চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে এ খাতের ব্যাংকঋণের জোগান কমিয়ে নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি অনুযায়ী, আগামী জুন পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
তবে করোনার মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধির উন্নয়ন না হলেও প্রথমার্ধের মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতেও এ খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হবে আশা করে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কর্মসূচি হাতে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি হয় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। কিন্তু করোনা মহামারীর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় আশানুরূপ না বাড়ায় সরকারের ব্যাংকঋণ তেমন একটা কাজে না লাগায় আগের ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার নিট ব্যাংকঋণ কমেছে সরকারের।
গত ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মুদ্রা ও ঋণ কর্মসূচি পরিবর্তনের এই বিষয়গুলো নিয়ে মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। ওই বৈঠকে বৈশ্বিক ও স্থানীয় অর্থনীতির বড় বড় সূচকগুলোর সবশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী ছয় মাসের মুদ্রানীতির কিছু অংশের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মুদ্রানীতির সভায় কমিটির সদস্যদের অভিমত ছিল, কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব কাটিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ২০২১ সালের মধ্যে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ইঙ্গিত তারা পাচ্ছেন।
তবে, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রকৃত খাতের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তের পর্যালোচনা ও আমদানি-রপ্তানিসহ বহিঃখাতের সার্বিক চাহিদা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইকোনমিক মডেলিং অ্যান্ড ফোরকাস্টিং অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করায় ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর নিরাপদ সীমাও কিছুটা সংশোধন করে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সরকারের সংশোধিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশের সঙ্গে এই পরিমাণ ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বছরের শুরুতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ হবে বলে প্রক্ষেপণ করেছিল সরকার।
এছাড়া বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের এফএও কর্র্তৃক মাসিক ভিত্তিতে সর্বশেষ (ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত) প্রকাশিত পণ্যের (এনার্জি ও নন-এনার্জি) মূল্যসূচক এবং খাদ্য (চালসহ) মূল্যসূচকের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে সভায় অভিমত জানানো হয়, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়তে পারে। সে হিসেবে দেশীয় মূল্যস্ফীতির ওপরও কিছুটা চাপ আসার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার কর্র্তৃক ইতিমধ্যেই চাল আমদানির ওপর শুল্ক কমানোসহ বেশ কিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে। আপাতত চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী গড় মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকবে বলে সভায় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
তবে করোনার প্রভাব কাটিয়ে অদূর ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতে প্রদত্ত ঋণের প্রবৃদ্ধি অপরিবর্তিত রাখা হয় বলে ওই বৈঠকে জানানো হয়।
জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মানসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার যেহেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হবে আশা করছে, বাংলাদেশ ব্যাংকও সেই অনুযায়ী বেসরকারি খাতের ঋণের জোগান দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু আগামী জুনের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এমনটা আশা করা কঠিন।
