ঢাকাবাসী এখন মেট্রোরেল, চট্টগ্রামবাসী কর্ণফুলী টানেল এবং দেশবাসী পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া স্থানে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করার পরিকল্পনাও সরকারের আছে। গ্রামে-গঞ্জে রাস্তাঘাটের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে আঁকাবাঁকা পাকা রাস্তা শহরের রাস্তার চেয়েও সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন মনে হয়। শহর থেকে গাড়ি নিয়ে গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে মানুষ প্রতিনিয়তই নিজ গ্রামে চলে যাচ্ছে, অনায়াসে অংশগ্রহণ করছে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, মিলিত হচ্ছে পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে।
এদিকে ঢাকাবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও সহজ, আরামদায়ক ও বৈচিত্র্যময় করার লক্ষ্যে মেট্রোরেলের পাশাপাশি ঢাকার চতুর্দিকে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং তৎসংলগ্ন নদীপথে ওয়াটার বাস চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মেট্রোরেলের কাজ পুরোদমে চলছে এবং আশা করা যাচ্ছে যে এ বছরের (২০২১) ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রাক্কালে আগারগাঁও-উত্তরার রুটে এই মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হবে। কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ই-টিকেটিং এবং এয়ারকন্ডিশন সার্ভিস চালু করেছে কর্র্তৃপক্ষ। এভাবে দেশের আপামর জনসাধারণকে স্বল্প খরচে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত সেবা দিতে কাজ করে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো।
দেশব্যাপী রেল কর্র্তৃপক্ষ নিয়েছে আরও মহাপরিকল্পনা। বাংলাদেশ রেলওয়ে দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার (সাসেক) আওতায় রেলওয়ের হালনাগাদ মাস্টারপ্ল্যান ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০৪৫ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণসহ মোট ২০টি রেলপথ ও রেলসংযোগ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকার টঙ্গী থেকে মানিকগঞ্জ-পাটুরিয়া পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে। পদ্মা রেলসেতু সংযোগ প্রকল্পের সঙ্গে সংযোগ রেখে কেরানীগঞ্জ থেকে নিমতলী পর্যন্ত (মানিকগঞ্জ-পাটুরিয়া) রেললাইন নির্মাণের জন্য উপযুক্ত রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া যাওয়ার পথে গাবতলী, বলিয়ারপুর, হেমায়েতপুর, সাভার, জাহাঙ্গীরনগর, নবীনগর ও ধামরাই এবং অপর আরেকটি শাখা টঙ্গী, ইপিজেড, আশুলিয়া হয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার দিকে রেলপথটিকে চলমান করার জন্য এই অঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা এবং মুজিব শতবর্ষে এর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, একসময় ঢাকা-আরিচা সড়ক ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। যমুনা সেতু হওয়ার পর এর ব্যস্ততা কিছুটা কমলেও ঢাকা থেকে পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া হয়ে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে এখনো যাতায়াতের সহজ সড়ক হিসেবে ঢাকা-আরিচা সড়কটিই প্রধান। মানিকগঞ্জ জেলা কৃষিনির্ভর হলেও বর্তমানে এ জেলায় শিল্পবিপ্লব ঘটছে। এসব শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্য ঢাকাসহ সারা দেশে পরিবহনের জন্য ট্রেন খুবই উপযোগী একটি মাধ্যম হতে পারে। তাই ঢাকা থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত উক্ত রেলপথটি স্থাপিত হলে একদিকে যেমন সাভার, মানিকগঞ্জ, ধামরাই এলাকার মানুষ প্রতিদিন ঢাকায় অফিস করে আবার বাড়ি ফিরে যেতে পারবেন। অপরদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া স্থানে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হলে এই ট্রেন লাইনের মাধ্যমে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, যশোর, পাবনা, নাটোর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করা সহজ হবে।
বিশ্বের প্রতিটি জনপদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ওই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকে। সাধারণত হাইওয়ে কিংবা মূল সড়ক থেকে একটু দূরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান থাকলেও ক্যাম্পাসে ঢোকার জন্য সাবওয়ে তৈরি করে দেওয়া হয়, আর বাহন হিসেবে বাস-ট্রেন উভয়েরই ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাহন হিসেবে বাসকে ব্যবহার করা হয়। অবশ্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেনে যাতায়াত করা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে হওয়ায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী বাসে চড়ে ঢাকা-ক্যাম্পাসে যাতায়াত করে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়টি আবাসিক এবং এর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও এখানে আছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সাভার ক্যান্টনমেন্ট, গণবিশ্ববিদ্যালয়, বিপিএটিসি, বিকেএসপি, ইপিজেড, মিলিটারি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, মির্জা গোলাম হাফিজ কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাটবাজার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ গরিব শিক্ষার্থী টিউশনি ও অন্যান্য কাজের জন্য এবং মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ওই এলাকার সব যাত্রী একমাত্র বাসে চড়েই সাভার, আশুলিয়া, ইপিজেড, টঙ্গী এবং ঢাকায় যাতায়াত করে থাকে। ফলে প্রায়শই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনব্যাপী ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে থাকতে হয়, নষ্ট হয় সাধারণ যাত্রীসহ শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় ও অর্থ। আর বেপরোয়া গাড়ি চলাচলের ফলে প্রায়ই মারাত্মক দুর্ঘটনার ফলে প্রাণহানি ঘটে অসংখ্য।
এসব বিবেচনায় ঢাকা থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত রেললাইনের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বর্ণিত অন্য স্টেশনগুলোর সংযোগ থাকলে শিক্ষার্থীসহ ওই এলাকার লাখ লাখ মানুষ ঢাকা এবং আশপাশের শহরগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে, কম সময়ে এবং নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, বাৎসরিক ইত্যাদি বিশেষ টিকিটের ব্যবস্থা এবং ছুটির দিনে শিক্ষার্থীদের জন্য পার্টটাইম কাজের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রেল সংযোগ রাখার পরিকল্পনা বাঞ্ছনীয়।
রেলের যন্ত্রপাতি এবং বগি কেনার জন্য এখনো জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশের ওপর আমরা নির্ভরশীল এবং এজন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। তাই দক্ষ জনবল তৈরি করার লক্ষ্যে রেলওয়ে কমিউনিকেশন (সিগন্যালিং, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড মেকানিক্স) ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।
লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
sarker@juniv. edu
