কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য গত বছরই পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পদক। এর আগে অভিনয়ের জন্য অসংখ্য স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন দেশে ও বিদেশে। কিন্তু এবার লেখালেখির জন্য পেলেন সম্মানজনক বাংলা একাডেমি পুরস্কার। আত্মজীবনী-স্মৃতিকথা-ভ্রমণ কাহিনী শাখায় এ বছর তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অভিনয় চর্চা করছি অনেক বছর। সেখান থেকে যে পুরস্কার পেয়েছি, সেটি এক রকম আনন্দের। কিন্তু লেখালেখিতে পুরস্কার পাব, এটা কোনোদিন ভাবিনি। বাংলা একাডেমির মতো সম্মানজনক পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার কাছে অপ্রত্যাশিত। খুব আনন্দ হচ্ছে। পুরস্কার পেয়ে লেখক হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতাটা আরও বেড়ে গেল।’
ফেরদৌসী মজুমদারের আত্মজীবনীমূলক বই দুটি খন্ডে বিভক্ত। একটি খন্ড তার বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেবেলা, শৈশব-কৈশোরের যে স্মৃতিগুলো তার মানসপটে এখনো জ¦লজ¦লে তা নিয়ে লেখা। আরেক খ- ‘আমার অভিনয় জীবন’। এটি তার দীর্ঘ দাপুটে অভিনয় জীবনের অনেক খুঁটিনাটি, গভীর বিশ্লেষণধর্মী বিষয় নিয়ে লেখা। ‘মনে পড়ে’ শিরোনামের বইয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন ফেরদৌসী মজুমদার। এটিও স্মৃতিমূলক গদ্যের বই।
ফেরদৌসী মজুমদার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের অভিনেত্রীদের রোল মডেল, আইকন। এত অর্জন যে শিল্পীর, তিনি এখনো চর্চার মধ্যেই থাকেন। নিজের অভিজ্ঞতা আর মেধা সব সময় ছড়িয়ে দিতে চান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। তাই তো এখনো নিজেদের নাটকের দল ‘থিয়েটার’-এর একনিষ্ঠ কর্মী তিনি। এখন কীভাবে দিন কাটছে জানতে চাইলে বলেন, ‘করোনাকালে আমার সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা ছিল শিক্ষকতা পেশা নিয়ে। অনলাইনে ক্লাস করাতে হতো। শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিকে এসে এই অনলাইনে ক্লাসের বিষয়টি অন্যরকম অভিজ্ঞতা। সানবিমস স্কুলে দীর্ঘদিন বাংলা পড়িয়েছি। দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পড়াতাম। কিন্তু নতুন বছরে এসে অবসর নিয়েছি। এই স্কুলেই পড়ালাম ১৮ বছর। এর আগে অনেক বছর শিক্ষকতা করিয়েছি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে তো অবসর নিতে হয়। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, ভালোবাসার কাজটি ছেড়ে থাকতে একটু তো কষ্ট হচ্ছেই। তবে অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।’
ফেরদৌসী মজুমদার এখনো খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। দিনের শুরু হয় কাগজ কলমের সঙ্গে। নিজের একান্ত অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনাগুলো লেখেন। তিনি বলেন, ‘কোনো বই প্রকাশ করব বিষয়টা এমন নয়। একেবারে নিজের তাগিদ থেকে লিখি। ছোট ছোট লেখাগুলো আমাকে অন্যরকম আনন্দ দেয়। হয়তো কোনোদিন বই আকারে এগুলো প্রকাশ হতেও পারে।’
এরপর তিনি শুরু করেন সংসারের কাজ। এখন ঘরে নিয়মিত মানুষ মাত্র দুজন। স্বামী রামেন্দু মজুমদারকে নিয়েই দুজনের এই সংসার। রান্না করতে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু এখন নিয়ম করে রান্না করা হয় না। কিন্তু তদারকি করেন ঠিকই। এতদিন সকালের কাজের পর্ব সেরে স্কুলে যাওয়া ছিল রুটিন। এজন্য তাকে টিভি নাটক বা চলচ্চিত্রে খুবই কম পাওয়া গেছে। কিন্তু এখন তো অনেক সময়। এই সময়টা কীভাবে কাটে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিনয়ে ব্যস্ত হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে হাতে যে সময় পাচ্ছি সেটা ফলপ্রসূ করার চেষ্টা করি। বই পড়ি, টিভি দেখি। আমাদের সিনেমা বা নাটক খুব একটা দেখা হয় না। হলিউডের সিনেমা দেখতেও আজকাল অত ভালো লাগে না। ভারতীয় বাংলা চ্যানেলের দু-একটা সিরিয়াল দেখি নিয়ম করে।’
তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন উদ্যমে মঞ্চনাটকে ফিরবেন ফেরদৌসী মজুমদার। নিজেদের নাটকের দল থিয়েটারের জনপ্রিয় প্রযোজনা ‘মুক্তি’র ৫০তম মঞ্চায়ন হবে। আমেরিকান নাট্যকার লি ব্লিসিং-এর নাটকের অনুবাদ করেছিলেন মিজারুল কায়েস। ত্রপা মজুমদার নির্দেশনা দিয়েছেন নাটকটি। এটি মূলত মা আর তিন মেয়ের গল্প। একটা সময়ে সবাইকে মাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়। সন্তানহীন মায়ের আকুতি, একান্ত অনুভূতি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন ফেরদৌসী মজুমদার।
এছাড়া গত বছর দুয়েক ধরে একটা দারুণ নাটক করার পরিকল্পনা করছে নাটকের দল ‘থিয়েটার’। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিদেশি একটি নাটকের অনুবাদ করেছেন আব্দুস সেলিম। নাম দিয়েছেন ‘প্রেমপত্র’। মাত্র দুটি চরিত্র নিয়ে নাটকটি। পুরুষ চরিত্রটি আলী যাকেরের করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি তো চলে গেলেন। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি করোনাকাল গেলে এই নাটকটির কাজ শুরু করব। এখন পুরুষ চরিত্রটি রামেন্দু মজুমদার করবেন বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তিনি আরও বলেন, ‘নাটকটির প্লট ও পাত্র-পাত্রীর চরিত্রবিন্যাস আমাদের মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে একেবারেই নতুন। পরিণত দুজন মানুষের আবেগ ও সম্পর্কগাথা তুলে ধরা হবে। নাটকটি সবার ভালো লাগবে বলে আশা করি।’
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তার অভিনয়ের ভক্ত। ফেরদৌসী মজুমদার কার অভিনয় পছন্দ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কলকাতার মঞ্চশিল্পী কেয়া চক্রবর্তী আর অজিতেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় খুব টেনেছে আমাকে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের ভক্ত আমি। সে কথা তাকে বলেওছিলাম। আর উত্তম-সুচিত্রার ম্যাজিক থেকে কে রেহাই পেয়েছে (হা হা হা)?’
