হঠাৎ একদিন পাড়ায় দানবীর হাতেমতায়ী এলেন। এলাকার ধনী-দরিদ্র সবাইকে হাতভরে দান করছেন। শাড়ি, লুঙ্গি, জুতা, শীতবস্ত্র, যার যা প্রয়োজন। লাখ টাকার গরু জবাই করে দেন একাধিক গণভোজ। চলেন এলিয়েন গাড়িতে সঙ্গে ১০-১২ জনের বহর। যার কাঁধে হাত দেন সেই ধন্য মনে করে নিজেকে। অথচ কেউ এই দানবীরের আসল পরিচয় জানে না। ফলে এসেছেন যেমন চমক দিয়ে তেমনি বিদায়ও নিয়েছেন সবাইকে হতভম্ব করে। কারণ যা দান করেছেন তার পুরোটাই ছিল একই এলাকার বিভিন্ন দোকানে বাকিতে কেনা। সেই সঙ্গে দানবীর পরিচয় ভাঙিয়ে মাত্র ৩ মাসে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। ঘটনাটি রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর এলাকার।
গল্পের নায়ক লোকমান হোসেন (৫৫) একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতা। নিজের নামটাও ঠিকঠাক লিখতে পারেন না। অথচ এই ব্যক্তির প্রতারণার কৌশল বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠার মতো। সেলুনওয়ালা থেকে চামড়াশিল্প ব্যবসায়ী যেই তার সংস্পর্শে এসেছেন ফেঁসেছেন প্রতারণার জালে। গত ৮ মার্চ তার বিষয়ে প্রথম জানতে পারে দেশ রূপান্তর। অনুসন্ধানে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। তারই এক পর্যায়ে গত মঙ্গলবার সস্ত্রীক উধাও হয়েছেন। লোকমানের পালানোর খবরে ভুক্তভোগীদের কাছে আরও যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা রীতিমতো সিনেমার গল্পের মতো।
মুড়ির প্যাকেটে মহাপ্রতারকের সন্ধান
অনুসন্ধানের শুরু একটি ঝালমুড়ির প্যাকেট থেকে। লেবেল ছাড়া ৫ টাকা দামের এই ঝালমুড়ি ঝাউচর এলাকার প্রায় সব দোকানে পাওয়া যায়। যা শিশুদের বেশ প্রিয়। সরকারি সংস্থা বিএসটিআইর অনুমোদন ছাড়া শিশু খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি কি নাএমন প্রশ্নে দোকানদার আল আমিন হেসে বলেন, কোটিপতির খাদ্যে ভ্যাজাল নাই। তিনি দানবীর মানুষ। বিস্তারিত জানতে চাইলে দোকানে উপস্থিত কয়েকজন যা বললেন তা এ রকম তিন মাস আগে ঝাউচরের কেউ লোকমান হোসেনকে চিনতেন না। গেল শীতে হঠাৎ একদল লোক বালুরমাঠে শীতবস্ত্র, জুতা, শাড়ি, লুঙ্গি, দান করা শুরু করেন। টানা এক সপ্তাহ ধরে চলে এ কর্মযজ্ঞ। এলাকার অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে কাপড় দান করা হয়। এরপরেই প্রথম লোকমান হোসেনের নাম প্রথম জানতে পারে এলাকাবাসী। কয়েক দিন পর ১০ লাখ টাকা খরচ করে দেন বিশাল ভোজ। খেয়েছেন অন্তত ৪ হাজার মানুষ। এসময় লোকমানের সঙ্গে জুটে যান স্থানীয় কয়েকজন। দানশীল হৃদয় ও ধর্মভীরুতা দেখে কয়েকজন বাড়িওয়ালার সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। তাদের কাউকে বানান ধর্মের বাবা কেউবা ধর্মের ভাই। লোকমানের লোকজন প্রচার করেন, তিনি একজন কোটিপতি। ব্যাংকে পড়ে আছে দেড়শ কোটি টাকা। এই টাকায় তিনি মানবসেবা করতে চান।
ভুক্তভোগীরা জানান, লোকমানের কথায় অবিশ্বাস করেনি কেউ। কারণ চালচলনে একজন নিরীহ গোবেচারা হলেও চড়েন এলিয়েন গাড়িতে। একটি তার নিজের, অন্যটি সহকারীদের জন্য। যারা সবাই তিন মাস আগেও ছিলেন রিকশাচালক। লোকমানের সঙ্গ পেয়ে তারা রাতারাতি স্যুট-টাই পরে গাড়িতে চলাচল করেন। মাঝেমধ্যে লোকমান লোকজন নিয়ে ঢাকার বাইরে যান। এ সময় বহরে যুক্ত হয় আরও সাত-আটটি প্রাইভেট কার। সবাইকে পরান স্যুট-টাই। অথচ এই সহকারীদের সঙ্গেও প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন লোকমান।
দানের সব অর্থই প্রতারণার
হাজারীবাগের মনেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাবিবুর রহমানের (৬৫) জুতার ফ্যাক্টরি, গার্মেন্টসহ বেশকিছু ব্যবসা আছে। দুই মাস আগে লোকমান নিজেকে এতিম দাবি করে হাবিবুর রহমানকে বাবা ও তার স্ত্রীকে ধর্ম-মা ডাকেন। হাবিবুর রহমানের সুনাম কাজে লাগিয়ে হাজারীবাগের এক লোকের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা বাকিতে দুটি গরু কেনেন। কাপড় দান করায় ইতিমধ্যে লোকমান এলাকায় দানবীর হিসেবে পরিচিত। ফলে সহজেই চাল, ডাল, তেল, পিঁয়াজ, মরিচ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র বাকিতে কেনেন। এই অনুষ্ঠানে মোট খরচ হয় ১০ লাখ টাকা। যার সবটাই বাকি।
এরপর হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে দান করার উদ্দেশ্যে দেড় লাখ টাকার জুতা ও শীতের জ্যাকেট নেন লোকমান। অন্যদের কাছ থেকে নেন শাড়ি ও লুঙ্গি। সেটাও বাকিতে। এক পর্যায়ে হাবিবুর রহমানকে নিজের মুড়ি ব্যবসার অংশীদার করেন লোকমান। সঙ্গে নেন ঝাউচরের ব্যবসায়ী ইউসুফ ও জাহিদকে। কেরানীগঞ্জের বাগরামেরকান্দা গ্রামে দুই কোটি টাকায় একটি জমি কিনেছেন বলে তাদের শোনান। ওই জমিতে মুড়ির কারখানা তৈরির কথা বলে তিনজনের কাছ থেকে ত্রিশ লাখ টাকা নেন। অথচ ওই জমির মালিক মুক্তি মিয়া জানান, জমিটি ৭ লাখ টাকায় দুই বছরের জন্য ভাড়া নেন লোকমান। যার একটি টাকাও পরিশোধ করেননি লোকমান। এসময় রামেরকান্দা এলাকার আল আমিন ভাণ্ডারি নামে এক কবিরাজের সঙ্গে পরিচয় হয় লোকমানের।
১২ মার্চ রামেরকান্দায় নিজ বাড়িতে কথা হয় আল আমিন ভাণ্ডারির স্ত্রী তহুরা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, উনি দুই-তিনটা গাড়িতে কইর্যা আইস্যা আমার স্বামীরে কন তার বউয়ের বাচ্চা হয় না এইজন্য চিকিৎসা করাইবেন। আমার স্বামী হ্যার কবিরাজী করেন। আমাদের মসজিদে দুই লাখ ট্যাকা দিবার চাইছে দেয় নাই। একটা ওয়াজ মাহফিল কইর্যা ম্যালা মানুষরে খাওয়াইছে। বহু মানুষকে শাড়ি-লুঙ্গি দিছে। আল আমিন ভাণ্ডারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হ্যার বউয়ের কবিরাজী করতে যাইয়া আমার সর্বনাশ হইছে। কইলো দুই গাড়ি সিমেন্ট দুই গাড়ি বালু, দুই গাড়ি ইট আইন্যা দিতে। ১ লাখ ১৩ হাজার টাকার বিল আটকে আছে আর দেয় না। আল আমিন ভাণ্ডারি জানান, রামেরকান্দা গ্রামের ইউপি সদস্য ইসলাম মেম্বারকেও একইভাবে ফাঁসিয়েছেন লোকমান। তিনিও ১১ লাখ টাকা পাবেন। এছাড়া ইদরিস আলী নামে আরেক ব্যবসায়ীর কাছে সিমেন্ট, বালুসহ নগদ ১২ লাখ টাকা নেন। একই এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে নানা ছুতায় ৫০-৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
বডিগার্ড আলীকে নিয়ে চম্পট
হাবিবুর রহমান জানান, লোকমান হোসেনের কাছে তিনি সর্বমোট ১৪ লাখ টাকা পান। এই টাকার জন্য চাপ দিলে তিনি চলতি মাসের প্রথম দিকে ইসলামী ব্যাংকের ১০ লাখ টাকার একটি চেক দেন। পরে তিনি ওই চেক নিয়ে ব্যাংকে গেলে সেখান থেকে জানানো হয় চেকটির নামে ব্যাংকে কোনো হিসাব নেই। গত মঙ্গলবার লোকমান সবাইকে জানান, এদিন তিনি ব্যাংক থেকে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাবেন। পরে তাদের মতিঝিলে যেতে বলে নিজে আলাদা গাড়িতে চলে যান। এসময় লোকমানের সঙ্গে ছিলেন তার সহকারী আলী শেখ। সন্ধ্যা পর্যন্ত মতিঝিলে অপেক্ষা করে লোকমানকে না পেয়ে তারা ফিরে আসেন।
আলী শেখের স্ত্রী বানেচা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী রিকশা চালাইতো। তিন মাস আগে লোকমান আমার স্বামীরে কইলো ১৫ হাজার ট্যাকায় চাকরি দিবো। আমার ছেলে মাইয়ারেও চাকরি দেয়। একটা টাকাও আইজ পর্যন্ত বেতন দেয় নাই। আমাদের কাছে কাইন্দা কাইট্যা ট্যাকা নিছে। আমরা ২ লাখ ট্যাকা পামু। লোকমান যে দুটি গাড়ি ব্যবহার করেন সেগুলো উবার চালিত। অথচ সবাই জানতো এগুলো তার নিজের গাড়ি। গাড়িচালক গোলাম মাওলা বলেন, মতিঝিল গিয়া আমার কাছ থেইক্যা চারশো টাকা নিয়া কইলো অপেক্ষা করতে আর আসে নাই। মাওলা জানান, তিন মাস ধরে গাড়ি চালালেও বেতন বা ভাড়ার কোনো টাকাই পরিশোধ করেননি লোকমান।
পরিচয়ের সবটাই ভুয়া লোকমানের
৮ মার্চ লোকমান হোসেনের সঙ্গে ঝাউচরে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এসময় তার পরনে ছিল চেক লুঙ্গি, সেন্ডো গেঞ্জি ও পায়ে চটি। আধাঘণ্টার আলাপে অন্তত ৫-৬টি বেনসন সিগারেট খান। নিজের ব্যাপারে এলাকাবাসীর দেওয়া সব তথ্যই সঠিক বলে স্বীকার করেন। বলেন, আমার বাড়ি ফরিদপুর শহরের ঝিলটনি এলাকায়। প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের বাড়ির সঙ্গে। শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার লাকসামে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের বাড়ির পাশে। লোকমান জানান, ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়ে বরগুনার আমতলী থানার কালিবাড়ী গ্রামের শ্রীকান্ত সাহা ও দুলাল সাহার কাছে বড় হন। পরে ফেনীর মহিপাল এলাকায় তিনি ঝালমুড়ির ব্যবসা করতেন।
নিজের পরিচয়ের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য লোকমান জানান, শ্রীকান্ত সাহার ছেলে ধীরেন সাহা ঝাউচর এলাকায় সেলুন ব্যবসা করেন। ঠিকানা অনুযায়ী ধীরেনের খোঁজ করলে পাওয়া যায় তিনি বীরেন দাসকে। বাবার নাম বিশ্বজিৎ দাস। গ্রামের বাড়ির ঠিকানা সব সঠিক হলেও লোকমানকে প্রতারক বলে আখ্যা দেন বীরেন। তিনি বলেন, আমি হ্যারে চিনি না। চুল কাটতে আইসা কয় আমার বাপ নাকি হ্যারে মানুষ করছে। একটা লুঙ্গি দিয়া ছয় হাজার ট্যাকা ধার নিছে সেই ট্যাকা আইজও দেয় নাই। ফেনীর মহিপালের সবাই তাকে এক নামে চেনে বলে জানান লোকমান। কিন্তু দেশ রূপান্তরের ফেনী প্রতিনিধি খোঁজ নিয়ে জানান এ নামে কাউকে চেনে না স্থানীয়রা। এমনকি ফরিদপুরের ঝিলটনি এলাকায়ও খোঁজ নিয়ে লোকমানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
