একদিকে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শুরুর জোর প্রস্তুতি, অন্যদিকে স্থানীয়দের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর আতঙ্ক। এমন পরিস্থিতিই বিরাজ করছে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা লালদিয়ার চরকে ঘিরে। আদালতের নির্দেশনা পালনে আগামীকাল সোমবার থেকে লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ (চবক)। অন্যদিকে উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবিতে প্রতিদিনই কর্মসূচি পালন করছেন সেখানকার বাসিন্দারা। তাদের এ দাবির প্রতি সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও। তাদের সবারই দাবি, সরকার যদি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে পারে, তাহলে নিজ দেশের নাগরিকদের কেন পুনর্বাসন ছাড়া বাস্তুহারা করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী লালদিয়ার চরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দেয় হাইকোর্ট। সিএমপি কমিশনার, জেলা প্রশাসক, র্যাব কমান্ডার, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশনসহ সেবা সংস্থাগুলোকেও (ওয়াসা, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ) এই সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সহসা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী লালদিয়ার চরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ঘোষণা দেয় বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়।
এ বিষয়ে বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আগামীকাল স্থাপনা উচ্ছেদের সম্ভাব্য তারিখ ধরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যেহেতু এ উচ্ছেদ কার্যক্রমের সঙ্গে আরও বিভিন্ন সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই তাদের কাছেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে।’
স্থানীয়রা জানান, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই লালদিয়ার চরে বসবাসকারী প্রায় ১৪ হাজার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ না করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে সেখানকার বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা ছাড়াও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে তারা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেন।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার শাহ আমানত বিমানবন্দরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘লালদিয়ার চরে অবৈধ স্থাপনা রাখার কোনো সুযোগ নেই। এতদিন যাবৎ যারা এগুলো দখল করে রেখে ফায়দা লুটেছেন, তাদেরও তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সময় নিয়ে সেই সব দখলদারকারীকে চিহ্নিতের পর আইনের আওতায় আনা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা গৃহহীন কিংবা যাদের কোনো সহায়-সম্বল নেই, তাদের পুনর্বাসন করা হবে। যারা সচ্ছল, তাদের পুনর্বাসন করার কোনো সুযোগ নেই। যারা এখানে আছে অধিকাংশই ভাড়াটিয়া। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল দখল করে ভাড়াটিয়া রেখে অর্থ আদায় করছে। কারণ কম ভাড়ায় এখানে থাকতে পারে। এরা সব সচ্ছল পরিবার থাকে। অন্য জায়গায় যাওয়ার মতো অবস্থা তাদের আছে।’
এ বক্তব্যের একদিন পর শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আলমগীর হাসান বলেন, ‘নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, এখানে ভাড়াটিয়ারা থাকে। যৌথ সংবাদ সম্মেলন করলে সেটার উত্তর বের হবে। বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে আদালতের প্রতিনিধিসহ নিয়ে সার্ভে করা হোক। এখানে যদি আদি বাসিন্দাদের বাইরে কেউ থাকে, তাহলে তা বের হবে।’
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিদায়ী প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘মুজিববর্ষে সরকার যেখানে গৃহহীনদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে, সেখানে লালদিয়ার চরে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের উদ্যোগ অমানবিক। প্রশাসনের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা জামাত-বিএনপি চক্র আওয়ামী লীগ সরকারকে হেয় করতে এ কাজে ইন্ধন জোগাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
