মার্কেট খোলার দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:৪৭ এএম

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রুখতে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে দোকান খোলা রাখার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রাজধানীর নিউমার্কেট, পুরান ঢাকার ইসলামপুর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এলাকার কয়েকশ ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সরকার দোকান খোলার সময়সীমা বেঁধে দিলে তারা অন্তত ঈদের মৌসুমে ব্যবসার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা করতে চান। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে করোনায় মরতে হবে, আর দোকানপাট বন্ধ থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। এখন দুই দিকেই মরণ। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা দোকান খোলা রাখতে চান। বিস্তারিত নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে

নিউমার্কেট ও গাউছিয়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ : গতকাল সকাল থেকে নিউমার্কেট ও গাউছিয়ায় দোকান মালিক ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা ‘লকডাউনের’ মধ্যে সীমিত আকারে দোকান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খোলা রাখার দাবি জানান তারা। তারা মার্কেটের সামনের সড়কে দাঁড়িয়ে ‘এবারের লকডাউন মানি না, মানব না’ বলে সেøাগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এতে মিরপুর সড়কে নিউমার্কেট থেকে সাইন্সল্যাব পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘণ্টা দুয়েক ধরে মিছিল সমাবেশ করার পর ব্যবসায়ীরা গাউছিয়া ও নিউমার্কেট এলাকায় ছোট ছোট জটলা করে অপেক্ষা করতে থাকেন। তবে নিউমার্কেট, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, মুন ম্যানশন শপিং সেন্টার, ইশতিয়াক ম্যানশন, নূর ম্যানশন, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নূরজাহান ম্যানশন, প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টার, গ্লোব শপিং সেন্টার, আল্পনা প্লাজাসহ বিভিন্ন মার্কেটের দোকান মালিক, ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা রাস্তায় নামলেও এই এলাকায় কোনো দোকান খুলতে দেখা যায়নি। 

নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, ‘সরকার বলছে এক সপ্তাহের লকডাউন। অথচ সোমবার সকাল থেকে আমরা দেখছি তা ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে। শিল্পকারখানা খোলা, গাড়ি চলছে, সবই চলছে শুধু মার্কেট বন্ধ। দোকানপাট বন্ধ রাখতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এটা কোন কথা? সব খোলা রেখে দোকান বন্ধ রাখবে এটা হতে পারে না। যদি লকডাউন হয় তাহলে শতভাগ লকডাউন হোক। আর যদি অনেক কিছু খোলা থাকে তবে মার্কেট খোলা রাখতে হবে। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট খোলা রাখতে চাই। মঙ্গলবার নিউমার্কেট, তেজগাঁও, কলাবাগান, ধানমন্ডি থানা এলাকার মার্কেট হলিডে। বুধবার থেকে দিনে অন্তত ৪ ঘণ্টা করে মার্কেট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ করছি।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ফয়জুর রহমান বলেন, ‘মার্কেট খুলে দেওয়ার দাবিতে ব্যবসায়ীরা সকাল থেকে বিক্ষোভ করেন। প্রচুর মানুষ সমাগমের কারণে এই বিক্ষোভের মধ্যেও করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি ঘটবে। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করছি। যাতে সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে তারা পালন করেন।’

সরকার ঘোষিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় পুরান ঢাকার ইসলামপুর-পাটুয়াটুলি রোডে কয়েকশ ব্যবসায়ী রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সকাল থেকে রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করছিলেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন। আমরা তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছি।’

চট্টগ্রামে লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভ ব্যবসায়ীদের : চট্টগ্রাম নগরীতে লকডাউনবিরোধী মিছিল ও সমাবেশ করেছেন  রেয়াজউদ্দিন বাজার তামাকুমন্ডি লেইনের ব্যবসায়ীরা। গতকাল বিকেলে নিউমার্কেট মোড় ও রেয়াজউদ্দিন বাজারের সামনে মিছিল-সমাবেশ করেছেন ওই এলাকার মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ীরা। প্রায় হাজার জনের উপস্থিতির ওই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ থেকে অবিলম্বে মার্কেট খোলা রাখার অনুমতির দাবি জানানো হয়। সেখানে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।

রেয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির সভাপতি আবু তালেব জানিয়েছেন, প্রায় ১১০টি মার্কেটের দোকানের মালিক-কর্মচারীরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সামনে রমজান, আমরা বিপুল টাকার পণ্য দোকানে তুলেছি। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলা রাখতে চাই। ঈদের বেচাকেনা করতে না পারলে কোটি কোটি টাকা লোকসানে পড়ব।’

পঞ্চগড়ে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর চড়াও ব্যবসায়ীরা : ‘লকডাউনের’ মধ্যেও দোকান খোলা রাখায় পঞ্চগড় বাজারের আলহাজ ক্লথ স্টোরে জরিমানা করতে চাইলে পঞ্চগড় সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলামের ওপর চড়াও হন বস্ত্র ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা। পরে প্রতিরোধের মুখে সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হন তিনি। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই দোকান খোলা রাখার দাবিতে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন বস্ত্র ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা। কয়েকশ বস্ত্র মালিক ও কর্মচারী মহাসড়কসহ করতোয়া সেতুর উত্তর প্রান্তে বাঁশ ফেলে অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন পঞ্চগড় বস্ত্র মালিক সমিতির সভাপতি শহিদুল ইসলাম খান ও সহসভাপতি আবদুল হান্নান। বিক্ষোভকারীরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে মিছিল করতে থাকেন। এ সময় সড়কে কয়েকশ যানবাহন আটকা পড়ে। চরম দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। পরে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে। তারা দোকান খোলা রাখার দাবি করছিল। এটা কেবিনেটের সিদ্ধান্ত। তাই আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখি না। তারপরও আমরা তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে রাস্তায় বিক্ষোভ না করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার জন্য বলেছি। পরে তারা বিক্ষোভ তুলে নিয়েছে।’

বেগমগঞ্জে লকডাউনবিরোধী মিছিল, ১৩ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী বাজারে লকডাউনের প্রতিবাদ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার দাবিতে মিছিল করেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। আর স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে অর্থদন্ড করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল দুপুরে ফেনী-নোয়াখালী সড়কের চৌমুহনী বাজারে মিছিল করেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে সরকারের কাছে দাবি জানান।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান রনি বলেন, ‘চৌমুহনী বাজার থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। তাই আমরা প্রতিদিন এ বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। জনগণকে সচেতন করতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

চাঁদপুরে দোকান খোলা রাখার দাবিতে বিক্ষোভ : চাঁদপুরে লকডাউনে নির্দিষ্ট সময়ে দোকানপাট খোলা রাখার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী এই বিক্ষোভ মিছিল হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ব্যবসায়ীদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শহরের হাকিম প্লাজা, হকার্স মার্কেট, সাউথ প্লাজাসহ বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন। মিছিলটি শহরের কালীবাড়ি থেকে শুরু হয়ে পৌরসভার সামনে অবস্থান নেয়। পরে সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি পুনরায় হকার্স মার্কেটের সামনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কে অবস্থান করে চাঁদপুর টাওয়ারের সামনে সমাবেশ করে। এ সময় ব্যবসায়ীরা লকডাউনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সেøাগান দেন।

রাজশাহীতে মার্কেট সচল রাখার দাবিতে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : লকডাউনে রাজশাহীতে মার্কেট খুলে রাখার দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল সকালে ব্যবসায়ীরা সাহেববাজারে রাস্তায় নেমে পড়েন। ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, সামনে ঈদ। এই সময়ে তাদের মার্কেট বন্ধ থাকলে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন। বেলা ১১টার দিকে রাজশাহীর বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীরা সাহেববাজারে আরডিএ মার্কেটের সামনে জড়ো হন। তারা মার্কেটের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন। সাহেববাজার বড় রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। দোকান খুলে দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন সেøাগান দেন। পরে পুলিশসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম। তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ব্যবসায়ীরা তাদের দাবি তুলে ধরেন এবং মার্কেট খোলা না থাকলে তারা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে জানান। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে মার্কেট খোলা রাখার দাবি করেন নেতারা।

মাগুরায় ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ : লকডাউনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে মাগুরা শহরের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। গতকাল দুপুরে শহরের বেবী প্লাজা মার্কেটের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মাগুরা পৌর মেয়রের শহরের বাসভবনে গিয়ে শেষ করেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়িক ক্ষতি থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান খোলার দাবি জানান তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত