ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:২৯ পিএম

২০২১ সালে সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের আগ্রহ সবসময়ই তুঙ্গে থাকে এবং তারা নির্বাচনে বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করতে চায়। ইতিমধ্যে এ বছরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নানা অনিয়ম, নির্বাচনী সহিংসতা ও হতাহতের খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে। তারপরও বিভিন্ন ধরনের আয়োজন ও গণমাধ্যমে প্রার্থীদের সরগরম উপস্থিতিতে মনে হচ্ছে প্রার্থীদের মধ্যে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।

নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সবার জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। বলা হয়, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনরা অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে যেখানে বিরোধীরা এমনিতেই কোণঠাসা। অর্থ ও পেশিশক্তির কাছে অনেক কিছুই যেন ধরাশায়ী। এত কিছুর পরও মূল প্রশ্নটা হচ্ছে স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা কী এবং আমরা এর সুবিধা কতটুকু পাচ্ছি? স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে বা বাস্তবায়ন করার সুযোগই আছে কতটুকু? এই প্রশ্নের উত্তর খুব কঠিন নয়, আবার তা সহজও নয়। তবে বলা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদ্দেশ্য যদি হয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তাহলে এখনো অনেক কিছু করার আছে, অন্তত অভিজ্ঞতা তাই বলে। 

বাংলাদেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়ে থাকে এবং এজন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিবর্তন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ এলো, গেল ও আবার এলো, তবে কিছুটা ভিন্নভাবে। নতুন করে জেলা পরিষদ গঠন হলো। সবকিছু বিবেচনায় আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সুসংগঠিত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। অন্তত আমাদের সংবিধানে উল্লিখিত মূল চেতনা অনুযায়ী হয়নি একথা বলাই যায়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে ‘স্থানীয় শাসন’ এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে স্থানীয় সরকার নয়। বলা হয়েছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে। ‘স্থানীয় শাসন’ কথাটি আসলে অনেক মর্মার্থ বহন করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিবেচনার জায়গা থেকে।

স্থানীয় সরকারের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ বাংলায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। এর মধ্যে ১৮৮৫ সালে আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন কমিটি, স্থানীয় সরকার বোর্ড ও জেলা বোর্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আরও বিস্তৃতি ঘটে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এর নানা ধরনের পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে কিন্তু এতে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি খুবই কম বিবেচনা করা হয়েছে বলে দৃশ্যত মনে হচ্ছে। আমরা প্রায়শই শুনি স্থানীয় সরকারে যেমন সম্পদ সংগ্রহের ব্যবস্থা সীমিত, একইসঙ্গে স্থানীয় সরকারের কাঠামোগুলো খুবই ভঙ্গুর, সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন এবং প্রায় সবক্ষেত্রই কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল।

অন্যদিকে আমরা যদি স্থানীয় পর্যায়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতা কাঠামো পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা কাঠামোও তার ব্যতিক্রম নয়। এতে জনগণের স্বার্থ বা মঙ্গলচিন্তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পায় না। করোনা শুরুর সময় থেকে আমরা স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধির দুর্নীতির খবর পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে অনেক চেয়ারম্যান ও সদস্যকে বরখাস্ত হতে দেখেছি। আপাতদৃষ্টিতে এই উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক মনে হলেও এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় স্বাধীনতার এত দিন পরেও আমাদের দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভিত্তি খুব নাজুক, এমনকি এর দর্শনগত ভিত্তিও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। অধিকন্তু এটি কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থার একটি সম্প্রসারিত কাঠামো যার মূল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার বা তার প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত। একথা সত্য স্থানীয় সরকারের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে, তার মধ্যে দুর্নীতি আছে কিন্তু এই সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সত্যিকারের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়বদ্ধতা আছে। আমরা দেখি সবগুলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আমলাতন্ত্রের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, জনগণের কোনো উচ্চতর প্রতিনিধির কাছে নয়। ফলে জনপ্রতিনিধি ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশই বাড়ছে বলে আমরা সংবাদপত্রের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখতে পাই। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কতটুকু সম্ভব। এর উত্তরে বলা যায় অবশ্যই সম্ভব, তবে এর জন্য বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনা অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের সামগ্রিক ব্যবস্থা ও কাঠামোর পরিবর্তন আনতে হবে এবং এর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে। আর পরিবর্তন করতে হবে প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে যার মাধ্যমে আমলাতন্ত্র ও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা তৈরি হবে।

স্বাধীন বংলাদেশের অভ্যুদয়ই হয়েছিল সামরিকতন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যেমে। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের পথপরিক্রমায় এই সংস্কৃতিতে আমরা কতটুকু পরিবর্তন আনতে পেরেছি তা এখনো প্রশ্নের বিষয়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ আমাদের সমাজব্যবস্থায় অধরাই থেকে যাচ্ছে, প্রচলিত ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো কোনোভাবেই ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকতে চাচ্ছে না এবং অন্যকেও সুযোগ দিচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশের সব জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারার নিয়ে আসতে চাইলে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈষম্যগুলো কমিয়ে আনতে হবে এবং এজন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। এর মাধ্যমেই প্রকৃত অর্থে সাধারণ জনগণকে ক্ষমতার অংশীদার করা যায় এবং তাদের প্রয়োজনের আলোকে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যায়।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত