। গত ১৯ নভেম্বর নগরীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গ থেকে মুন্না (২০) নামে এক ডোম সহকারীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। মুন্না কয়েক বছর ধরে মৃত তরুণীদের লাশ ধর্ষণ করেছে। সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকারও করে। ঘটনার পর সিআইডি জানিয়েছে, ফরেনসিক বিভাগের মর্গে সাতজন নারীর শরীরে একই ধরনের শুক্রাণুর প্রমাণ মেলে। পরে মুন্নাকে গ্রেপ্তারের পরই ভয়ংকর সব তথ্য পাওয়া যায়। মৃত নারীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ বছরের লাশ টার্গেট করে ডোম মুন্না।

সূত্র জানায়, মৃত নারীদের হাসপাতালের লাশকাটা ঘরে রাখা হতো। এরপর রাতে পাহারার নামে নিয়মিত ধর্ষণ করত ডোম। ফলে মৃত নারীর ফরেনসিক রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় একই। শুধু তাই নয়, ভিসেরা রিপোর্টে মৃত নারীর শরীর থেকে ডোমের শুক্রাণুর প্রমাণও পেয়েছে সিআইডি।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে এক নারীর আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছিল। তাতে বলা হয়, অপমৃত্যুর ঘটনায় নারীদের যৌনাঙ্গ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে যে মৃত্যুর আগে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না। এরপর থেকেই আদালতের নির্দেশ মেনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে। ওই নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে মোহাম্মদপুর ও কাফরুল থানার অপমৃত্যু হওয়া ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী সাত তরুণীর মৃতদেহে শুক্রাণুর উপস্থিতি পায় সিআইডি। আর ডিএনএ বিশ্লেষণে সাতটি লাশেই একই ব্যক্তির শুক্রাণু পায়। সিআইডি বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে। তদন্তে ভয়ংকর এক সিরিয়াল কিলারের খোঁজ করতে গিয়ে বের হয়ে আসে আসল রহস্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত