অর্থনীতিবিদ মুশাররফ হোসেনকে ফিরে দেখা

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:০৪ পিএম

(বুধবার প্রকাশিত প্রথম কিস্তির পর)

স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান বুনিয়াদি গণতন্ত্র নামে এক উদ্ভট হাঁসজারু ব্যবস্থা চালু করে তার কাঁধে চড়ে ‘জনসমর্থিত প্রেসিডেন্ট’ বলে নিজেকে ঘোষণা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় জেঁকে বসেন। ‘বুনিয়াদি’ চক্রকে হাতে রাখতে তাদের তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে চালু করেন গণপূর্ত কাজ। সেই সূত্রে গ্রামীণ শ্রমজীবীদেরও ক্রীতদাসে পরিণত করা চলে। ষাটের দশকের দ্বিতীয় ভাগে স্যার এই কাজ মূল্যায়নের উদ্যোগ নেন। গ্রামীণ দারিদ্র্যে ও অর্থনীতিতে অবকাঠামো নির্মাণে এর সত্যিকারের ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়ছে কি না নাকি সবটাই ভাঁওতাএটা দেখাই ছিল তার উদ্দেশ্য। তবে এ কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। আটষট্টির শেষে বিশেষ মর্যাদার নাফিল্ড ফেলোশিপ পেয়ে প্রায় দু’বছরের মতো সপরিবারে তিনি বিলেতে কাটিয়ে আসেন। সত্তরে যখন ফেরেন, তখন দেশ উত্তেজনার শীর্ষে। তিনিও নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন না। তেমনটি চানও না। মুক্তিসংগ্রামের প্রাথমিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তার সহযোগী ঘাতক-দালালরা গণহত্যা শুরু করলে আবার সপরিবারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকারে যুক্ত হন। তার পরিকল্পনা সেল-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি নিজের মেধা ও শ্রমের সবটুকু ঢেলে দেন। দেশ মুক্ত হলে কিন্তু আর তার রাজশাহী ফেরা হয় না। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে তাকে নিয়োগ দেন। ভাবীও অধ্যাপনায় ফেরেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্পূর্ণ করার সময় পর্যন্ত সরকারি দায়িত্ব পালন করে স্যারও আবার অধ্যাপনা ও গবেষণায় ফেরেন। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন কিছু সময়।

তবে অধ্যাপনায় থিতু হওয়ার আগেই ঘটে এক অকল্পনীয় রাষ্ট্র-বিপর্যয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাতে দেশি-বিদেশি পাকিস্তানি উদ্দেশ্যতাড়িত কায়েমি স্বার্থচক্রের মদদে এক সেনা অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। তার দলের বা কাছের মানুষও কেউ কেউ মীরজাফর-বৃত্তিতে যুক্ত থাকে। প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা প্রত্যেকে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা কেউই দেশে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না। স্যার আবার সপরিবারে বাইরে ছুটলেন। এবার আস্তানা অক্সফোর্ড। চার বছর পর দেশে যখন আপাতদৃষ্টে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বাহ্যিক পরিবেশ অন্তত খাড়া হতে শুরু করেছে তখন অন্য ক’জনের সঙ্গে তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। তখন থেকে তার কাজ শুধু অধ্যাপনা ও গবেষণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের মেয়াদ ফুরোলে সবটাই গবেষণা।

চোখ কিন্তু তার পুরোপুরি স্থির থাকে আগের মতো গ্রামের মানুষের ওপরেই। কেবল প্রেক্ষাপট আরও প্রসারিত করেন। নমুনা সংগ্রহ শুধু একটি গ্রামে সীমিত থাকে না। পরিবেশ, জনসংখ্যার আপেক্ষিক নিবিড়তা, ধরন, উৎপাদন প্রক্রিয়া, আঞ্চলিক প্রভাবএই সব বিষয়ের বিভিন্নতা মাথায় রেখে তিনি গবেষণার ক্ষেত্র বাছাই করতেন। ‘র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল’-এর উদ্দেশ্য অনেকটাই এভাবে পূরণ হতো। তথ্য সংগ্রহ ও বিচার-বিশ্লেষণে তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কোনো জায়গা ছিল না। ক্ষমতাচক্রেরসে যেমনই হোকপ্রসাদের প্রতি তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিস্পৃহ। আপন মেধা ও কর্মক্ষমতার ওপর তার আস্থা ছিল শতভাগ। তিনি জানতেন, ক্ষমতার খাস-কামরায় অথবা অলিতে গলিতে যাদের বিচরণতার নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণ তাদের পছন্দ নয়। তাই আপন বিচার-বিবেচনায় তার ছিল বাড়তি সতর্কতা। বলতেন মনে রেখ, যাদের সঙ্গে আমাদের লড়াই, তারা প্রবল প্রতাপশালী; দেশে ও বিদেশেও। এতটুকু পদস্খলন ঘটলেই ওরা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। হয় কেটে-কুটে ছিন্নভিন্ন করবেনয়তো প্রবল উপেক্ষায় একঘরে করে রাখবে। তবে তার কাজকে এভাবে কেউ দমাতে পারেনি।

আশির দশকের শুরু থেকে গোটা পৃথিবী জুড়ে শুরু হয় অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত খাতের আগ্রাসী দাপট। জায়গাটা তৈরি হয় অবশ্য আগের দশকেই। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বেশ কিছুদিন থেকে চলছিল এক দিশেহারা ভাব। পরিকল্পিত উদ্যোগে প্রত্যাশিত ফল মিলছিল না। প্রবৃদ্ধি হারে নেতিবাচকতার লক্ষণ ধরা পড়তে শুরু করেছিল। ’৭৩-এ আন্তর্জাতিক তেল সংকট গোটা পৃথিবীর অর্থনীতিই ভিতসমেত নাড়িয়ে দেয়। মন্দার সময় কর্ম ও অর্থের প্রচলন বাড়িয়ে কাজকর্মে গতি আনার কৌশল আর কাজে আসে না। স্থবিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি একসঙ্গে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে। এই রকম সময়েই আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেন রোনাল্ড রেগান; আর যুক্তরাজ্যে শুরু হয় মার্গারেট থ্যাচারের নেতৃত্বে কট্টর রক্ষণশীল শাসন। অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের গুরুত্ব তারা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে বসেন। নিও-ক্ল্যাসিকাল বাজার অর্থনীতি সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। সেখানে লাভের প্রত্যাশায় ব্যক্তিগত খাত প্রাধান্য পায়। রেগান তো বলেই বসেনসমাজ কী, এটা তিনি বোঝেন না। প্রতিটি ব্যক্তি নিজের পছন্দমতো চলে। তাতে একে অন্যে যোগাযোগ। রাষ্ট্রের কাজ এখানে কেবল এই ব্যবস্থার সুরক্ষা দেওয়া। থ্যাচার জানান, সামাজিক খাতে অর্থ জোগানোয় রাষ্ট্রের কোনো দায় নেই। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। এমনকি শিক্ষা খাতে ঘটে বিপুল কাটছাঁট। সরকার হাত গুটিয়ে নিলে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন করে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। একে বলা হয় ‘Structural Adjustment’ বা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস। জোর পড়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়ার ওপর। সরকারি দায়দায়িত্ব লাটে ওঠে। তা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও। মুক্তবাজার অর্থনীতি সব লেনদেনে দখল নিতে শুরু করে। বলা হয়, অনুন্নত দেশ সস্তায় শ্রম-নির্ভর পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করে খোলাবাজারে ব্যবসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অতি দ্রুত রমরমা অবস্থায় চলে আসবে। উদাহরণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক তুলে ধরে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসএই চার বাজারনির্ভর দেশের তুলনায় অধিক কেরামতি দেখানোর উদাহরণ। আরও একটা ব্যাপার কিন্তু এই কালপর্বে বাজারের দাপট বাড়াবার পথ সুগম করে। তা হলো তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লব। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে কোনো এক জায়গায় বসেই উৎপাদনের অসংখ্য উপকরণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নায়েব-গোমস্তা-ব্যবস্থাপক বসিয়ে সরবরাহেএবং বাজার নিয়ন্ত্রণেওসব কিছু বাগে আনা সম্ভব। বিশ্ব অর্থনীতি এইভাবে বরাত দেওয়া, বরাত পাওয়া ও উৎপাদনে নানা পর্যায়ের মাল উৎপাদন আর সরবরাহ করার পারস্পরিক সংযুক্ত চলমান ক্রিয়াকর্মের জালে পরিণত হয়। বলা হয়, দারিদ্র্য দূর করারও এটা প্রকৃষ্ট উপায়। কারণ শ্রমনির্ভর সস্তা উপকরণগুলো চাহিদামতো সরবরাহ করতে পারলেই কারবারে তাদের নগদলক্ষ্মী লাভ। হাতে হাতে যে ফল মেলে, তা তো দেখিয়ে দেয় এশিয়ার ওই চার উদীয়মান ব্যাঘ্র।

মুশাররফ হোসেনের কাছে কিন্তু মনে হয় গোটা ব্যাপারটার আড়ালে কাজ করে একটা হাত সাফাইয়ের খেলা। অনুন্নত দেশগুলোয় এর ফলে চালাক-চতুর-ফড়ে-মুৎসুদ্দি বাজারনির্ভর একটা প্রভাববলয় হয়তো তৈরি হয়। কিন্তু প্রকৃত দারিদ্র্য দূর হয় না। অন্যের হাত তোলা অবস্থায় পরিবর্তন আসে না। এই অবস্থাটির প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় কেমনভাবে, কীভাবে ঘটে চলেছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার লক্ষ্যে তিনি জাতিসংঘের হয়েই একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নেন। ফলাফল প্রকাশিত হয় তার রীতিনিষ্ঠ নিরাসক্ত গবেষণা প্রতিবেদনেযার শিরোনাম :  The Assault that Failed: A Profile of Absolute Poverty in Six Villages of Bangladesh (1987)। জেনেভার ‘ইউনাইটেড নেশনস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ এর প্রকাশক। কিন্তু মজা এই, বিশ্বব্যাংক এই প্রকাশনার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেও এতে যে কার্যকারণ সংযোগ-বিকৃতির বিবরণ ও সতর্কীকরণ বিদ্যাচর্চায় সততা পুরোপুরি বজায় রেখে করা হয়েছে তাকে একরকম পাশ কাটিয়েই গেছে। এসথার-অভিজিতের বিশ্বরেণ্য কাজও ওই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখেনি। মাঝখানে অবশ্য আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে গেছে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন আর বিশে^ কোথাও নেই। গণচীনে পার্টির একনায়কতন্ত্র আছে। কিন্তু গোটা উৎপাদন-ব্যবস্থাতেই চালু লাগামহীন বাজারতন্ত্র। পার্টি পলিটব্যুরোর অধিকাংশ সদস্যই বিলিয়নিয়ার। গণমানুষের কল্যাণের দিকে তাদের নজর কতটা, তা বাইরে থেকে বলা মুশকিল। এমন পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য যেমন দেখি তেমনএর নিচে বা গভীরে চোখ ফেলার বিষয়টি অনুভূত হয় খুব কমজনেরই। আসলে দেখার বিষয় প্রত্যক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকছে। থ্যাচার-রেগান মানসিকতা অপ্রতিহত থাকলে এমনটিই স্বাভাবিক।

স্যার-এর আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, Nature and Extent of Malnutrition in Bangladesh: Bangladesh National 
Nutrition Survey, 1995-96 একা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খুরশিদ জাহানের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত। অবশ্য এমন বিপুল সমীক্ষায় যা অপরিহার্য, গোটা দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যথাযথ প্রয়োগ করে নমুনা চয়ন ও প্রাপ্ত তথ্যের বর্গীকরণ এবং তার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীবাহিনী নিয়োগ করে তাদের কাজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণএটাও তারা গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন। খুরশিদ জাহান আরও জানাচ্ছেন, যখন তারা অর্থসংকটে পড়েনতখন স্যার নিজের সঞ্চয় ভেঙে এই কাজ অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করেন। বইটির প্রকাশকাল ১৯৯৮। এ কথা আজ সবাই মানেন, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি পরস্পর সম্পর্কিত। এসথার-অভিজিৎও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাবার পন্থা-পদ্ধতির ওপর বিশেষ জোর দেন। তবে মুশাররফ হোসেন ও খুরশিদ জাহানের এই কাজের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও নির্দেশনা আমাদের অভিভূত করে। নিজেরা তারা কিছুই বলেন না। তাদের সাজানো তথ্যের পরিমাণ, তাদের নিহিতার্থ ও পারস্পরিক সম্পর্ক আমাদের সচকিত করে। কোথায় ঘাটতি আছে, কোথায় বাড়তি এগুলো পথের ইঙ্গিত দেয় অবশ্যই। কাজটি ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মনুমেন্টাল’, তা-ই। স্যার এ বিষয়ে বেশ কটি প্রবন্ধও লিখেছেনবাংলায়, ইংরেজিতেও। কিন্তু কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখি না। এ কি আমারই অজ্ঞতা? নাকি আমাদের শিক্ষিত ‘সচেতন’ সম্প্রদায়ের ‘যথোচিত’ প্রতিক্রিয়া?

স্যার এরপর যে বড়মাপের কাজটি হাতে নেন, তার শিরোনাম Survival Strategy of the Rural Poor in Bangladesh। বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। অনুসন্ধান কাল ২০০৪ পর্যন্ত। কাজে এতটুকু ফাঁকি বরদাশত করতেন না। বলতেন, আমাদের প্রতিপক্ষ প্রবল শক্তিশালী। গলাবাজি করে নয়, সঠিক তথ্য ও তার পূর্বাপর ব্যাখ্যা দিয়ে তার সঙ্গে লড়তে হবে। এই কাজের সূত্রেই তিনি পল্লী উৎপাদনে এক বিকল্প ছক নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেন। শস্যচক্রে এখন বোরো ধানের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। তার কারণেই ফলনের হারে চোখ ধাঁধানো উন্নতি। ৭১-এর তুলনায় জনসংখ্যা প্রায় আড়াইগুণ হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো খাদ্যাভাব ঘটে না। অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকি। কিন্তু স্যার বিষয়টিকে কালের প্রেক্ষাপটে আরও প্রসারিত করে দেখেন। বোরো মৌসুমে ফলন বিপুলভাবে সেচনির্ভর। ওই সময়ে এই সেচের জল তুলতে হয় ভূগর্ভ থেকে। তাতে ভূগর্ভে জলস্তর ক্রমাগত নিচে নামে। বর্ষায় বৃষ্টির জল বেশিরভাগ মাটির ওপর দিয়ে ভেসে যায়, রোদে শুকোয়, অথবা জলাশয়ে পড়ে। তা ধরে রাখার ব্যবস্থা অপ্রতুল। শুকনো বোরো মৌসুমে সেচ চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। পরিণামে মাটির তলায় জলস্তর নিচে নামতে নামতে অল্প সময়ের ব্যবধানেই মাটি শুকিয়ে কাঠ হওয়ার আশঙ্কা। তখন সেচের জল আর মিলবে না। ফলনে ঘটবে বিপর্যয়। এই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে স্যার ভাবতে শুরু করেন বিকল্প কৃষিচক্রের কথা। তাতে ধান চাষের প্রধান মৌসুম হবে আগের মতো, আমন। বর্ষার জলই তাতে সেচের জন্য সাধারণত যথেষ্ট হওয়ার কথা। পাশাপাশি যে জলরাশি ভেসে যায়, তা ধরে রাখার পরিকল্পনা গুরুত্ব পেতে পারে। অনাবৃষ্টি সমস্যা সৃষ্টি করলে বর্ষায় ধরে রাখা জলের সঞ্চয় তখন সেচের কাজে সহায়ক হতে পারলে সমস্যার সমাধান মিলবে। বোরো মৌসুমে কম-জলনির্ভর গম ও রবিশস্য ফলনে জোর দিলে ফসল উৎপাদনে যেমন ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে, তেমনই সাংবৎসরিক শ্রমনিয়োগে প্রত্যাশিত গতিশীল স্থিতিশীলতার আশা অনেক বেশি উৎসাহ পাবে। দুটো কাজকে অতএব আলাদা করে দেখা যায় না। একটার যৌক্তিক ও বাস্তব সমাধান প্রয়োজনে অন্যটার। কিন্তু দুটোই অসমাপ্ত থেকে যায়। স্যার এই উদ্যোগকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। তিনি দেখেন, অশুভ শক্তির কায়েমি স্বার্থ পুরোপুরি তার বিপক্ষে। প্রায়ই তিনি বলতেন, ওদের খাটো করে দেখা নির্বুদ্ধিতা। সব প্রশ্নের জবাব তৈরি রাখা চাই। এদিকে দেশে-বিদেশেও, নিত্যনতুন ফন্দি-অভিসন্ধি। মেজাজ হারিয়ে স্যার তাদের মোকাবিলা করার লক্ষ্যে নতুন নতুন তথ্যের পেছনে ছোটেন। তার আশঙ্কা, নইলে বিচার-বিশ্লেষণপ্রত্যক্ষের জবাবেঅসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যখন তিনি চলে যান, তখনো এই ছোটায় তার বিরাম ছিল না।

আজ আমার আক্ষেপ, এত বড় মাপের এই কাজ শেষ হয়নি। তিনি একাই থাকতেন। তার জড়ো করা তথ্য কোথায় কী হলো, তাও জানি না। এদিকে সময় বসে থাকে না। তা ক্রমধাবমান। বাস্তব কেবলই ভোল পাল্টায়। নতুন নতুন প্রশ্ন নতুন নতুন উত্তরের মুখাপেক্ষী। সবাই তাদের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যস্ত। তার মেধার চর্চা পথের একপাশে পড়ে থাকে। এরই ভেতর, আগেই বলেছি, কানে এলো গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা। যা বিশেষ করে মনে দাগ কাটে, তা হলো এবার নোবেলজয়ীদের কাজ বৈশি^ক দারিদ্র্য নিয়ে। স্যার-এরও তাই। তবে তার নৈতিক দায়বদ্ধতা ছিল মূলত এই বাংলার দারিদ্র্যের গতি-প্রকৃতি নিয়ে। এবং দৃষ্টি প্রসারিত ছিল সমাজ বাস্তবতার সবটুকুসমেত আরও গভীরে। সে তুলনায় তার অবদানকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখি, এ নিয়ে আমার সংশয় থেকে যায়। আক্ষেপটাও বাড়ে। (সমাপ্ত)

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সাবেক সদস্য এবং শিক্ষাবিদ ও লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত