একতরফা নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের উৎকণ্ঠা বাড়ছেই। বাড়ছে হতাশাও। সরকারি দলের অনমনীয় মনোভাব ও বিরোধী দলের দুর্বল প্রতিরোধ মানুষের হতাশাকে প্রায় দুরাশায় পরিণত করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে একতরফা ভোটের সর্বশেষ অবস্থা বোঝার জন্য সাম্প্রতিককালে সংবাদমাধ্যমে আসা তিনটি খবর আমলে নেওয়া যেতে পারে। দেশের প্রায় সবগুলো সংবাদমাধ্যমেই এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি এই বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।
এক. বগুড়ার গাবতলী পৌরসভা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে ভোট না দিলে কেন্দ্রে আসার দরকার নেই বলে ‘হুমকি’ দিয়েছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাজেদুর রহমান। এজন্য তিনি নেতাকর্মীদের ভাগ হয়ে প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের ‘নির্দেশ’ দিয়ে বলেছেন, ধানের শীষ নিয়ে যে কথা বলবে, তার ওপর গজব হবে। সাজেদুর রহমান জেলার শাজাহানপুর উপজেলার খড়না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও। তিনি ভিপি সাহিন নামেও পরিচিত। গাবতলী পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে দাঁড়ইল বাজারে অনুষ্ঠিত নৌকা প্রতীকের মেয়র পদপ্রার্থী মোমিনুল হকের নির্বাচনী কর্মিসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রত্যেকটা ইউনিটের নেতাকর্মীদের আনে (এনে) সেন্টার ভাগ করে দেবেন। সেখানে একজনকে কমান্ডার ব্যানা (বানিয়ে) দেবেন। সেই কমান্ডারের নেতৃত্ব চলবে, সেখানে শিলুক (নৌকার প্রার্থীর ডাক নাম শিলু) ভোট দিলে সেই লোক আসবে, শিলুক ভোট না দিলে তার আসার দরকার নাই।’ এ সময় নেতাকর্মীরা ‘ঠিক ঠিক’ বলে সমস্বরে চিৎকার করেন। এরপর সাজেদুর রহমান বলেন, ‘ঘরের লোক ঘরতই থাক।’ এই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আরও বলেন, ‘কথাটা যেহেতু ঘরের ভেতর, সবাই আমার কর্মী, কর্মীদের এই কথাটা মেসেজ দিলাম। এটা করবেন আপনারা?’ এ সময় নেতাকর্মীরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ ও ‘অবশ্যই’ বলে উত্তর দিলে সাজেদুর প্রশ্ন করেন, ‘এখন কী মার খাওয়ার সময় আছে?’ নেতাকর্মীরা ‘না’ বলে জবাব দিলে তিনি বলেন, ‘মার দেওয়ার সময় আছে। আমরা মারব ধানের শীষের মার্কা লিয়্যা যে কথা বলবে, তার ওপর গজব হবে। কথাটা বোঝাতে পারছি?’ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এই নেতা আরও বলেন, যেভাবে গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করেছেন, সেভাবেই পৌরসভার মেয়রও করা হবে। তারা মেয়রে দাঁড়িয়েছেন, মেয়র নেবেন। কথা একটাই। তারেক জিয়া এখানে দাঁড়াল, না খালেদা জিয়া দাঁড়াল, সেটা দেখার বিষয় না। নেতাকর্মীরা যদি তার নির্দেশমতো কাজ করতে পারেন তাহলে মেয়র হবে। না হলে এই গাবতলীতে কোনো প্রতিনিধি (আওয়ামী লীগ থেকে) হওয়ার সুযোগ নেই।
দুই. কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী এনামুল হক এবার প্রকাশ্যে নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক নির্বাচনী পথসভায় তিনি তার কর্মী-সমর্থক এবং ভোটারদের বলছেন, ‘ভোট দিতে হবে। ভয়ের কোনো ব্যাপার না, কে দিচ্ছে এটা কোনো ব্যাপার না। আমি যদি ওপেন সিল মেরে দিই, তাহলে কেউ কারও কিছু দেখার নাই। সবাই নৌকায় সিল মেরে নেন, কোনো সমস্যা নাই। যেখানে সবাই একতরফা ভোট দেবে, সেখানে কেন আপনি সন্দেহের মধ্যে থাকবেন। আমাকে কেন সবাই সন্দেহ করবে। ভেতরে (গোপন কক্ষ) দুটিতে মারব, এইডিটে (নৌকা) সরাসরি মারব।’
আওয়ামী লীগের এই প্রার্থীর একই ধরনের আরেকটি বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তিনি বলেছেন, ‘আগামী ১৬ তারিখ নির্বাচনে আপনারা যথারীতি সকাল সকাল গিয়ে একেবারেই আপনার ভোট আপনি দেবেন। আসলেই আপনি যদি ওপেন (ভোট) দেন, তাহলে কেউ নিষেধ করতে পারবে না। কারণ আপনি দিতে চাচ্ছেন, আরেকজনও দিতে চাচ্ছে। আরেকজন যখন ভেতরে ঢুকবে তখন কিন্তু তার সন্দেহ হবে। যখন বের হয়ে যাবেন তখন একে অপরকে গালাগালি করবেন। তাহলে আপনারা সব ওপেন করে দেন। আপনারা কাউন্সিলর ও অন্যান্য সংরক্ষিত আসনের ভোট ভেতরে দেবেন। এই ভোটটি (নৌকা) আপনারা সরাসরি এখানে (প্রকাশ্যে) দেবেন।’
তিন. আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা যিনি নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার টানা তিনবারের মেয়র, তিনি বলেছেন, ‘বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু চামচা নেতা আছেন, যারা বলেন অমুক নেতা তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য। নোয়াখালীর মানুষজন বলে, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এটা সত্য। কিন্তু আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। আপনারা প্রতিদিন ভোট কমান। টাকা দিয়ে বড় জনসভা করা, মিছিল করা কোনো ব্যাপার নয়। টাকা দিলে, গাড়ি দিলে আমিও অনেক লোক জড়ো করতে পারব। না হয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেব। প্রকাশ্যে দিবালোকে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। টেন্ডারবাজি করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট যারা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। পুলিশের, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি দিয়ে যারা পাঁচ লাখ টাকা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা। গরিব পিয়নের চাকরি দিয়ে তিন লাখ টাকা যারা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, কিন্তু ভোটের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি। দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়নি। গণতন্ত্র থেকে আজ মানুষ বঞ্চিত, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত, এটা পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি মনে-প্রাণে, জননেত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারবেন, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারবেন। আমাদের দেশে এখন যে নির্বাচনগুলো হচ্ছে, তার বেশির ভাগই অনিয়ম, অতি-উৎসাহীরা করছে। যেখানে যার অবস্থান আছে, দৈহিক বল আছে, যাদের সমর্থন আছে, তারাও জিতছে, কিন্তু দৈহিক বলটা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। গতবারের নির্বাচনটা অতি-উৎসাহীদের হাতে ছিল। শেখ হাসিনা বলছেন, আমাকে গাছটা দাও, তারা পাতা-টাতাসহ দিয়েছে।’
আওয়ামী লীগের এই তিন আঞ্চলিক নেতার বক্তব্যই শুধু এই তিন অঞ্চলের পরিস্থিতিই নির্দেশ করে না। প্রকৃতপক্ষে এটাই সারা দেশের সামগ্রিক নির্বাচনী চিত্র।
বগুড়ার নেতা অবশ্য আগের নির্বাচনগুলো কেমন হয়েছে সে সম্পর্কেও একটা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেভাবে গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করেছেন, সেভাবেই পৌরসভার মেয়রও করা হবে। তারা মেয়রে দাঁড়িয়েছেন, মেয়র নেবেন। কথা একটাই। তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, নেতাকর্মীরা যদি তার নির্দেশমতো কাজ করতে পারেন তাহলে মেয়র হবে। না হলে গাবতলীতে আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। ঠিক যেমনটি বলেছেন ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য।’
সরকারি দলের এই আগ্রাসী আচরণের জন্যই নৌকার প্রার্থীদের জয়জয়কার। পৌর নির্বাচনের প্রথম ধাপে ২৬ পৌরসভার মধ্যে ১৬টিতে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ এবং দুটিতে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হন। দ্বিতীয় ধাপে ৬০টির মধ্যে চারটি পৌরসভায় প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় মেয়র পদে ভোট হয়নি। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ৪৬টি এবং বিএনপি প্রার্থীরা ৪টিতে জয়ী হন। স্বতন্ত্র ও অন্য প্রার্থীরা জিতেছেন ৯টিতে। এই স্বতন্ত্ররাও মূলত আওয়ামী স্বতন্ত্র। প্রথম ধাপে ১২টিতে ও দ্বিতীয় ধাপে ৩০টিতে জামানত হারিয়েছেন বিএনপি প্রার্থীরা। কোন পরিস্থিতিতে বিএনপির এই জামানত হারানোর পাল্লা ভারী হয়, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
সম্প্রতি উগান্ডায় ষষ্ঠবারের মতো ‘জয়ী হয়েছেন’ ৩৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ইয়োয়েরি মুসেভেনি। তার এই বিজয়ের নায়ক মূলত তার দেশের সেনাবাহিনী। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বলতে সেখানে তেমন কিছু রাখা হয়নি। আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের নির্বাচন তো সর্বজনবিদিত। একক প্রার্থীকে প্রকাশ্যে ভোট দিয়ে আবার নেচে-গেয়ে সমর্থনও জানাতে হয় উত্তর কোরিয়ায়। বর্তমান বাংলাদেশ উগান্ডা বা উত্তর কোরিয়ার নির্বাচন স্টাইল ফলো করছে কি-না জনমনে এখন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
লেখক চিকিৎসক ও কলামনিস্ট
