করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার যখন নানা প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছে ঠিক তখন মালামাল সরবরাহ না করেই খুলনা জেলা পরিষদের করোনা মোকাবিলা তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দরপত্রে উল্লিখিত মালামাল সরবরাহ না করেই জেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পুরো বিল তুলে নিতে আবেদন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এম এন্টারপ্রাইজ। আর বিল পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা ইতিমধ্যে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে সারা দেশ যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় ব্যস্ত তখন খুলনায় বড় ধরনের ওই জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তারা ওই জালিয়াতিতে জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন।
জানা গেছে, খুলনা জেলা পরিষদের করোনা মোকাবিলা তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকার হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ড ওয়াশ, সাবান ও মাস্ক কিনতে কিছুদিন আগে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রথম দফায় সমঝোতার মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। এরপর আগের উদ্দেশ্য সফল করতে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ফের দরপত্র আহ্বান করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারের মধ্যস্থতায় সমঝোতা করা হয়। দরপত্র নির্ণয় কমিটিতেও (টিইসি) অনুমোদন মেলে ওই টেন্ডার প্রক্রিয়ার। যার ধারাবাহিকতায় মালামাল সরবরাহ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিল তুলে নিতে আবেদন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
খুলনা জেলা পরিষদের দেওয়া তথ্যমতে, কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় দেশের দরিদ্র মানুষের মাঝে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ড ওয়াশ, সাবান ও মাস্ক বিতরণে উদ্যোগ নেয় পরিষদ। ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনাকাটার এ দরপত্র বিজ্ঞপ্তি গত ৩ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি ছিল দরপত্র বিক্রির শেষ দিন। পরদিন ২০ জানুয়ারি দুপুর ১টায় ওই দরপত্র জমার শেষ সময় ধার্য করা হয়। দরপত্র উন্মুক্ত করার সময় ছিল বিকেল ৩টা। তবে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি ফের দরপত্র গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। শেষ দিন পর্যন্ত ৩০টি দরপত্র বিক্রি হয়। আর নির্ধারিত সময় দুপুর ১টার মধ্যে মাত্র ৪টি দরপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে এস এম এন্টারপ্রাইজ ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩ টাকা, এস আর করপোরেশন ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৪ টাকা এবং সিটি মেডিকেল ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৫৮ টাকার দর জমা দেয়। তবে জামানতের টাকা ছাড়াই একটি দরপত্র জমা পড়ে, সেটি হলো লাবিবা এন্টারপ্রাইজ।
কয়েকজন ঠিকাদার জানান, প্রভাবশালীদের হুমকিতে দরপত্রের শিডিউল কেনা ৩০ ঠিকাদারের মধ্যে ২৬ জনই দরপত্র জমা না দেওয়ায় কাজটি পেয়েছে মাসুদুর রহমানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এম এন্টারপ্রাইজ।
ঠিকাদার জহুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তখন টেন্ডার সমঝোতার মাধ্যমে হলেও টিইসি কমিটি ওই কাজের অনুমোদন দিয়েছে। আর এখন মালামাল বুঝে না পেয়েই বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিল পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ১৭ লাখ টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন এক কর্মকর্তা। ফলে প্রতিষ্ঠানটি মোটা অঙ্কের টাকা হারাতে বসেছে।’
অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে খুলনা জেলা পরিষদের সচিব বিষ্ণু পদ পাল দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধের আবেদন পেয়েছি। কিন্তু নিচের কর্মকর্তারা যাই করুক না কেন, এভাবে মালামাল বুঝে না পেয়ে বিল পরিশোধ করা সম্ভব নয়।’
