সত্তরের বেশি বয়স কৃষক বিল্লালের। খেতে কাজ করতে গিয়ে হারিয়েছেন তার দুটি পা। কিন্তু পঙ্গুত্বের কাছে হার মানলেও থেমে যাননি তিনি। কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে অতি কষ্টে কৃষি কাজ করে টানছেন সংসারের বোঝা। আত্মমর্যাদা আর দৃঢ় মানসিকতায় নিজেকে তৈরি করেছেন সমাজের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার মদনের গাঁও এলাকার কৃষক বিল্লাল হোসেন গাজী। প্রায় ১০ বছর আগে পচন ঠেকাতে কেটে ফেলতে হয় তার পা দুটি। পঙ্গু হলেও কারো কাছে হাত পাতেননি তিনি।
সরেজমিন মদনের গাঁও গিয়ে দেখা যায়, বিল্লাল হোসেন গাজী আপন মনে কাজ করছেন তার বর্গা জমিতে। শতকষ্ট বুকে চেপে মুখে হাসি মেখে ক্ষেতের পাশেই তার কৃত্রিম পা টা খুলে রেখে এক মনে কাজ করে চলছেন।
কথা হলে বিল্লাল হোসেন গাজী বলেন, ১২ বছর আগে ধানখেতে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত কিছুর সংস্পর্শে তার পায়ে পচন ধরে। পচন বাড়তে থাকায় ১০ বছর আগে কেটে ফেলা হয় পা দু’টি। পঙ্গু হয়ে হঠাৎ করেই স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়ের সংসার নিয়ে বিপদে পড়ে যান। সংসারের খচর মেটাতে অন্ধকার দেখেন। কিন্তু মনোবল না হারিয়ে আবারো কাজে নামেন তিনি। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে বিভিন্ন ফসল আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে দুই একর জমি বর্গা নিয়ে আলু ও আখ চাষ করছি।
তিনি বলেন, অন্যের বর্গা জমিতে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি শাকসবজি ও ফসল ফলাই। এতে করে যে পরিমাণ লাভ হয় তা দিয়ে সংসারের খরচ বহন করি। কাজ করতে অনেক কষ্ট হলেও কিছু তো করার নাই। কেউ তো আর আমার কষ্ট কমাতে এগিয়ে আসবে না।
বিল্লাল গাজী বলেন, অনেক পঙ্গু মানুষ আছে যারা অন্যের কাছে হাত পেতে খায়। আমি হাত পাততে পারি না। আমার দ্বারা তা সম্ভব না। নিজে কষ্ট করে উপার্জন করি, এতে অনেক আনন্দ আছে। আল্লাহ রিজিকে যা দেয়, তা দিয়েই কষ্টে দিন চলে যায়।
এই কৃষক বলেন, দুই পা হারিয়েও আমি কোনো প্রতিবন্ধী কার্ড পাইনি। বয়স সত্তরের বেশি হলেও আমার কপালে জোটেনি বয়স্ক ভাতা। সরকারি কত সহায়তা আছে, আমি কিছুই পাইনি। আমার একখণ্ড জমিও নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করি। এতে কষ্ট বেশি হলেও মুনাফ কম হয়। সরকার যদি আমাকে একটা বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী কার্ড দেয়, আমার চাষাবাদে সহায়তা করে তাহলে পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম।
বিল্লাল গাজীর স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন, স্বামীর এই দুর্দিনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে কেউই এগিয়ে আসেনি। চার ছেলের তিনজনই বিবাহিত। ছেলেদের স্বল্প উপার্জনে সংসারের খরচ চলে না। একমাত্র মেয়ে কলেজে পড়ে। সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়াতো, তাহলে আমার স্বামীর কষ্ট কিছুটা হলেও কম হতো।
বিল্লাল গাজীর ছেলে, জাকির হোসেন বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে আমার বাবার পা কেটে ফেলতে হয়েছে। সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় আমাদের স্বল্প আয়ে সংসারের খরচ মেটে না। বাধ্য হয়েই আমার পঙ্গু বাবা অনেক কষ্ট করে কাজ করেন। আমার বাবার ভোটার আইডি কার্ড না থাকায় কয়েকবার ইউনিয়ন পরিষদের গিয়েও কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। আমরা সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাই।
বিল্লাল গাজীর কলেজে পড়ুয়া মেয়ে লিজা বলেন, আমার বাবা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার চালান। অভাবের মাঝেও অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করাচ্ছেন। আমার বাবার এই কষ্ট আর সহ্য হয় না। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু ফিরে তাকাত তাহলে ভালো হতো।
মদনের গাঁও গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাবিব ও কাওসার মিজি বলেন, বিল্লাল কাকার হাড়ভাঙা পরিশ্রম দেখে আমাদের অনেক কষ্ট লাগে। অনেকে সুস্থ-সবল থেকেও মানুষের কাছে হাত পাততে দ্বিধাবোধ করেন না। কিন্তু তার দুটি পা না থাকলেও তিনি কারো কাছে হাত পাতেন না। তা দেখে আমাদের গর্ব হয়। তিনি এত কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিল্লাল কাকার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। বয়স্ক এই মানুষটার পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অসীম চন্দ্র বনিক বলেন, আমরা তার সম্পর্কে জানতাম না। আপনার নিকট থেকেই প্রথমে জানতে পারলাম। প্রশাসন অবশ্যই এই পঙ্গু, বয়স্ক কৃষকের পাশে দাঁড়াবে। তাকে সহায়তা করতে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। অচিরেই তাকে প্রতিবন্ধী দেওয়া কার্ড বা বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
