বিসিএসের প্রিলিমিনারি, লিখিত, ভাইভায় পাস করে পদ স্বল্পতার কারণে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা নির্ঝঞ্ঝাটভাবে চাকরি করতে পারছেন না। পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা এসব কর্মকর্তাকে জুনিয়র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিসিএস পরীক্ষার জন্য দেওয়া বিজ্ঞপ্তিকে তারা উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি বলে মানতে চাইছেন না। এই অবস্থায় বিষয়টির সুরাহা করার জন্য আগামীকাল আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বসছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এক প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব লাইসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ হয় উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে। এখন ৩৩তম বিসিএসের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে তা নিয়ে আমরা বৈঠকে বসছি। এই অবস্থায় কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
২৮তম বিসিএস থেকে পদ স্বল্পতার কারণে বিসিএস উত্তীর্ণদের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ৩৩তম বিসিএস থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদেও নিয়োগ দেওয়া শুরু করে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)।
৩৭তম বিসিএস পর্যন্ত বিসিএস পাস নন-ক্যাডার কর্মকর্তার সংখ্যা দশ সহস্রাধিক। তারা ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় পাস করে, সেই সঙ্গে ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি ও ২০০ নম্বরের ভাইভায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। অপরদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিভিন্ন পদে বিসিএস পরীক্ষার বাইরে থেকে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা ১০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি, ২০০ নম্বরের লিখিত ও ১০০ নম্বরের ভাইভায় অংশ নিয়েছেন।
বিসিএস পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত নয় এমন প্রার্থীদের মধ্যে থেকে নন-ক্যাডার নিয়োগ (বিশেষ) বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পিএসসির সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে জটিলতা অনেক দিন ধরে। এ বিরোধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও এর আওতাধীন বেশকিছু দপ্তরে কর্মরত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের গ্রেডেশন তালিকা চূড়ান্ত করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এতে করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরসমূহের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতি পেতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছে।
জনপ্রশাসন সূত্র বলছে, বিসিএস পাস দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পিএসসির সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধের আগে বিসিএস পাস প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পিএসসির সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত খোদ বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি)। পিএসসি সচিবালয়ের সহকারী পরিচালক, সহকারী সচিব ও লাইব্রেরিয়ানদের জ্যেষ্ঠতা তালিকার প্রণয়নে ৩১তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পিএসসির সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কমিশন বিসিএস পরীক্ষার মূল বিজ্ঞপ্তিকে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ধরে পিএসসি সচিবালয়ের সহকারী পরিচালক, সহকারী সচিব, লাইব্রেরিয়ানদের জ্যেষ্ঠতা তালিকার প্রজ্ঞাপন জারি করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিএসসি সচিবালয়ের একজন উপপরিচালক বলেন, ‘বিসিএস পাস নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হোক আর পিএসসির সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার কর্মকর্তা হোক জ্যেষ্ঠতা মূলত নির্ধারিত হয় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১ উল্লিখিত উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী। এক্ষেত্রে বিসিএস পাস নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিই উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি। বিসিএস মূল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মেধা তালিকা থেকেই নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে। সেখানে ৩০তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পিএসসির সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে জ্যেষ্ঠতা তালিকার চূড়ান্তকরণ সভায় সবাই সর্বসম্মতভাবে একমত হন বিসিএসের বিজ্ঞপ্তিই উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি এবং তাদের মূল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বা সমমান পদের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিসিএসের মূল বিজ্ঞপ্তিকে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি হিসেবে বিবেচনা করে জ্যেষ্ঠতা তালিকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পিএসসির সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিসিএসের মূল বিজ্ঞপ্তিকে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ধরে কর্মরত সহকারী পরিচালকদের খসড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকা বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনে পৌঁছালে ওই তালিকা সঠিক আছে মর্মে অভিমত প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন। কমিশনের অভিমতের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালকদের জ্যেষ্ঠতা তালিকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। পিএসসি, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়নে বিসিএসের মূল বিজ্ঞপ্তিকে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি হিসেবে ধরে জ্যেষ্ঠতা নির্ণয়ের নজির থাকলেও তা বিবেচনায় নেয়নি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ৩৩তম বিসিএস মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য দেওয়া অনুগামী বিজ্ঞপ্তিকে উন্মুক্ত ধরে খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। এর ফলে এ দপ্তরের ৩৩তম বিসিএস মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ও পিএসসির সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১-এর ৪ (১) (ক) এ উল্লিখিত উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসনে প্রেরণ করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের সভাপতিত্বে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকারী কর্মকমিশন ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর্যালোচনায় বলা হয় ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু সুপারিশ প্রাপ্ত নয় এমন প্রার্থীদের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য যে দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় সেটি মূলত প্রার্থীদের পছন্দক্রম যা উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি নয়; তাই সেটি বিবেচনায় নিলে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা অতিক্রম করবে সেক্ষেত্রে অনেকের চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতাই থাকবে না। এছাড়া পদের নাম পরিবর্তন বা পদের সৃজন বিজ্ঞপ্তির পরও হতে পারে তাই বিসিএস পরীক্ষায় মূল বিজ্ঞপ্তিই ধরেই জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ শ্রেয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষার মূল বিজ্ঞপ্তিই উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি, তাই ৩৩তম হতে নিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্তরা সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের উপর জ্যেষ্ঠতা পাবেন। সভার সিদ্ধান্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। প্রথম শ্রেণির জ্যেষ্ঠতা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্ত দুই বছরেও বাস্তবায়ন করেনি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। পিএসসির সরাসরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একজন কর্মকর্তাও আবেদনের প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসনের সেই মতামতের স্পষ্টীকরণ চেয়ে দুই বছর পর ফের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পত্র দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্তদের উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি হিসেবে বিবেচনায় বিসিএসের মূল বিজ্ঞপ্তিকে বিবেচনায় না নিলে ৩৩তম বিসিএস হতে নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-২ শাখার মতামত এবং বাংলাদেশ কর্মকমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু সুপারিশপ্রাপ্ত নয় এমন প্রার্থীদের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিকে বিবেচনায় নিলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সাধারণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৩০ বছর এবং মুক্তিযোদ্ধা/মুক্তিযোদ্ধার সনদের ক্ষেত্রে ৩২ বছর সংক্রান্ত সরকারি আদেশের ব্যত্যয় ঘটবে, কেননা দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় অনেকের চাকরি প্রবেশের বয়সসীমা থাকে না।
