সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে নকশাল নারীর নির্মাণ

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:৩০ পিএম

আন্তর্জাতিকভাবে ষাটের দশককে কমিউনিস্টরা মুক্তির দশকে পরিণত করার ডাক দিয়েছিল। সেই মুক্তি আদৌ হয়েছে কি না সেটা বিতর্ক সাপেক্ষ। তবে ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া ভারতের নকশাল আন্দোলন ভারতের বাইরে পূর্ব পাকিস্তানসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির নকশালবাড়ির একটি গ্রামে পুলিশের গুলিতে মারা যায় দুই শিশুসহ মোট ১১ জন। জোতদার ও পুলিশের যৌথ অত্যাচারের বিরুদ্ধে নকশালবাড়ি আন্দোলন সশস্ত্র হয়ে ওঠে। এ আন্দোলনে যোগ দেন হাজার হাজার তরুণ। এ আন্দোলন ভারতে বহু চলচ্চিত্র, উপন্যাসসহ শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় এসেছে। সে সবের নায়ক কলকাতাকেন্দ্রিক পুরুষরা। অথচ ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। এটা সত্য যে কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ছেলেরা এই আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশ নেন। কিন্তু এটাই তো নকশাল আন্দোলনের প্রধান ফ্রেম না। এ আন্দোলনের অন্যতম কাঠামো ছিল গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও এবং সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম। ফলে নকশালবাড়ি, ফাঁসি দেওয়া, মেদিনীপুরের ধান কাটার লড়াই এ আন্দোলনের অন্যতম সফল দিক। আবার ডুয়ার্সভ্যালির চা-বাগানের শ্রমিকদের হরতাল বা হাওড়া আর বর্ধমানের কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়া অনেক বড় ঘটনা।

এ পর্যন্ত নকশাল আন্দোলন নিয়ে লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস হলো সমরেশ মজুমদারের কালবেলা। সেখানেও এসবের খুব বেশি বর্ণনা নেই। তবে এ থেকে একদম পৃথক স্বর্ণ মিত্রের ‘গ্রামে চলো’ উপন্যাসটি। সেটাতে বরং গ্রামের লড়াই দারুণভাবে এসেছে। আর চলচ্চিত্রে নকশাল আন্দোলন এসেছে অনেকবার কিন্তু সেখানেও কি ধানক্ষেতে কৃষকের লড়াই, শ্রমিকদের আন্দোলনে যোগ দেওয়া কিংবা চা শ্রমিকদের বিভিন্ন ইউনিটে দারুণ সব সংগ্রামের ছবিটা পাওয়া যায়? নকশাল আন্দোলন নিয়ে অনেকগুলো চলচ্চিত্র দেখেছি। সব মনেও নেই। যেগুলো মনে আছে সেসব হলো যুক্তি তর্ক গল্প, মেঘনাদবধ কাব্য রহস্য, হারবার্ট, কালবেলা, নকশাল, ড্রাকুলা স্যার। এ ছাড়া সুফিয়ানা নামে একটি ওয়েব সিরিজ দেখেছি আড্ডা টাইমসে। এর মধ্যে নকশাল চলচ্চিত্রটা একদমই বাণিজ্যিক। বাণিজ্যিক ধাঁচের ক্লাইম্যাক্স থাকার পরও চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিক হিসেবে খারাপ হয়নি। ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তর্ক গল্পের শেষটা একদল নকশালের সঙ্গে শহুরে বুদ্ধিজীবীর আলাপ ও পুলিশের অ্যাকশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। সেখানেও নকশাল আন্দোলনে গ্রামের কৃষকের ভূমিকা তেমন নেই। হারবার্ট মুভিতে কৃষক ও শ্রমিকের লড়াই নেই। কালবেলা মুভিতে গ্রামের কিছু বিষয় থাকলেও প্রধানত এ মুভির গল্প শহর কলকাতার। মেঘনাদবধ কাব্য রহস্য আদিবাসী এলাকার কিছু কথাবার্তা আছে কিন্তু প্রধান চরিত্র শহর কলকাতার।

ঔপন্যাসিকরা ‘নকশাল’ বলতে একটি চিরচেনা চরিত্র আমাদের দু’চোখে সেঁটে দিয়েছেন। সেটা অনেকটা এরকম যে, কোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যুবক কলকাতার নামি কলেজে পড়তে এসে নকশাল হয়ে যান। এরপর তার প্রেমে পড়ে সুচিত্রা সেনের মতো হৃদয়কাড়া কোনো এক নারী। এক সময় নকশাল যুবক ধরা পড়েন, বড়লোকের ছেলে হলে সেইফ প্যাসেজ নিয়ে আমেরিকায় (পড়ুন পুত্র পিতাকে : চানক্য সেনের উপন্যাস) আর যদি মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত হয় তাহলে কোনো এক শীতের শেষ রাতে পুলিশের জিপ থেকে যুবককে নামিয়ে পুলিশ বলবে যা তোকে ছেড়ে দিলাম। দৌড় দে। চাদর গায়ে দেওয়া খুবই রোমান্টিক দেখতে যুবক কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া অবস্থায় দৌড়াতে শুরু করবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে পুলিশ গুলি করবে। অথবা ভয়াবহ নির্যাতনের মাধ্যমে নকশাল যুবককে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হবে। আর সেই পঙ্গু যুবকের দায়িত্ব নেবে তার প্রেমিকা। এই ন্যারেটিভের বাইরে নকশাল আন্দোলনের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ও উপন্যাস খুব একটা বের হতে পারেনি। কেন পারেনি? এর সহজ জবাব হলো নকশাল আন্দোলনে অংশ নেওয়া দরিদ্র কৃষক, আদিবাসী ও শ্রমিকের পক্ষে উপন্যাস লেখা সম্ভব হয়নি। আর ভদ্রলোকেরা যখন উপন্যাস লিখেছেন তখন নিজেকে ইতিহাসে বাঁচিয়ে রাখার লোভ সামলাতে পারেননি।

শুধু কি আদিবাসী, কৃষক, শ্রমিক নকশাল আন্দোলন থেকে নাই হয়েছেন? নকশাল আন্দোলন থেকে নারীকেও নাই করে দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি না নকশালবাড়ির শহীদ নারী ধনেশ্বরীর জীবনের গল্প। জানি না নকশাল আন্দোলনের কর্মী শান্তি মুণ্ডার কথা। মধ্যবিত্ত আরবান পুরুষ মিডলক্লাস নকশাল আন্দোলনের উপখ্যান থেকে তাদের হটিয়ে দিয়ে নিজেরা জায়গা করে নিয়েছে। নকশাল আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন চারু মজুমদার বা ‘সিএম’। সিএম-এর স্ত্রী ছিলেন লীলা মজুমদার সেনগুপ্ত। লীলা মজুমদার নিজে পার্টি মেম্বার ছিলেন, আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আবার সংসার সামলেছেন। শুধু তাই নয় অসুস্থ শ্বশুরের সেবা থেকে শুরু করে পার্টি ও পরিবারের মধ্যমণি ছিলেন লীলা মজুমদার। পার্টি কমরেডরা লীলা মজুমদারকে লীলাদি বলে জানতেন; সেই লীলাদি বা লীলা মজুমদার কিন্তু ইতিহাসে নেই।

নকশাল চরিত্রকে কেন্দ্র করে তৈরি করা চলচ্চিত্রে সব সময় প্রধান চরিত্র হন পুরুষ। কালবেলার অনিমেষের দিকে তাকান, সে কেমন লড়াকু। কিন্তু মাধবীলতা যিনি অনির রাজনীতির পক্ষের মানুষ না হয়েও অনিকে ভালোবেসে সব কিছু উজাড় করে দেবেন। নকশাল আন্দোলন নিয়ে আলোচিত উপন্যাসের আরেকটি হলো মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’। অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান ব্রতী নকশাল হয়ে যায়। একদিন সে খুন হয়। ব্রতীর মা সুজাতার জবানিতে উঠে আসে তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের গল্প। কিন্তু সে তো সন্তান ও মায়ের গল্প। বাস্তবের নকশাল আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা কী এতই সামান্য?

সম্প্রতি চারু মজুমদারের স্ত্রী লীলা মজুমদারকে নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন মৌসুমী ভৌমিক। নাম ‘লীলাদি : এক অন্য রাজনৈতিক যাপন’। এখানে অসামান্য সব লেখা পাবেন। ভারতীয় গবেষক শ্রীলা রায়ের ‘রিমেম্বারিং রেভল্যুশন’ দারুণ বই। সেখানে নকশাল আন্দোলনে নারীর কথা জানতে পারবেন। ‘নকশাল আন্দোলনে মেয়েরা’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। এটিও ভালো কাজ। খেয়াল করুন, এই তিনটি বইয়েরই সম্পাদক বা লেখক নারী। ভারতে যাও-বা নকশাল আন্দোলনে নারীর ভূমিকা নিয়ে কিছু গবেষণামূলক কাজ হয়েছে, বাংলাদেশের অবস্থা আরও খারাপ। অথচ বাংলাদেশে নকশাল আন্দোলনে নারীর দারুণ সব কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একমাত্র নেসার আহমেদের গ্রন্থ ‘নকশাল দ্রোহে নারী’ ছাড়া আমার চোখে অন্তত কিছু পড়েনি।

অন্যান্য নকশাল গল্পের মতো ‘ড্রাকুলা স্যার’ সিনেমাও কলকাতাকেন্দ্রিক। অমল নামে একজন নকশাল কমিউনিস্ট ১৯৭২ সালে ধরা পড়েন। তারপর এক শীতের সকালে তাকে পুলিশের জিপ থেকে নেমে দৌড়াতে বলা হয়। অমলের গায়ে কালো চাদর পেছন থেকে পুলিশের ছোড়া গুলিতে নিহত হয় অমল। আর তার প্রেমিকার গল্পটিও ঠিক গতানুগতিক। প্রেমিকা নকশাল না, কিন্তু তিনি নকশালের প্রেমে পড়েন। নাম মঞ্জুরী। মঞ্জুরীর বাড়িতেই অমল পালিয়ে ছিল। সেখান থেকে তাকে ধরা হয়। গল্প এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। সবকিছু মিলে যাচ্ছে। কলকাতা, কবিতা, সশস্ত্র শ্রেণিসংগ্রাম, নকশাল না হয়েও নকশালকে প্রেমিকা আশ্রয় দিচ্ছে একদম খাপে খাপ।

কিন্তু একদম মুভির শেষে জানা যায়, একদম শেষে; অমল আসলে সেদিন পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি। অমল থানায় পুলিশের নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে তার কমরেডদের ঠিকানা বলে দিয়ে নিজে সেইফ প্যাসেজ নিয়ে চলে যায়। আর মঞ্জুরী যে কোনোদিন নকশাল আন্দোলন করেনি যে জানে না শ্রেণিশত্রুর রক্তে না রাঙালে কমিউনিস্ট হওয়া যায় নাযে চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান নাকি মেম্বার তাও জানে নাসেই মঞ্জুরী থানায় ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে একটা নামও বলেনি। সব গড়গড় করে বলে দেওয়া অমল সেইফ প্যাসেজ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে নেতাদের ধরিয়ে দেয়। আর মঞ্জুরী নকশাল না হয়েও বিপ্লবের জন্য নিজের জীবন দান করে। গোটা সিনেমাতে এই শেষ তিন মিনিট হলো পালিয়ে যাওয়া পুরুষতন্ত্রের যে প্রতিনিধিরা ফেইক নায়ক হয়ে বসে আছে ইতিহাসে; সেই বিপ্লবী পুরুষ নকশালকে টেনেহিঁচড়ে মাটিতে নামিয়ে আনা।

লেখক সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত