বুড়িগঙ্গা দূষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ হাইকোর্টের

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ০২:৩৩ এএম

বুড়িগঙ্গার পানি দূষণকারী ঢাকার কেরানীগঞ্জের ৩০টি ওয়াশিং প্ল্যান্টসহ দায়ী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কারখানার বিরুদ্ধে মামলা করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি নির্দেশনা এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। বুড়িগঙ্গা দূষণরোধে জনস্বার্থে করা একটি রিট আবেদনের ওপর রুল শুনানির ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবার বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। ঢাকা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে ৩০ দিনের মধ্যে বুড়িগঙ্গা দূষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলা হয়েছে।

উচ্চ আদালতের আদেশে কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গার পানিতে বা তীরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন ময়লা-আবর্জনা ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে তদারকি এবং আইনগত ব্যবস্থা নিতে ঢাকার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা ও কেরানীগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওই ৩০ ওয়াশিং প্ল্যান্ট হলো-  আহামদ হোসেন ওয়াশিং, আমেনা ওয়াশিং, সানমুন ওয়াশিং, ইডেন ওয়াশিং, বিসমিল্লাহ ওয়াশিং, লোটাস ওয়াশিং, গ্লোবাল ওয়াশিং, রুবেল ওয়াশিং, আনুশকা ওয়াশিং, সততা ওয়াশিং, চঞ্চল ওয়াশিং, আব্দুর রব ওয়াশিং, ঢাকা ওয়াশিং, আজান ওয়াশিং, নিউ সাহারা ওয়াশিং, দোহার ওয়াশিং, রিলেটিভ ওয়াশিং, নিউ নাশা ওয়াশিং, ইউনিক ওয়াশিং, মৌ ওয়াশিং, সেতু ওয়াশিং, কোয়ালিটি ওয়াশিং, জুয়েনা ওয়াশিং, কামাল ওয়াশিং, ওয়াটার কালার ওয়াশিং, পারজোয়ার ওয়াশিং, জিএম ওয়াশিং, কুমিল্লা ওয়াশিং, আছিয়া ওয়াশিং ও লিলি ওয়াশিং।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আমাতুল করিম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হোসেন।

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আজ (গতকাল) পরিবেশ অধিদপ্তরের দাখিল করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেখানে ৩০টি ওয়াশিং প্ল্যান্ট বসানো  হয়েছে। এর মাধ্যমে মারাত্মক পানিদূষণ হচ্ছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন, নয়তো পানিদূষণ বন্ধ হবে না। আদালত আর্জি শুনে মামলার আদেশ দিয়েছে। কেউ যদি বুড়িগঙ্গার পানিদূষণের জন্য দায়ী থাকেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত প্রতি মাসের প্রথম রবিবার রিট মামলার বিবাদীদের আদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।’

তিনি বলেন, অধিদপ্তর দাখিলকৃত প্রতিবেদনে তাদের লোকবলের সংকটের কথা বলেছে। কিন্তু এটি কোনো অজুহাত হতে পারে না। পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের যথেষ্ট এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।’ মনজিল মোরসেদ জানান, বুড়িগঙ্গায় দূষণ ঠেকাতে গত বছরের বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরকে পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হলে অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোকে দুই বার বন্ধ করে দেওয়ার পরও তারা পুনরায় কারখানা চালু করে পানি ও পরিবেশ দূষণ করছে। কিন্তু পরিবেশ আইনে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিধান থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর এখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেনি।

অ্যাডভোকেট আমাতুল করিম জানান, যাদের বিরুদ্ধে বুড়িগঙ্গা দূষণের অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ দূষণরোধে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া একটু সময়সাপেক্ষ। আমাদের লোকবলের স্বল্পতা রয়েছে। একসময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মাত্র কয়েকজন। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ম্যাজিস্ট্রেট বেড়েছে। অধিদপ্তরের এখতিয়ারের মধ্যে যতটুকু পারা যায় চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এসব নানা কারণেই পদক্ষেপ গ্রহণে একটু সময় লাগে। আমাতুল করিম আরও বলেন, ‘২০১৯ সালে বুড়িগঙ্গার আশপাশে থাকা কারাখানাগুলোর পক্ষ থেকে আমাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে বুড়িগঙ্গার পানিদূষণ হবে না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তারা রাখেননি।’     

বুড়িগঙ্গা নদীর পানিদূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে ২০১০ সালে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে করা একটি রিট আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ১ জুন বুড়িগঙ্গা দূষণরোধে তিন দফা নির্দেশনাসহ রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, নদীতে সংযুক্ত সব স্যুয়ারেজ লাইন ও শিল্পকারখানার বর্জ্য নিঃসরণের লাইন ছয় মাসের মধ্যে বন্ধ করতে বলা হয়। নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালিত না হওয়ায় ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টে সম্পূরক আবেদন করে এইচআরপিবি।

শুনানির এক পর্যায়ে বুড়িগঙ্গা দূষণরোধে হাইকোর্টের রায় ও আদেশ বাস্তবায়ন না করা, অসত্য তথ্য দিয়ে আদালতের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টির অভিযোগে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি আদালত অবমাননার রুল জারি করে হাইকোর্ট। এছাড়া আবেদনের ওপর শুনানিকালে ওয়াসার এমডিকে তলবের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ৪ মার্চ তিনি আদালতে হাজির হয়ে রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীকালে ১৮ আগস্ট, ৭ সেপ্টেম্বর এবং ১৪ সেপ্টেম্বর ওয়াসার পক্ষ থেকে তিনটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হলেও হাইকোর্টের রায়  ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি না থাকায় তা গ্রহণ করেনি উচ্চ আদালত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত