করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকে মারা গেছেন। যারা বেঁচে ফিরতে পেরেছেন, তারা জানিয়েছেন অসুখের সময়ের কথা। বিশ্বের পাঁচ জায়গা থেকে এমনই পাঁচজন মানুষের করোনা সংক্রমণ থেকে জীবন নিয়ে ফেরার ঘটনা লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
পার্ক হায়ুন
করোনাভাইরাস যখন দাপট ছড়ানো শুরু করে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অব বুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পার্ক হায়ুন সেটিকে খুব একটা আমলে নেননি। তিনি ধরে নিয়েছিলেন এই ভাইরাস তার জন্য খুব একটা সমস্যার কারণ হবে না। কিন্তু এ ধারণাটি খুব অল্প সময়েই বদলে গিয়েছিল। কারণ ভয়াবহ এই ভাইরাসের কারণে তাকে বুসানের হাসপাতালের আইসিইউতে থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুদিন। আর এ সময়ই মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন পার্ক।
শুরুতে ভাইরাসকে একদমই আমলে না নেওয়ায় সাধারণ ঠা-া-কাশিকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না তিনি। তার সংক্রমণের শুরু হয়েছিল শুকনো কাশি আর গলাব্যথা দিয়ে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে তার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। নিঃশ্বাস নিতে না পারায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। করোনা পরীক্ষা করা হলে সেটিও পজিটিভ আসে। পার্ক সে সময় বুঝতে পারেন কতটুকু কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে। ক্রমশ তার অবস্থা খারাপ হয়। কয়েকবার তিনি ভেবেছিলেন দিনের যে শুরু তিনি দেখতে পাচ্ছেন তার শেষ হয়তো দেখা হবে না। পার্ক বলেন, ‘জীবনটা তখন আমার কাছে রোলার কোস্টারের মতো মনে হতো। একটা পাতলা প্লেট আমার বুকের ওপর রেখে তার সঙ্গে অসংখ্য সুঁই যেন প্রতি মুহূর্তে আমার বুকে খোঁচা দিত। যখন এত চিকিৎসায়ও আমার কিছু হচ্ছিল না, তখন মনে হচ্ছিল আমার সুস্থ না হওয়ার পেছনে মূল কারণ শুরুতে এই ভাইরাসের প্রতি আমার অবিশ্বাস। আইসিইউর বিছানায় শুয়ে আমার তখন শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা।’
আট দিন পর পার্কের আবারও টেস্ট করা হয়। রিপোর্টে নেগেটিভ এলে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। ‘আমার অবস্থা অনেক খারাপ ছিল। মৃত্যু চোখের সামনে দেখে এসেছি আমি। বারবার শুধু ভেবেছি, একবার সুস্থ হয়ে গেলে জীবন নিয়ে কিছু কথা আমি অবশ্যই লিখব। বাড়ি ফিরে ফেইসবুকে নিজের অভিজ্ঞতা বন্ধুদের মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’ সুস্থ হওয়ার পর পার্কের জীবনে অন্যরকম যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যখন থেকে কলেজে যাওয়া শুরু করেন তখন তার কলিগরা এবং বাড়ির আশপাশের প্রতিবেশীরা তার কাছ থেকে দূরে থাকেন। প্রতিবেশীদের অনেকেই তার বাড়ির সামনে এসে চিৎকার করে বলেছে ‘এই ছেলের জন্য আমরা সবাই মারা যাব!’ এসব কথায় কষ্ট পেলেও কাউকে পার্ক কিছু বলেননি। বরং তার কারণে যেন কেউ বিরক্ত না হন সেজন্য তিনিও কিছুটা দূরত্ব রেখে চলাফেরা করেছেন। কলেজে তিনি একা চলাফেরা করেন, লিফটে ওঠার বদলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করেন, টেবিলে খাবার খান একা। তিনি বুঝতে পারেন সবাই তাকে কিছুটা ভয় পাচ্ছে। কারণ শুরুতে তিনি এই ভাইরাসকে বিশ্বাস করেননি, অথচ তাকেই এতে আক্রান্ত হতে হয়েছে। পার্ক কাউকেই দোষ দেন না। ‘আমরা সবাই আসলে পরিস্থিতির স্বীকার। এখানে কেউ দোষী নয়। আমি শুধু চাই, এই কঠিন সময়টুকু পার হয়ে যাক। আমি যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি এমনটি যেন আর কাউকে না হতে হয়’।
ওয়াং চুংহুই
গত বছরের প্রথমদিকে ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে সংক্রমিত হয়েছিলেন ৪৪ বছর বয়সী ওয়াং চুংহুই। তিনি জানতেন এই রোগ তাকে বেশ ভোগাতে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু ভাইরাসের হাত থেকে বেঁচে ফিরে আসাকে তিনি তুলনা করেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরত আসার সঙ্গে। ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের উহানের হোসেনশান হাসপাতালে তাকে কাটাতে হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন ১৭ দিন। নতুন জীবন তাকে অনেক কিছু চিনতে শিখিয়েছে। ‘সব বিষয়ে আগের চেয়ে এখন আমি অনেক শান্ত... অনেক। আমি মরণের দুয়ার থেকে ফেরত এসেছি। আমি নিজের চোখে দেখেছি কীভাবে একের পর এক মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, কীভাবে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যাচ্ছে। প্রতিটি ঘটনা আমার জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলেছে।’
ওয়াং জানতেন উহানে যেভাবে ভাইরাস ছড়িয়েছে তাতে যেকোনো সময় তিনি সংক্রমিত হতে পারেন। তার আশঙ্কা সত্যিও হয়েছিল। শরীরের তাপমাত্রা যখন থেকে বাড়তে থাকে তখন থেকেই আলাদা ঘরে আলাদা থেকেছেন। কয়েক দিনেও যখন জ্বর সারেনি তখন ঘণ্টাখানেক হেঁটে চলে যান হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন করোনা পরীক্ষা আর করা হচ্ছে না। তাকে শুধু অ্যান্টিবায়োটিক আর ফ্লু-এর কিছু ওষুধ দিয়ে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়। কারণ হাসপাতালে তখন বেড খালি ছিল না।
‘হাসপাতালের এমন খারাপ অবস্থা দেখে আমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফিরে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলাম। পরিস্থিতি নিয়ে নিজেকে অনেক বোঝালাম। নিজেই নিজেকে বারবার বললাম, এখন আতঙ্কিত হওয়ার কোনো অর্থ নেই।’ ভাইরাস সংক্রমণের আগে থেকেই ওয়াং উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। বাড়িতে ফিরে তিনি তার শারীরিক অবস্থা রেকর্ড করে রাখতেন অনলাইন ডায়েরিতে। জ্বরের পর বেশ খারাপ ধরনের কাশি শুরু হয় তার। তিনি বুঝতে পারছিলেন তার বাঁচার আশা হয়তো কমে আসছে। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান তিনি। সেখানে হরমোন থেরাপি দেওয়ায় তার জ্বর কমে যায় ঠিকই, কিন্তু শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়তে থাকে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় ছিল মেডিকেল সাপ্লাইয়ের স্বল্পতা। স্বাস্থ্যকর্মীরা খুব নিম্নমানের সুরক্ষা পোশাক পরে আর সাধারণ ব্যাগ দিয়ে জুতো ঢেকে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছিল। ওয়াংকে পরে উহানে করোনা রোগীদের জন্য তৈরি হওয়া ফিল্ড হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাসেবা বেশ ভালো ছিল। বলতে গেলে সেখান থেকে সুস্থ হয়ে ফেরেন ওয়াং। হাসপাতালে কাটানো সময়ও তিনি অনলাইনে রেকর্ড চালিয়ে গেছেন। যেসব ভিডিও অন্যদের মধ্যে বেঁচে থাকার নতুন আশার জোগান দিয়েছে।
সং মায়ুং হি
দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ধর্মীয় একটি দল দায়িগু শহরের শিনচিওনজি চার্চে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়া শুরু করে। তাদের কাছে সেবা নিয়েছিলেন ৭২ বছর বয়সী সং মায়ুং হি। ‘পেশেন্ট ৩১’ নামে পরিচিত নারী ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার আগে যে চারটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তার একটিতে ছিলেন মায়ুং। জ্বর আসার পর শুরুতে মায়ুং বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনেই ছিলেন। কিন্তু কিছুদিনেও যখন জ্বর ভালো হচ্ছিল না, সঙ্গে ভীষণ কাশি শুরু হয়, তখন তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। ‘আমি একদম ঘুমাতে পারতাম না। দুদিন পর্যন্ত প্রচণ্ড কাশি ছিল। অবস্থা এমন ছিল যে, আমার হাতে সব সময় একটি প্লাস্টিক ব্যাগ রাখতে হতো যেন কাশি উঠলেই তাতে কফ ফেলতে পারি। আমার চেহারা ফ্যাকাশে হতে শুরু করল। ভয় হতে লাগল, আমাকে হয়তো এ ঘরে একাই মরে যেতে হবে।’ দায়িগুর হাসপাতালে ক্রমাগত মানুষের আনাগোনায় কোনো বেড খালি ছিল না। তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ি থেকে ২২০ কিলোমিটার দূরে সিওংনামে। ‘এখানে এসে হাসপাতালের রুমে ঢোকার পর নিশ্চিন্ত লাগছিল। সেখানে এত মানুষ ছিল যে, অন্তত আমাকে একা মরতে হতো না!’
ফ্যাবিও বিফারেলি
কার্ডিওলজিস্ট ফ্যাবিও বিফারেলি ইতালির রোমের পলিক্লিনিকো আমবার্তো আই হাসপাতালের অর্থোডন্টিকস ডিপার্টমেন্টে জগতের সবকিছু থেকে দূরে থেকে আট দিন সম্পূর্ণ আইসোলেটেড ছিলেন। ৬৫ বছর বয়সী এই চিকিৎসকের কাছে সে সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা মোটেও সহজ নয়। অক্সিজেন থেরাপি তো কষ্টের ছিলই, রেডিয়াল আর্টারিও বেশ কঠিন ছিল। শরীরে ভীষণ ব্যথা হতো তার এ সময়গুলোয়। ‘দিনে দুবার এই থেরাপিগুলো আমাকে নিতে হতো। একজন চিকিৎসক আমাকে সাহায্য করতেন ব্যথা সহ্য করার জন্য। অন্য রোগীদের ‘থামুন’ ‘থামুন’ বলে চিৎকার সব সময় শুনতাম আমি। রাতের বেলা ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ভয় হতো। আমি ঘুমাতে পারতাম না। রুমজুড়ে শুধু আতঙ্ক বিরাজ করত। দুঃস্বপ্ন দেখতাম। এই বুঝি মৃত্যু ঘিরে ধরল। পরিবার, বন্ধু ছাড়া মৃত্যুকে আমি খুব ভয় পেতাম। স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন মাথায় সুরক্ষাবস্তু পরে আমার সামনে আসত, তখন গ্লাস মাস্কের আড়ালে তাদের চোখ দেখে আর মুখের মাস্কের পেছনে তাদের কণ্ঠ শুনে আশার আলো দেখার চেষ্টা করতাম। চিকিৎসকদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ ছিলেন। আশা জাগানোর জন্য সে সময় তারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। হয়তো তাদের চেষ্টা আর আশা এই দুই মিলে আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে।’
জেমিলা কেরোশ
পূর্ব ফ্রান্সের মালহাউজে অবস্থান করা ৪৭ বছর বয়সী জেমিলা কেরোশ ৬, ১১ ও ১৯ বছর বয়সী তিন সন্তানের মা। মহামারীতে তার এলাকা ভীষণভাবে সংক্রমিত হয়। তিনি যখন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল তখন সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল তার সন্তানদের দেখাশোনা ও স্কুলে তাদের ক্লাস করানো নিয়ে। যখন থেকে তার মধ্যে ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়, তখন থেকেই তিনি বাড়িতে থাকাকালীন হাতে গ্লাভস ও মাস্ক পরতেন। কোনো খাবার ছুঁয়ে দেখতেন না সন্তানরা সংক্রমিত হবে এই ভয়ে। এত সাবধানতার পরও তার সন্তানদের মধ্যে কাশি শুরু হয়। তিনি যেমন চিন্তা করছিলেন, তেমনই বাচ্চারাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। ‘বাচ্চারা লেখাপড়া করতে ভীষণ ভালোবাসে। যখন থেকে এই অবস্থার শুরু হলো তখন ওরা অনেক চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ওরা তিনজনই স্কুলে ভালো করতে চায়। কিন্তু কোনোভাবে তারা তিনজনই যদি সংক্রমিত হয়ে পড়ে তবে তাদের রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু করবে। অবশ্য স্কুলের শিক্ষকরা এ বিষয়ে অনেক সাহায্য করেছেন। বড়জনের স্কুলের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। যেখানে আমি নিজেই সুস্থ নই, ক্রমাগত শরীর খারাপ হচ্ছে, যখন আমাকে আমার সন্তানদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অথচ আমি তাদের সাহায্য করতে পারছি না, সে সময় আমার কান্না আর বাঁধ মানেনি। আমি আমার সন্তানকে ধরতে পারছি না, ছুঁতে পারছি না এটা খুব কষ্টের ছিল। আমি ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙে পড়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ভাইরাস আমাকে আমার সন্তানদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি। তাদের সঙ্গে আমি ছিলাম। তারা আমাকে প্রচুর মানসিক শক্তি দিয়েছে। সত্যি বলতে ওরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমার এখনো মনে হয়, আমি আসলেই নতুন জীবন পেয়েছি। জীবন সত্যিই সুন্দর।’
