বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের উৎসবে মেতেছে দেশ। আজ বুধবার বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মবার্ষিকীর দিনে জাতীয় পর্যায়ে ১০ দিনের অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিকেলে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনা ছাড়াও থাকছে সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দিন ২৬ মার্চ পর্যন্ত এ আয়োজনে দেশি-বিদেশি অতিথিরা ভার্চুয়ালি ও সশরীরে উপস্থিত থাকবেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। গত বছর বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন থেকে শুরু হয় ‘মুজিববর্ষ’যা ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই দিনটি জাতীয় শিশু-কিশোর দিবস হিসেবেও উদ্যাপিত হয়। এবারে জাতীয় শিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, শিশুর হৃদয় হোক রঙিন।’
বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে ১০ দিনের অনুষ্ঠানমালায়। গান-নাচ-অভিনয়সহ নানা পরিবেশনায় তুলে ধরা হবে তার কর্মময় জীবন। বঙ্গবন্ধু একজন ত্যাগী ও সাহসী নেতা ছিলেন। তার আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানাতে জন্মশতবার্ষিকীর বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে সরকার।
চলমান করোনা মহামারী বিবেচনায় অনুষ্ঠানে অতিথি সীমিত করা হয়েছে। প্রতিদিন ৫০০ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানে আসার আগে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে তিনি করোনা সংক্রমিত নন। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিতে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হবে নানান শৈল্পিকতায়। অনুষ্ঠানস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ মিনার, পদ্মা সেতু, গ্রামীণ জীবনযাপনের আবহ, জাতীয় মাছ ইলিশসহ নানা দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনা।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর সময় বাড়ানো হয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনাকালে অনেক কাজ ব্যাহত হয়েছে। বাড়তি সময় পাওয়ায় অনেক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। চিরন্তন আলোকশিখা প্রতিপাদ্য নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপন করা হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর নানা আয়োজন।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা থাকছে : বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। শিশুশিল্পীদের কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হবে অনুষ্ঠান। এরপর পবিত্র গ্রন্থগুলো থেকে পাঠ করা হবে। অনুষ্ঠানে ‘মুজিব চিরন্তন’ থিমের ওপর একটি অ্যানিমেশন চিত্র এবং থিম সংয়ের মিউজিক ভিডিও প্রদর্শিত হবে। স্বাগত ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। এছাড়া কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ভিডিওবার্তা প্রদর্শিত হবে। উপস্থিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। পরে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অতিথিদের কাছে হস্তান্তর করা হবে ‘মুজিব চিরন্তন’ স্মারক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সন্ধ্যা ৬টার পর বাংলাদেশ এবং ভারতীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার চারটি মুদ্রিত পোস্টার প্রকাশ করেছে জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। পোস্টারগুলোর শিরোনাম করা হয়েছে, মুক্তির মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুজিব চিরন্তন। এসব পোস্টার সারা দেশে বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে পোস্টারগুলো পাঠিয়ে সেখানেও প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ঊর্ধ্বে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দেশে ও বিদেশে নির্মূল কমিটির করণীয় শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে। ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করবেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী : বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে এ মহান নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দেশ ও জাতির প্রতি শুভেচ্ছা জানান তারা।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, দেশ ও জনগণের প্রতি তার অসামান্য অবদানের জন্য বাংলা, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু আজ এক ও অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়েছে। ১৭ মার্চ, বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক কিংবদন্তির নাম। গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুর কেটেছে অন্তত ৩০৫৩ দিন। বলা যায় কারাগার ছিল তার দ্বিতীয় আবাসস্থল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করেছে। বিশ্বশান্তিতে অনবদ্য অবদান রাখায় জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে ‘জুলিও কুরি’ পদকে ভূষিত হন।
জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সকল নাগরিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিশ্ববাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, জাতির পিতার জীবন ও কর্ম আপামর জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে মার্চ ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২১ সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৭ মার্চ ২০২০ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। বাংলাদেশের পাশাপাশি ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘মুজিববর্ষ’। তিনি জাতির পিতার স্মৃতির প্রতি এবং পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধু যখন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী চক্র ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে পরিবারের সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করে। ইতিহাসের এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের যেন বিচার না হয় সেজন্য প্রণীত হয় দায়মুক্তির কালাকানুনইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স। দীর্ঘ ২১ বছর পর জনগণের রায়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এই কালাকানুন বাতিল করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুরু করে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়।
সরকারপ্রধান বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সরকার গঠন করে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ায় যোগ্যতা অর্জন করেছে।
আজ ঢাকায় আসছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট : স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আজ বুধবার ঢাকায় আসছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ। তিনি বাংলাদেশে তিন দিন অবস্থান করে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের তাকে অভ্যর্থনা জানানোর কথা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সলিহর এটা প্রথম বাংলাদেশ সফর। সলিহ বিকেলে তেজগাঁওয়ের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানেও যোগ দেবেন।
নির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ বঙ্গভবনে দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করবেন। এ সময় দুই রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতিতে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউএস) স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট বঙ্গভবনের দরবার হল গ্রাউন্ডে রাষ্ট্রপতি আয়োজিত এক নৈশভোজ ও মনোজ্ঞ সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
বিমানের উড্ডয়ন শৈলী প্রদর্শন আজ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আজ এক মনোজ্ঞ উড্ডয়ন শৈলী প্রদর্শনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান প্রদর্শন করবে বিমানবাহিনী। বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাতের দিকনির্দেশনায় বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের বিমানের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানের আকাশে ‘১০০ তৈরির’ উড্ডয়ন শৈলী প্রদর্শন করা হবে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দক্ষ বৈমানিকগণ এই মনোজ্ঞ উড্ডয়ন শৈলীর মাধ্যমে বাংলার আকাশে অতি মমতায় এঁকে দেবে ‘একশত’। বিমানবাহিনীর এফ-৭, মিগ-২৯, ইয়াক-১৩০, কে-৮ডব্লিউ ও পিটি-৬ বিমানের সমন্বয়ে এই মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনীতে বিমানবাহিনীর দক্ষ বৈমানিকগণ দেশের নীলাকাশে ফরমেশন ফ্লাইংয়ের মাধ্যমে ‘১০০’ তৈরি করে সমগ্র জাতির উৎসব ও উচ্ছ্বাসের রঙে যোগ করবে এক নতুন মাত্রা।
