বিদায় ২০২০: সাফল্যের পর স্থবিরতা ক্রিকেটে

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:০৮ পিএম

বাংলাদেশের ক্রিকেটের বছরটা শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক এক সাফল্য দিয়ে। ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক আসরের শিরোপা সাফল্য এনে দিয়েছিল বাংলাদেশের যুবারা। এ বছরই নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ১০ টেস্ট খেলার সূচি ছিল বাংলাদেশের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ মিলিয়ে অনেকগুলো ম্যাচ খেলার সুযোগ। ছিল ২০২৩ বিশ্বকাপের বাছাই লিগেরও অনেক খেলা।

মার্চে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে যখন ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি সিরিজে ব্যস্ত বাংলাদেশ, তখনো করোনা এমন রূপ নেবে আঁচ করা যায়নি। অথচ করোনাভাইরাসের হানায় ২০২০-এ মাত্র দুটি টেস্ট খেলতে পেরেছে বাংলাদেশ- পাকিস্তানে গিয়ে ইনিংস ব্যবধানে হার, আর জিম্বাবুয়েকে ডেকে এনে ইনিংস ব্যবধানে হারানো।

১০ টেস্টের মধ্যে বড় আক্ষেপ অস্ট্রেলিয়াকে ঘরের মাঠে না পাওয়া। স্টিভেন স্মিথদের বিপক্ষে কালেভদ্রে পাওয়া টেস্ট খেলার সুযোগটি করোনার কারণে ভেস্তে যায়। শ্রীলঙ্কায় স্থগিত হওয়া তিন টেস্ট আগামী এপ্রিলে আয়োজনের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দুই টেস্ট- ধরা যায় হারানোর তালিকায়। পাকিস্তানে গিয়ে এক টেস্ট, নিউজিল্যান্ডের আসার কথা ছিল দুই টেস্ট খেলতে। তাও আর পুনর্বিন্যাস করা হবে কি-না বলার উপায় নেই। পুরো বছরে বাংলাদেশ ওয়ানডে খেলেছে মাত্র তিনটি। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর এত কম ওয়ানডের বছর আর দেখেনি দেশের ক্রিকেট।

নারীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট ছিল এই বছর। মেলবোর্নে ৮৬ হাজার দর্শক মাঠে বসে দেখেছিল ভারতকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম শিরোপা জয়। বাংলাদেশের নারীদের জন্য বছরই ভুলে যাওয়ার মতোই। বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ হারে সালমা খাতুনের দল। বছরের শেষ দিকে ভারতের উইমেন্স টি-টোয়েন্টি চ্যালেঞ্জ খেলতে সংযুক্ত আরব আমিরাত গিয়েছিলেন জাহানারা আলম আর সালমা খাতুন। এটাকেও একটা অর্জন হিসেবে রাখতে পারে বাংলাদেশ।

আকবরদের বিশ্ব জয়

৯ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে শক্তিশালী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল। টস জয়ী বাংলাদেশ আগে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে ৪৭.২ ওভারে ১৭৭ রানে আটকে দিয়েছিল সবচেয়ে বেশিবার যুব বিশ্বকাপ জয়ী ভারতকে। ৭টি উইকেট নিয়েছিলেন শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিব ও অভিষেক দাসরা। বৃষ্টিবিঘ্নিত ইনিংসে অধিনায়ক আকবর আলির ৪৩ রানের দারুণ দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রায় ৮ ওভার হাতে রেখেই ৩ উইকেটের জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। আকবর, পারভেজ ইমন, শরিফুলরা রাতারাতি বনে যান তারকা। বিপুল উন্মাদনায় বাংলাদেশের মানুষ বরণ করে তাদের। নিবেদন, উদ্যম, ইতিবাচক শরীরী ভাষায় এই যুবারা জানান দেন আগামীর বাংলাদেশের নতুন আশাবাদের কথা। তাদেরকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করেছিল বিসিবি। করোনায় বাতিল হয় এই তরুণদের কয়েকটি বিদেশ সফরও।

নেতৃত্ব থেকে বিদায় মাশরাফীর

যুবারা যখন বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যস্ত, সিনিয়ররা তখন পাকিস্তানের লাহোরে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলছে। ৭-১০ ফেব্রুয়ারির সেই ম্যাচে দুই ইনিংসে ২৩৩ ও ১৬৮ রান করা বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হারে ৪৪৫ রান করা পাকিস্তানের কাছে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপভুক্ত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটি করোনায় স্থবিরতার কারণে ৪-৯ এপ্রিল আর হয়নি। লাহোর টেস্টের পর দেশে এসে মিরপুরে ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি জিম্বাবুয়ের সঙ্গে একমাত্র টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। তামিম ইকবালের অপরাজিত ২০৩ ও অধিনায়ক মুমিনুল হকের ১৩২ রানে টাইগাররা গড়ে ৬ উইকেটে ৫৬০ রানের বিশাল ইনিংস। প্রতিপক্ষকে ২৬৫ ও ১৮৯ রানে গুটিয়ে দিয়ে ইনিংস আর ১০৬ রানের জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।

তিন ম্যাচের ওয়ানডে আর দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। সিলেটে শেষ ওয়ানডের আগে আকস্মিকভাবে দেশের সফলতম অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তাজা জানিয়ে দেন- খেলা চালিয়ে গেলেও অধিনায়কত্ব ছাড়ছেন তিনি। তার এই ঘোষণার পর আবেগের স্রোত বয়ে যায় দলজুড়ে। সতীর্থদের কাঁধে চেপে নায়কোচিত এক বিদায় পান মাশরাফী।

ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই নিজের আগের রেকর্ড ভেঙে ১৫৮ রানের নতুন রেকর্ড গড়েছিলেন তামিম ইকবার। এক ম্যাচের ব্যবধানেই তা কেড়ে নেন লিটন দাস ১৭৬ রানের ইনিংস দিয়ে। এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি বিসিএলের এক ম্যাচে দেশের পক্ষে ফার্স্ট ক্লাসে সর্বোচ্চ ৩৩৪ রানের রেকর্ড গড়েন তামিম ইকবাল।

১৫ মার্চ ১২ দল নিয়ে শুরু হয়েছিল প্রিমিয়ার লিগ। এক রাউন্ড হতেই করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বন্ধ হয়ে যায় লিগ।

নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সাকিবের ফেরা

জুয়াড়ির প্রস্তাব গোপন করে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর সব ধরনের ক্রিকেটে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। নিষেধাজ্ঞার সময়টায় অনেক ম্যাচ হারানোর সামনে ছিলেন সাকিব। কিন্তু করোনা এক অর্থে তাকে দিয়েছে স্বস্তি। তিনি নিষিদ্ধ থাকাকালে করোনায় বেশিরভাগ সময় বন্ধ ছিল সারা দুনিয়ার খেলাই।

ফেরার পর কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম না মানা, কলকাতায় এক পূজার উদ্বোধনে গিয়ে উগ্রবাদীদের হুমকি পাওয়ার পর তা অস্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ায় চরম বিতর্কিত ও সমালোচিতও হন এই তারকা। ফেরার পর ৫ দল নিয়ে বিসিবির ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরানোর টুর্নামেন্ট বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে জেমকন খুলনার হয়ে খেলেন ওয়ানডের শীর্ষ অলরাউন্ডার। বোলিংয়ে কিছু নৈপুণ্য দেখালেও আট ম্যাচ খেলে নিষ্প্রভ ছিলেন ব্যাট হাতে।

৬ মার্চের পর প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেন মাশরাফী ওই খুলনার হয়েই। শেষ পর্যন্ত তার হাত ধরেই মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় খুলনা। এর আগে বায়ো-বাবল পরিবেশে বিসিবি আয়োজন করে তিন দলের ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট। সেটিরও শিরোপা জেতে মাহমুদউল্লাহ একাদশ।

করোনায় সংকুচিত বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন বছর শেষে পায় একটা সুখবর। আইসিসির দশকসেরা ওয়ানডে একাদশে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে জায়গা করে নেন সাকিব আল হাসান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত