নিজের শাসনকালকে যতভাবে কলঙ্কিত করা যায়, তার সবই করেছেন। আমেরিকার ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্ব ইতিহাসেও এমন নজির খুঁজে পাওয়া মুশকিল। হ্যাঁ, এক বছরের মাথায় দ্বিতীয়বার মার্কিন হাউজে ইমপিচড হয়েছেন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্যাপিটল হিল হামলার ঘটনায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ১৩ জানুয়ারি তাকে ইমপিচ করে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস’-এর প্রতিনিধিরা। যদিও এর জন্য প্রেসিডেন্ট পদ খোয়াচ্ছেন না তিনি। কারণ নিয়ম অনুযায়ী, হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস দ্বারা পাস করা প্রস্তাব মার্কিন সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট আজ পর্যন্ত সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ইমপিচড হননি। এমনকি ট্রাম্পও গতবার সিনেটের শুনানিতে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। এবারও সিনেটের অধিবেশন ১৯ জানুয়ারির আগে বসবে না। আবার ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শেষদিন। তাই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব সিনেটে গেলেও তা ট্রাম্প পদে থাকতে থাকতে পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে বিদায়বেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলঙ্কিত নায়ক হয়ে রইলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আমাদের দেশের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভূত ছেড়ে যাওয়ার সময় কোনো একটি গাছের ডাল ভেঙে দিয়ে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের ভূতটিও যাওয়ার আগে আমেরিকার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সংযোজন করেছে। ট্রাম্প সমর্থকরা রীতিমতো অ্যাকশন মুভি উপহার দিয়েছেন। ওয়াশিংটনে ‘ক্যাপিটল হিলে’ কয়েক হাজার ট্রাম্প সমর্থক ঢুকে পড়ে তাণ্ডবনৃত্য চালায়। আক্রমণকারীদের কাছে ছিল বন্দুক ও বোমা। ওদিকে পুলিশ ছুড়েছে গুলি, কাঁদানে গ্যাস। নিহত হয়েছেন চারজন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জিতেছেন নির্বাচনী ছলচাতুরীর মাধ্যমে ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গাকারীদের অভিযোগ এমনটাই। ক্যাপিটল হিলের বিস্তীর্ণ চত্বরেই সিনেট ও জনপ্রতিনিধি সভা, মানে পার্লামেন্টের দুটি কক্ষ। কিছু দূরে সুপ্রিম কোর্ট। দুই মাইলের মধ্যে হোয়াইট হাউজ। সেই ক্যাপিটল হিল আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রাচীনসৌধ। এই প্রাচীনতম গণতন্ত্রের সৌধ আক্রান্ত হয়েছে।
যে রাষ্ট্র পুরো দুনিয়ায় গণতন্ত্র রপ্তানি করতে সদাব্যস্ত, তার আইনসভার আঁতুড়ঘরে ক্রমাগত উসকানির মুখে ট্রাম্প সমর্থকদের এই বেপরোয়া আক্রমণে সব নিন্দা বা ব্যঙ্গ তুচ্ছ হয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে উদ্বেগ। গণতন্ত্রের বিপদ কতটা ভয়ানক হতে পারে, ৬ জানুয়ারি ২০২০ তার স্মারক হয়ে থাকবে। ভয় ও উদ্বেগের বিশেষ কারণ হচ্ছে, এই আক্রমণ আকস্মিক ছিল না, বরং এক অর্থে তা ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতির ‘স্বাভাবিক’ পরিণতি। সেই প্রস্তুতি হিংস্র বিদ্বেষের, কদর্য অসহিষ্ণুতার, সর্বগ্রাসী স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার। এই মানসিকতায় ইন্ধন দিয়ে এবং তাকে কাজে লাগিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তারপর চার বছর ধরে বিভাজনী বিদ্বেষকে পরিচর্যা করে গেছেন। ভোটে হেরে যাওয়ার পরও জনরায় অস্বীকার করে রাষ্ট্রপতি পদে থেকে যাওয়ার জন্য উৎকট জবরদস্তি শেষ পর্যন্ত এমন এক চরম মাত্রায় পৌঁছায় যে, তার ওপর ভর করে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হোয়াইট হাউজ থেকে নিজ ‘সমর্থক’ বাহিনীকে কার্যত ক্যাপিটল আক্রমণে প্ররোচিত করেন। তারই পরিণামে আমেরিকার ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায় রচিত হয়েছে। ইউএস ক্যাপিটল হিল শুধু একটি ভবন নয়, এটি মার্কিন গণতন্ত্রের প্রতিমূর্তি। এখানে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের মৌলিক স্মারক। সেই স্মারক লাঞ্ছিত হয়েছে হামলা, খুন আর রক্তপাতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে ২০ জানুয়ারি পুরনো রাষ্ট্রপতি নতুন রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব অর্পণ করবেন। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর হবে সেদিন। কোনো সন্দেহ নেই, জো বাইডেনের সামনে এ এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ! কেননা এ কোনো ‘বিক্ষিপ্ত ঘটনা’ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রাচীন দর্শন ভেঙে পড়ছে। পচন ধরছে আমেরিকা নামক দেশের পুঁজিবাদী, উদার-গণতান্ত্রিক ব্র্যান্ডে। কোনো কিছু যখন ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে ওঠে, তখন তার সম্পূর্ণ অবলুপ্তিতেও সময় লাগে। যে-পণ্য বলছে, এটি মাথায় মাখলে টাকে চুল গজাবে এবং ভোক্তারা কিনে চলেছে যুগ যুগ ধরে, সে-পণ্যও হারিয়ে যেতে পারে যদি দেখা যায় তার ব্যবহারে আসলে টাকে চুল গজাচ্ছে না। তাই রোগটা গভীরে। ক্যাপিটল হিলে যা দেখা গিয়েছে তা হলো রোগের উপসর্গ। ভেতরে-ভেতরে জ্বর, ত্বকের উপরিভাগে ফোড়া। আমেরিকাও এখন এক গভীর আর্থসামাজিক সমস্যায় পতিত। আমেরিকা তার ‘সেলস কোম্পানি’র মাধ্যমে সৌদি আরব ও অন্যান্য বহু দেশ থেকে তেল কিনে নিজের সঞ্চয় বাড়িয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্র হতে চেয়েছিল। চীন ও রাশিয়া সম্মিলিতভাবে তার বিরুদ্ধে গোষ্ঠী তৈরি করে। যাকে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর এক ‘নিউ ম্যাপ’। আমেরিকার মনোবাসনা পূরণে আঘাত হেনেছে বহু দেশ। এই আর্থিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এক সামাজিক প্রবণতা। হেরে গেলেও তাই ট্রাম্পের পক্ষে শতকরা ভোটপ্রাপ্তি কিন্তু কম নয়। একেই বলা হচ্ছে ‘ট্রাম্পবাদ’, যা এই ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের অবশিষ্টাংশ। তাই অভিবাসনবিরোধী সাদা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্পের রাষ্ট্র এক নতুন আখ্যান তৈরি করেছে। রক্ষণশীল, শুধু শ্বেতকায় আমেরিকানদের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্রবাদ তৈরি হয়েছে। এই সামাজিক আখ্যান কিন্তু এক ধরনের মাদক, যা মানুষকে আচ্ছন্ন করে সাময়িকভাবে, কিন্তু ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়। হিটলারের ফ্যাসিবাদের মতো প্রকাশ্য গ্যাস চেম্বারের কর্র্তৃত্ববাদ দেখা না গেলেও এক ধরনের গোঁড়া রাষ্ট্রবাদী একনায়কতন্ত্র তৈরি হয়, যা উদার-পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের উপরিসৌধগুলোকে খতম করে তিল তিল করে।
ট্রাম্প যা করেছেন, যে পরিস্থিতির মুখে আমেরিকাকে দাঁড় করিয়েছেন, তা সত্যিই এক গভীর খাদ। শুধু জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটরাই নন, রিপাবলিকান প্রতিনিধিদের কয়েকজন সরাসরিই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। রিপাবলিকান দলের লিজ চেনি বলেছেন, ‘সংবিধান এবং জাতির উদ্দেশে শপথ নিয়ে এর আগে কখনো কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এভাবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেননি।’ টুইটার, ফেইসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে কোনো শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নজির এই প্রথম। নিজ দলের প্রতিনিধিদের বিপক্ষে চলে যাওয়ার নজিরও সম্ভবত এটাই প্রথম।
এ ঘটনা সহজে পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে মনে হয় না। যে বিষাক্ত বিদ্বেষের পিশাচনৃত্য দেখে দুনিয়া স্তম্ভিত, জো বাইডেনের আনুষ্ঠানিক অভিষেকে এবং সেই অভিষেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বীকৃতি’দানে তার সমাপ্তি ঘটবে না। এই দানবের শক্তি অনেক বেশি। সেই শক্তির বীজ রয়েছে সমাজের মধ্যে, নাগরিকদের একটি বড় অংশের মানসিকতায়। গণতান্ত্রিক ওষুধের সাহায্যে এই গভীর ও জটিল ব্যাধিকে প্রশমিত করার দায়িত্ব বহন করতে হবে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে এবং কংগ্রেসের দুই সভায় চালকের আসনে অধিষ্ঠিত ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিদের। কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু এখন কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন রিপাবলিকান পার্টি। তাদের শুধু ব্যক্তি ট্রাম্পকে নয়, ‘ট্রাম্পবাদ’ নামে বিষবৃক্ষটিকে শিকড়-সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হবে। তা না হলে গণতান্ত্রিক আমেরিকার ভবিষ্যৎ সুস্থ হবে না। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার পুনর্গঠনও জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে আসলে আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গলদগুলোই সামনে চলে এসেছে। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে কারচুপি, এমনকি পুরো নির্বাচনটাই চুরি হওয়ার অভিযোগ করে আমেরিকান গণতন্ত্রের ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শিকড় ধরে টান দিয়েছেন।
আমেরিকার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় আমেরিকা কেন, গণতান্ত্রিক বিশ্বের পক্ষেই একটি সুসংবাদ। যদিও ডেমোক্র্যাট দলের এ জয় সান্ত্বনামাত্র। ভোটের সংখ্যায় পার্থক্য উনিশ-বিশ, তাও সিনেটে রিপাবলিকানরা এগিয়ে। বাইডেন নামেই প্রেসিডেন্ট হবেন। রিপাবলিকানরা সর্বদাই ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলবেন। এই নির্বাচনী ফলে আমেরিকার দেশি ও বিদেশি নীতির মৌলিক বদল হবে, এ আশা অবান্তর। আমেরিকান পুঁজিবাদের স্বার্থ আগে দেখতে হবে বাইডেনকে। আমেরিকার নাগরিককে আগে কাজের সুযোগ দিতে হবে। যুদ্ধাস্ত্রনির্ভর আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির বদল হবে না, কারণ এসব দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিনির্ভর। সুতরাং, বাইডেনের জয়ে আহ্লাদিত হওয়ার তেমন কারণ নেই। শুধু একটি ব্যাপারে ক্ষীণ আশা জাগছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ও ব্যক্তি হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি, উদ্ধত, অবৈজ্ঞানিক, অসংগত আচরণ দেখতে হবে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটা সংকটের ছায়া পরিলক্ষিত হচ্ছে আমরিকায়ও। গণতন্ত্রের নামে একাধিপত্যের তন্ত্র গ্রাস করতে চাইছে। ইতিমধ্যে উত্তর কোরিয়া, রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানরা ঘোষণা করছেন, তারা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের পদে আসীন থাকতে চান! গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের একটা চেতনা যেন দেখা যাচ্ছে। আমেরিকায় এবার যা ঘটল, সেটা মূলত সাদা চামড়া বনাম কালো চামড়ার লড়াই। ট্রাম্প বরাবর প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তিনি কালো চামড়ার আধিপত্যকে মানতে পারবেন না। এতে সংখ্যাগুরু সাদা চামড়ার মানুষদের অধিকাংশের সমর্থন তিনি অর্জন করতে পেরেছেন। বাইডেন বেশির ভাগ সাদা চামড়ার সমর্থন পাননি। যুক্তরাষ্ট্র একসময় গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিল। সেই যুদ্ধটা আবার যেন সামনে চলে আসছে। ট্রাম্প চলে গেলেও যুদ্ধটা রয়েই যাবে। আমেরিকানদের একাংশের বিরুদ্ধে আরেকাংশের যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়ার কারিগর হিসেবে ট্রাম্প নিশ্চয়ই ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে থাকবেন!
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
