জীবনঝুঁকিতে কর্মীরা ১০ বছরে ১৩৫ মৃত্যু

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৩:২৭ এএম

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর মাজড়া গ্রামের মো. মোতালেব মোল্লার বড় ছেলে নওশের মোল্লা। ছয় ভাইয়ের মধ্যে বড় নওশেরই ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। কাজ করতেন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) লাইনম্যান হিসেবে। স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন নীলা, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে চলছিল তাদের লড়াইয়ের সংসার। ২০১৫ সালের ২০ জুন মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সরবরাহ লাইনে কাজ করার সময় নিহত হন নওশের। তার জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারেও যেন নেমে আসে লোডশেডিংয়ের মতো ঘন কালো অন্ধকার।

ক্ষতিপূরণ ও চাকরির আশায় আরইবি চেয়ারম্যান মইন উদ্দিনের কাছে গিয়েছিলেন নিহত নওশেরের স্ত্রী নীলা। কিন্তু চাকরি বা ক্ষতিপূরণ কোনোটিই মেলেনি তার, উল্টো জুটেছে অপমান। নীলার অষ্টম শ্রেণি পাস নিয়ে চেয়ারম্যান এবং তার অফিসকক্ষে উপস্থিত আরইবির অন্য কর্মকর্তারা উপহাস করেন।

হঠাৎই তার জীবন-সংসারে ছন্দপতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে নীলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসার কোনোভাবেই চলে না। গেছিলাম চেয়ারম্যান স্যারের কাছে, যদি একটা চাকরি জোটে, কিছু ক্ষতিপূরণ পাই। সেসব কিছুই দেয়নি তারা। অষ্টম শ্রেণি পাস নিয়ে চাকরি চাইতে গেছি সে কারণে ওনারা খুব হেসেছিল, খুব অপমান করেছে। এরপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি এতগুলো বছরে।’

নওশেরের মতো এভাবে গত ১০ বছরে পল্লী বিদ্যুতের ১৩৫ কর্মী কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হয়েছেন। কিন্তু এসব কর্মী কেউই ক্ষতিপূরণ পাননি। নিহতের পরিবার উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসার উপায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লাইনে কাজ করার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করায় কর্মীরা মারা গেছেন; সে কারণে নিহতদের পরিবার এসব মৃত্যুকে হত্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।

১৩৫ কর্মী নিহত হয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে মইন উদ্দিনের সময়। গত প্রায় ১০ বছর তিনি পল্লী বিদ্যুতের দায়িত্ব পালন করছেন। নিহত কর্মীদের সবাই লাইনম্যান। আরইবির ৮০টি সমিতি থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, লাইনম্যান পদের এসব কর্মীর সাপ্তাহিক কোনো ছুটি না থাকার পাশাপাশি রয়েছে কাজের বাড়তি চাপ। লাইন মেরামতের সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করে দেওয়ায় তারা মারা পড়ছেন। সারা দেশে আরইবির তিন কোটি ছয় হাজার গ্রাহকের বিপরীতে সেবার জন্য লাইনম্যান রয়েছেন মাত্র ১৮ হাজার। লাইনম্যানদের কাজ নতুন সংযোগ দেওয়া এবং লাইনে যেকোনো ধরনের ত্রুটি মেরামত করা। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে দিনেরাতে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বল্পসংখ্যক লাইনম্যানদের। বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা এ মৃত্যুকে অস্বাভাবিক ও হত্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আরইবির চেয়ারম্যান মইন উদ্দিন। তিনি টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবাইকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ ঠিক নয়। অনেককে চাকরিও দেওয়া হয়েছে।’

দুর্ঘটনা না হত্যা : আরইবির লাইনম্যানরা ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি একে দুর্ঘটনা বললেও নিহতের পরিবার ও অন্য লাইনম্যানরা একে হত্যা হিসেবেই মনে করেন।

গত বছর ২৩ জানুয়ারি একই দিনে দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে লাইন মেরামত করতে গিয়ে লাইনম্যান তন্ময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। একইদিন দিনাজপুরের রানীগঞ্জে লাইন মেরামত করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন লাইনম্যান মো. হায়দার আলী ও মজিবুর রহমান। দুজনকেই রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। সেখানে মারা যান হায়দার আলী। একই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে আরইবির লাইনম্যান মো. জিয়াউল হক কর্মরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান।

দুর্ঘটনায় আরইবির কর্মচারীদের মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরইবি প্রায় তিন কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। এ সেবা দিতে গিয়ে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে। এ মৃত্যু আসলেই দুঃখজনক। আরইবির মহাব্যবস্থাপকদের (জিএম) নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি। তাদের বলেছি দুর্ঘটনা রোধ করতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তবে আরইবি কর্মীদের কাজে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছি।’

লাইনম্যানদের মিলবে না সাপ্তাহিক ছুটি : সারা দেশে আরইবির ৮০টি সমিতি রয়েছে। এসব সমিতিতে সব মিলিয়ে ১৮ হাজার লাইনম্যান কর্মরত আছেন। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি দেশের তিন কোটি ছয় হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎসেবা দিচ্ছে। ১ হাজার ৫০০ গ্রাহকপ্রতি একজন লাইনম্যান রয়েছেন।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ আরইবির পরিচালক (প্রশাসন) চৌধুরী মোস্তফা হাবীব স্বাক্ষরিত একটি চিঠি আরইবির সব সমিতিতে পাঠানো হয়। এতে জানানো হয়, সব কর্মদিবস ও ছুটির দিনেও যথারীতি নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের কার্যক্রম চলমান থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা ও বাড়তি কাজের চাপ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘অবহেলায়’ একের পর এক শ্রমিক নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাপ্তাহিক ছুটির বিষয়ে গত বছর ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে আরইবির প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাইনম্যানদের ছুটি দেওয়া যাবে না বলে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। ইতিমধ্যে আরইবির সমিতিগুলোর মহাব্যবস্থাপকরা অফিস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছেন।

আরইবির একাধিক লাইনম্যানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে লাইনম্যানরা লাইন মেরামতের সময়। নিয়ম অনুযায়ী লাইনম্যানরা কোনো খুঁটিতে কাজ করার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। কিন্তু কাজ চলার মাঝপথে লাইন চালু করে দেওয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হয়েছেন লাইনম্যানরা। এভাবে গত ১০ বছরে আরইবির ১৩৫ জন কর্মী বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। আর উল্লিখিত সময়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন প্রায় দুই হাজার কর্মী। তবে এসব ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, এমনকি নেওয়া হয়নি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও।

দুর্ঘটনার হার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে একাধিক লাইনম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আরইবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রতিটি সমিতিকে মাস ও বছরের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দায়িত্ব থাকে লাইনম্যানদের ওপর। এছাড়া বিদ্যুতের সরবরাহ না বাড়িয়ে সংযোগ বৃদ্ধির কারণে আরইবির আওতাধীন এলাকাতে কম ভোল্টেজের ফলে ট্রান্সফরমারের ফিউজ কেটে যাওয়া অথবা বিস্ফোরণ ঘটে বিদ্যুৎ চলে গেলে তখনই ছুটে যেতে হয় লাইনম্যানদের। একদিকে সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা, অন্যদিকে বছরজুড়েই কম ছুটির কারণে মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল থাকেন এসব কর্মী।

আরইবির লাইনম্যানরা আরও জানিয়েছেন, দিনে অন্তত ১৫টি লাইন মেরামতের ডাক পড়ে। এত অধিক সংখ্যায় কাজ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তারা হাতে রাবারের গ্লাভস ও পায়ে রাবারের বুট পরার সময় পান না। এসব সরঞ্জাম পরে কাজ করতে হলে দিনে সর্বোচ্চ ছয়-সাতটি নতুন সংযোগ বা নষ্ট সংযোগ মেরামত করা যায়। আর কাজের এ বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে গিয়েই ঘটে দুর্ঘটনা। এছাড়া প্রতি মাসে নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে হাতেকলমে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ হয় না। লাইন মেরামতের মাঝখানে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করারও অভিযোগ রয়েছে আরইবি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠান কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরইবি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সে কারণে নিয়মিতভাবে সেখানকার কর্মীরা মারা যাচ্ছেন। এ মৃত্যু দুর্ঘটনা না হত্যা তা খতিয়ে দেখা উচিত সরকারের, সেজন্য মানবাধিকার কমিশনের উচিত তদন্ত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানই জীবন সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মাত্র ১০ বছরে ১৩৫ জন কর্মী কাজ করতে গিয়ে নিহত হওয়ার পরও কেউ অভিযুক্ত হলেন না, এটা সত্যি বিস্ময়ের ব্যাপার।’ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে এসব মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করারও আহ্বান জানান ক্যাবের এ উপদেষ্টা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত