এক ক্রান্তিলগ্নে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন। আট বছর পর শনিবার অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আগামী ২ বছর এই দায়িত্ব পালন করবেন। ১৩ মার্চ আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হস্তান্তর। তার আগে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন
দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র সঙ্গে। দীর্ঘ ফোনালাপ সাক্ষাৎকার আকারে প্রকাশিত হলো এখানে
শনিবার মোহামেডানের নির্বাচন হয়ে গেছে। সভাপতি হিসেবে আগামী দু’বছরের জন্য নতুন একটা পরিচালনা পর্ষদ পেয়েছেন। আপনার অনুভূতি জানতে চাইছি।
আব্দুল মুবীন : আমার সত্যি খুব ভালো লাগছে। এত বছর পরে একটা এজিএম হয়েছে। সবাই এক জায়গায় বসেছেন। সুখ-দুঃখের কথা বলেছেন। শুনতে খুব ভালো লেগেছে। সবাইকে দেখলাম খুব আন্তরিক ও আগ্রহী। সবাই অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। নির্বাচনে কে জিতবেন, কে জিতবেন না তা নিয়ে তো কিছুটা টেনশন ছিলই। যেহেতু ১৬ জন পরিচালক পদ, প্রার্থী ২০ জন। কেউ না কেউ তো বাদ পড়বেন। তারপরও সবার মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব দেখেছি। নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই সবাই বলেছেন, ভিন্ন আঙিনা, ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসুক না কেন, একই প্ল্যাটফর্মে বসে সবাই ক্লাবকে নিয়ে ভাববেন। আমি বলব না যে রাতারাতি সবাই ক্লাবকে চূড়ায় নিয়ে যাবেন। তবে একটা আগ্রহ আছে সবার মধ্যে। এটা একটা পুরনো ক্লাব, এর ভিত অনেক বড়, অনেক গভীর। সমর্থনপুষ্ট এই ক্লাবটিকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। আমিও যেহেতু এই ক্লাবটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছি, সরকারপ্রধানও চাচ্ছেন যে মোহামেডানের যে ঐতিহ্য ছিল, সেটা ফিরিয়ে আনতে হবে। এর জন্য সময় লাগবে। তবে আমি মনে করি আমরা পারব।
অতীতে মোহামেডানের দায়িত্বে অনেকেই এসেছেন। অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু তার অনেক কিছুই পূরণ হয়নি...
আব্দুল মুবীন : হুট করে তো কিছু সম্ভব নয়। অনেকে তো অনেক কিছু বলেন, অনেক কিছুই করতে চান। মনের আকাক্সক্ষা তো সবারই আছে। আমার মনে হয় কিছু স্বল্পমেয়াদ অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। তাতে ফলও পাওয়া যাবে। পরের ধাপে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহও তৈরি হবে। হঠাৎ করে ৫০-৬০ তলা ভবন নির্মাণের মতো অবাস্তব চিন্তা করলে কিন্তু কাজ হবে না।
মোহামেডান ফুটবলকেন্দ্রিক একটি ক্লাব। অথচ দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে প্রবেশের পর মোহামেডান একবারও লিগ শিরোপা জিততে পারেনি। মাঠের পুরনো মোহামেডানকে ফিরিয়ে আনা আপনার প্রথম লক্ষ্য থাকবে কিনা?
আব্দুল মুবীন : আমি পরিষ্কার করে বলি, প্রথমে ঘরের ভেতরটা গুছিয়ে আনতে হবে। মোহামেডান ক্লাব পরিচালনার যে বিষয়টা, সেখানে একটা শৃঙ্খলা আনা দরকার। ক্লাবের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে একটা শৃঙ্খলা আনা দরকার। ক্লাব প্রাঙ্গণে কেউ বসে না, কেউ যায় না। মিটিং-সিটিং হয় অন্য জায়গায়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার যদির আত্মার সম্পর্কটা না হয় কাজের সঙ্গে, শুধু সভায় আসলেন, বসলেন, খাওয়া-দাওয়া করলেন, দুটি কথা বললেন, চলে গেলেন তাহলে কিছুই হবে না। তাই আমি আপনাকে এটা বলব না যে ফুটবল দলটাকে আগামী ছ’মাস বা ১২ মাসের মধ্যে একটা কিছু করে দাঁড় করাব। আমি চাচ্ছি সম্মিলিত প্রয়াসে ঘরটা আগে গোছাতে। সবার দায়িত্ব যেটা আছে, সেটা সবাই যাতে উপলব্ধি করেন, পরিচালক যারা হয়েছেন, এটা শুধু সম্মানের জন্য নয়, কিছু করণীয় আছে, কিছু দায়বদ্ধতা আছে, এটা বুঝতে হবে। প্রাত্যহিক যে সব কর্মকান্ড আছে, এগুলোর সঙ্গে সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
মোহামেডানের ঐতিহ্যে বড় কালির ফোঁটা ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়ানো। ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে আপনার আহ্বান কী থাকবে?
আব্দুল মুবীন : আমার ব্যাকগ্রাউন্ডটা নিশ্চয় আপনার জানা আছে। আমি এই প্রজাতন্ত্রের, এই সরকারের অধীনে অনেক সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। সরকারপ্রধানের আস্থা নিয়ে কাজ করার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি চাইব সে রকম একটা অবস্থান থেকে এখানে কাজ করতে। আমি বিশ্বাস করি যে আমি সেই পরিবেশ পাব। আমার সঙ্গে পরিচালক যারা নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তাদের অনেকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যারা হননি তাদেরও অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। মোটামুটি অনেককে আমি চিনি, অলিম্পিকে থাকাকালীন অনেকে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। আশা করি আমি তাদের সহযোগিতা পাব। আমি যেহেতু খেলোয়াড় ছিলাম, তাই দল নিয়ে কথা বলি। দলে একক ব্যক্তিত্বকে দিয়ে কিন্তু কোনো কিছু অর্জন করতে পারবেন না। দলের অধিনায়ক একা সবকিছু জিতে এনে দেবেন, সেই আশা করাও ঠিক হবে না। সবাইকে যার যার পজিশনে খেলতে হবে। আমি চেষ্টা করব এ জায়গাটা গোছাতে। ক্যাসিনোর ঘটনা অবশ্যই খারাপ হয়েছে। তবে আমি এটাও বিশ্বাস করি মোহামেডান ক্লাবে যারা আসল ব্যক্তিত্ব, তারা হয়তো এগুলোর সঙ্গে জড়িত নন। কিছু ব্যক্তি করেছেন, তাদের ব্যপারে কী করা উচিত বা আমাদের এসব থেকে দূরে থাকার জন্য যা করা উচিত, সেটা অবশ্যই আমরা করব। এবং আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, ক্লাবের বেশিরভাগ সমর্থক এবং যারা ক্লাবের সঙ্গে জড়িত, তারা এগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং তারা এগুলো চান না। আমি এজিএমে অনেকের বক্তব্য শুনেছি এবং তারা যে দুঃখের সঙ্গে কথাগুলো বলেছেন, যে আমরা এত বছর ধরে ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি, অথচ এমন একটা দুর্নাম আমাদের হয়েছে। এটা ইতিবাচক যে কেউই এটা চান না। এটা আনফরচুনেটলি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব যে এরকম কোনো পরিবেশ আর সৃষ্টি না হয়, যাতে এ ঘটনা আবার ঘটে।
সমর্থনপুষ্ট ক্লাব মোহামেডান। এই ক্লাবের অসংখ্য সমর্থকের প্রতি আপনি কী বলবেন?
আব্দুল মুবীন : আমি নিজেও এক সময় ফ্যান ছিলাম। সেনাবাহিনী হকি দলের হয়ে তখন আউটার স্টেডিয়ামে (পল্টন ময়দান) খেলতে, অনুশীলন করতে আসতাম। আমি মোহামেডানের হকি দলের বিপক্ষে খেলেছি। তাদের ক্লাবে সময় কাটিয়েছি অনেক। ১৯৭৭-৭৮ সালের সবকিছুই আমার মনে আছে। একবার শুনলাম মোহামেডান-আবাহনী খেলা হবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। আমরা আমাদের প্র্যাকটিস ফেলে খেলা দেখতে চলে এসেছি। আমি আসলে খেলার ভক্ত ছিলাম। স্টেডিয়ামে যাওয়া, জায়গা পাওয়া, খেলা দেখা এবং খেলার পর তা নিয়ে চর্চা করা। এমন অনন্য কিছু সময় কাটিয়েছি। আমি চাই ওরকম একটা পরিস্থিতি-পরিবেশ সৃষ্টি করতে। এ দেশের মানুষ ফুটবলকে এখনো ভালোবাসেন। খেলা দেখতে পছন্দ করেন। বিশ্বকাপের সময় মানুষ নতুন টিভি কিনে স্ক্রিনের সামনে বসে যান ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা দেখার জন্য। ওই পর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারলেও আশা করি যে মোহামেডান ক্লাবকে একটা পর্যায়ে এনে ফুটবল দলটাকে একটা অবস্থানে নিয়ে আসার চেষ্টা করব, যেটাকে ঘিরে আবার একটা পরিবেশ তৈরি হবে। লোকজন খেলা দেখবে। হয়তো কিছু সময় লাগবে। আমি বলছি না যে আমার সময়েই আমি সব করব। আমি একটা ভিত তৈরি করার চেষ্টা করব। বিশ্বাস করি, সেই ভিতের ওপরেই ভবিষ্যতে যারা আসবেন, তারা ক্লাবকে এগিয়ে নেবেন আগামীতে।
