যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন ক্ষমতায় বসার পর থেকেই পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সেই গুঞ্জনকে সত্যি করে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন প্রত্যাখ্যান করে নিল বাইডেন প্রশাসন। বাইডেনের এই পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ মিত্রতাতে টানাপড়েন শুরু হচ্ছে বলেও দাবি তাদের।
জো বাইডেন বলেছেন, ইয়েমেনে সৌদি আরবের যুদ্ধকে আর সমর্থন করবে না যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির চলমান সংকট নিরসনে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রথম বক্তৃতায় গত বৃহস্পতিবার তিনি এসব কথা বলেন। বক্তৃতায় বাইডেন বলেন ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে, কূটনীতিও ফিরে এসেছে।’
ইয়েমেনে সৌদি আরবের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বন্ধের বিষয়ে বৃহস্পতিবার প্রথমে বিবৃতি দেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সালিভান। পরে নিজের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বক্তৃতায় বাইডেন নিজেই বিস্তারিত জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনোভাবেই আর সৌদি আরবকে যুদ্ধে সহযোগিতা করা হবে না। বরং ইয়েমেনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের রাস্তা খোঁজা হবে। তিনি আরও জানান, এতে করে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হবে না। কেবল যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে ওয়াশিংটন।
বাইডেন বলেন, ইয়েমেনে যুদ্ধের অবসান হতে হবে। ছয় বছর ধরে ইয়েমেনে সৌদি আরব যে লড়াই চালাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র সেই লড়াইয়ে সৌদি আরবকে আর সহযোগিতা করবে না। বরং শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে কীভাবে মীমাংসার পথ বের করা যায়, সেই চেষ্টা চালানো হবে। ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে সিনিয়র কূটনীতিক টিম লেন্ডারকিংকে নিয়োগ দিয়েছেন জো বাইডেন।
তবে বাইডেন যে সৌদিকে মাঝপথে ছেড়ে দিচ্ছে ব্যাপারটা এমন নয়। বাইডেনকে বলতে শোনা যায়, ‘সৌদিতে মিসাইল হামলা হচ্ছে। ইরান সমর্থিত বাহিনী একাধিক দেশে হামলা চালাচ্ছে। সৌদির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রক্ষায় আমরা সহযোগিতা করতে থাকব, যাতে দেশটি তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে।’ বাইডেনের এমন বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে সৌদি প্রশাসন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সউদ টুইটারে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানায় সৌদি রাজতন্ত্র।’ এখন দেখার বিষয় যুদ্ধের পথ এড়িয়ে কীভাবে ইয়েমেন সংকটের সমাধান হয়। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একাধিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবকে সমর্থন দেবে না বলা হলেও ওয়াশিংটন নিরীহ ইয়েমেনিদের হত্যার জন্য সৌদির কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে কি-না এমন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে নীতিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে সরে এলেও প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকবেই।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদিকে উচ্ছেদ করে রাজধানী সানা দখলে নেয় দেশটির ‘ইরান সমর্থিত’ শিয়াপন্থি হুথি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন ক্ষমতাচ্যুত হাদি। হুথিরা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই হাদির অনুগত সেনাবাহিনীর একাংশ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ২০১৫ সালের মার্চে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ডিসাইসিভ স্টর্ম’ নামের সামরিক আগ্রাসন শুরু করে সৌদি-আমিরাতের সামরিক জোট। সৌদি জোটের বিমান হামলায় নিহত হয় লক্ষাধিক বেসামরিক মানুষ। ভয়ানক দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায় ইয়েমেন।
