কেমিক্যাল বর্জ্যে বেলকুচির নলকূপের পানি ব্যবহারের অযোগ্য

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৫৯ পিএম

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার প্রসেস মিল ও সুতা রং করা কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যালের বর্জ্য শোধন না করেই পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে ফেলা হচ্ছে। ফলে উপজেলার তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ এলাকার আশপাশের প্রায় সব নলকূপের পানি ব্যবহার ও পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া এ বর্জ্য খাল বিল ও জলাশয়ে ফেলার কারণে এর ঝাঁজালো দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হয়ে আশপাশের বাড়িঘরে মানুষ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

এ পানি পান ও ব্যবহার করে অনেকেই পেটের পীড়া ও নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সামর্থ্যবান অনেকে আবার নলকূপের পানি পান ও ব্যবহার ছেড়ে দিয়ে বোতলজাত ও সাপ্লাইয়ের পানি পান ও ব্যবহার করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ রয়েছেন বিপদে।

এ বিষয়ে উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের তামাই নতুনপাড়া গ্রামের হোসেন আলী, ইসমাইল হোসেন, জুলমত প্রমানিক, আপন দাস, মানিক হোসেন, ইমরান প্রামাণিক, রাজু আহমেদ, ইসমাইল খান জানান, বেলকুচি পৌর আবাসিক এলাকা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলিতে সমিতি ভুক্ত ১৩টি সহ ছোট বড় মিলিয়ে অন্তত ৩৫টি সুতা প্রসেস মিল ও অর্ধশতাধিক সুতা রং করার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে শাহপুর, বোল্ডার বাজার, ক্ষিদ্রমাটিয়া, কামারপাড়া, চালা, মুকন্দগাতি, তামাই, শেরনগর, শ্যামগাতী, রওড়া ও মবুপুর এলাকায় বেশি রয়েছে। এ সব কারখানা ও মিলে সুতা রং ও প্রসেসের কাজে প্রতিদিন দেড় থেকে ২ টন পরিমাণ বিষাক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক কেমিক্যাল দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে কষ্টিক, নাইট্রিক, সোডা, খার, ফিটকিরি, তুঁত, পটাশ, ব্লিচিং ও নেছাবল ওয়েল। এ সব রাসায়নিক কেমিক্যালের প্রত্যেকটিই মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর পদার্থ। এসব রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি শোধন না করেই প্রসেস মিল মালিকরা পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে ও খাল বিল জলাশয়ে ফেলছে। ফলে এ পানি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে মিশে যাচ্ছে। এ কারণে নলকূপের পানি পান ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

তারা বলেন, নলকূপের পানি কালচে হয়ে সাবানের ফেনার মতো হয়ে বের হয়। এ পানি পান করলে পেটের পীড়া হয়। রান্না করলে ভাত তরকারি কালো ও হলুদ বর্ণ হয়। গোসল করলে শরীরে ঘামাচির মতো গোটা ওঠে। খোস পাঁচড়া, চুলকানি হয়।

তারা আরও জানান, এলাকার অধিকাংশ মানুষ এখন আর নলকূপের পানি পান ও ব্যবহার করে না। অনেকে নলকূপ বন্ধ করে দিয়েছে। তারা এখন পাইপ লাইনের সাহায্যে সরবরাহকৃত অথবা বোতলজাত পানি কিনে পান করে।

গ্রামের বিদ্যুৎ মিস্ত্রি ইসমাইল হোসেন জানান, তামাই নতুনপাড়া আবাসিক এলাকায় অবস্থিত মেসার্স মুন্সী ব্রাদার্স মার্চরাইজ অ্যান্ড প্রসেস মিলসের কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য পানি গোপনে ঘরের মধ্যে স্থাপিত বিদ্যুৎ চালিত পাম্প দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে ফেলা হয়। তিনি ওই প্রসেস মিলে বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন। তিনি আরও জানান, শুধু এ কারখানাই নয় এ এলাকার প্রায় সব কারখানাই এ কাজ করে।

তামাই গ্রামের ফিরোজ আহমেদ জানান, নলকূপের পানি খাওয়া ও গোসল করা ছেড়ে দিয়েছি। একটু বৃষ্টি হলে এই প্রসেস মিলের বর্জ্যের দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা যায় না। এ সব কারখানায় নিয়ম অনুযায়ী আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার থাকার কথা থাকলেও তা নেই। তারা মানবদেহে ক্ষতিকর কেমিক্যালের বর্জ্য শোধন না করেই সরাসরি খাল বিল জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে ফেলছে। 

ওই গ্রামের গোলাম ছারোয়ার বলেন, এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে এ কারখানা মালিক কিছু বাড়িতে পাইপ লাইনের সাহায্যে সাপ্লাইয়ের পানি সরবরাহ করে। এ পানিও কিছুক্ষণ পাত্রে রাখলে নিচে ধাতব পদার্থের মতো জমাট বাঁধে।

এ বিষয়ে বাবুল খান ও সেরাজুল ইসলাম জানান, প্রসেস মিলের কেমিক্যালের বর্জ্যে এ এলাকার অধিকাংশ ঘরের টিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছরই পালটাতে হচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলে এ সব টিন লাল হয়ে মরিচা ধরে। এরপর তা ছিদ্র হয়ে যায়। বৃষ্টি হলে ওই ছিদ্র দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পরে। বাড়িতে নলকূপ থাকলেও তা ব্যবহার করা যায় না।

সিরাজগঞ্জ স্বার্থ রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক জহুরুল হক জানান, সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এই শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের তাঁত শিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই সময় এসেছে পরিকল্পনা করবার। এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে ।

এ বিষয়ে মেসার্স মুন্সী ব্রাদার্স মার্চরাইজ অ্যান্ড প্রসেস মিলসের স্বত্বাধিকারী শওকত মুন্সি জানান, আমরা বর্জ্য মাটির নিচে দিই না। নিজেদের খালের মধ্যে ফেলি। এ ভাবেও আমরা বর্জ্য ফেলতে চাই না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের পক্ষ হতে উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরাও সহায়তা করব।

বেলকুচি প্রসেস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মজিদ জানান, সব প্রসেস মিলকে এক স্থানে নিয়ে একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট তৈরির প্রস্তাব সরকারের কাছে দেওয়া আছে। এটি হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।

বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, যেহেতু এলাকাটি তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ, সেহেতু এখানে অনেক গুলি প্রসেস মিল ও সুতা রং করার কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত