নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে সাংবাদিক বুরহান ও যুবলীগ কর্মী আলাউদ্দিন নিহতের পরও বিবদমান বিরোধ থামেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মাইজদী শহর থেকে কাদের মির্জার প্রতিপক্ষ সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে বসুরহাট পৌরসভা ভবনে থাকা কাদের মির্জাকে ঘেরাও করে রেখেছে র্যাব পুলিশ।
গতকাল সন্ধ্যার পর নিহত আলাউদ্দিনের ভাই এমদাদ হোসেন বাদী হয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলার এজাহার জমা দিয়েছেন। এতে কাদের মির্জাকে প্রধান করে ১৬৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে কাদের মির্জার ছেলে মির্জা মাশরুর কাদের ও ভাই সাহাদত হোসেনের নাম রয়েছে। গতকাল রাত ১২টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলাটি পুলিশ নথিভুক্ত করেনি বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন রাত ১২টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা রেকর্ড হয়নি। এজাহারে সমস্যা আছে। ওনাকে (বাদী) বলা হয়েছে। পরে উনি ঠিক করে আনবেন বলেছেন।’
বাদী এমদাদ হোসেন গতকাল রাতে মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আগামীকাল (আজ) আপনাদের জানানো হবে।’
কাদের মির্জাকে প্রধান আসামি করে মামলার এজাহার জমা পড়ার পর বসুরহাট পৌরসভা ভবন ঘিরে রেখেছেন র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। ভবনে অবস্থান করছেন তিনি।
অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে রাত সোয়া ১২টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হলে হব। রাজনীতিবিদরাই গ্রেপ্তার হয়, হামলা মামলার শিকার হয়। ’৮২ সাল থেকে অসংখ্যবার গ্রেপ্তার হয়েছি, জেলে গিয়েছি। মার্শাল ল’র সময়ও গ্রেপ্তার হয়েছি। আমি যেহেতু রাজনীতি করি, তাই গ্রেপ্তার নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তবে নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা) প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। এক ঘণ্টা আগেও আমার ফোন থেকে নেত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। নেত্রী আমাকে আবারও চুপ থাকতে বলেছেন।’ নেত্রীকে আপনি কী বলেছেনএমন প্রশ্নের উত্তরে কাদের মির্জা বলেন, ‘আমার ছেলেকে মার্ডার মামলার আসামি করার কথা শুনেছি। আমি নেত্রীকে বলেছি, আমার ছেলে ঢাকায় থাকে, পড়াশোনা করে। তার কী আপরাধ? তাকে কেন মার্ডার মামলায় জড়ানো হবে? নেত্রী তখন বলেছেন, সে তো ঢাকায় থাকে, পড়াশোনা করে, এট কেন হবে? আমি দেখছি, তুমি চুপ থাক।’
আপনার কোনো অপরাধ আছে বলে আপনি মনে করেন কি নাএমন প্রশ্নের উত্তরে কাদের মির্জা বলেন, ‘আমার কোনো অপরাধ নেই। আমি অপরাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছি। তবে কথা বলতে গিয়ে হয়ত ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে।’
এর আগে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের স্থগিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বাদলকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে নোয়াখালীর এসপি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বাদলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে তা পরে জানানো হবে।
তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, গতকাল বিকেল সোয়া ৪টার দিকে নোয়াখালী প্রেস ক্লাব এলাকার একটি চা দোকানের সামনে থেকে বাদলকে মাইক্রোবাসে করে সাদা পোশাকধারী লোকেরা তুলে নিয়ে যায়।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মিজানুর রহমান বাদলসহ তার সমর্থক কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী প্রেস ক্লাবের পশ্চিম পাশের রেডক্রিসেন্ট মার্কেটের একটি চায়ের দোকানে চা পান করছিলেন। এ সময় একটি কালো রঙের মাইক্রোবাস এসে সেখানে দাঁড়ায়। প্রায় এক মিনিট পর ওই মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন বের হয়ে বাদলকে তুলে নেয়। বাদলকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বসুরহাটের রূপালী চত্বরে পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরে রাতেও দুপক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। দুই দফা সংঘর্ষে মো. আলাউদ্দিন নামে এক যুবলীগকর্মী নিহত এবং ১৩ জন গুলিবিদ্ধসহ উভয়পক্ষের অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন। তারও আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কোম্পানীগঞ্জের চাপরাশিরহাট বাজারে ওই দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির গুলিবিদ্ধ হন, পরদিন ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।
আওয়ামী লীগ নেতা কাদের মির্জা সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। সাম্প্রতিক সময়ে (বসুরহাট পৌর নির্বাচনের আগে থেকে) নিজ দলের নেতা ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন তিনি। তখন থেকেই কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের মধ্যে উত্তেজনা চলছে, যা মোড় নেয় সহিংসতায়।
