বাবা-মা-বোন-নানিকে মেরে দুই ভাইয়ের আত্মহত্যা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:৫০ এএম

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একই পরিবারের ছয় সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে। গত সোমবার অ্যালেন শহরের বাসভবন থেকে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে বলে জানিয়েছে সিএনএন। স্থানীয় পুলিশের ধারণা, পরিবারটির ছয় সদস্যের মধ্যে দুই ভাই অন্য চার সদস্যকে হত্যার পর নিজেরা আত্মহত্যা করেন। তবে দেশে থাকা তাদের স্বজনরা এমন তথ্য মানতে নারাজ।

নিহতরা হচ্ছেন ১৯ বছরের ফারহান তৌহিদ ও ফারবিন তৌহিদ, তাদের বড় ভাই ২১ বছরের তানভির তৌহিদ, মা আইরিন ইসলাম (৫৬), বাবা তৌহিদুল ইসলাম (৫৪) এবং তানভির তৌহিদের নানি ৭৭ বছরের আলতাফুন নেসা।

নিহত আলতাফুন নেসা পাবনা শহরতলির দোহারপাড়ার প্রয়াত আবুল মোসলেম শেখের স্ত্রী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আলতাফুন নেসা ও তার মেয়ে আইরিন ইসলামের মৃত্যুর খবর পাবনার বাড়িতে পৌঁছানোর পর সেখানে শুরু হয় স্বজনদের শোকের মাতম। তারা বলছেন, ছোটবেলা থেকেই নিহত ফারহান ও তানভীর মেধাবী। তাদের পরিবারেও ছিল না তেমন কোনো সংকট। হতাশার কারণে পরিবারের সবাইকে হত্যা করে তারা আত্মহত্যা করেছে এমন কথা মানতে পারছেন না কেউ।

টেক্সাসের অ্যালেন শহর পুলিশের সার্জেন্ট জন ফেলি জানান, তৌহিদুল ইসলামের পরিবারের কোনো একজন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন বলে তাদের এক পারিবারিক বন্ধু পুলিশকে জানায়। খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

সোমবার মরদেহগুলো উদ্ধার করলেও পুলিশের ধারণা নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে গত শনিবার। পরিবারের ছয় সদস্যের মধ্যে দুই ভাই অন্য চার সদস্যকে খুনের পর নিজেরা আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তারা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে দাবি পুলিশের।

এ ঘটনার আগে ইন্সটাগ্রামে দীর্ঘ একটি সুইসাইড নোটে ফারহান জানায়, নবম শ্রেণি থেকেই হতাশা আর বিষণ্নতার বিরুদ্ধে তার লড়াই অব্যাহত রয়েছে। এ থেকে উত্তরণের পথও খুঁজছে সে। কিন্তু নিজে আত্মহত্যা করলে পরিবারের অন্যরা সারা জীবন কষ্ট পাবে বিধায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মারা যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সে। পরে দুই ভাই মিলে বন্দুক কিনতে যায়।

ওই পোস্টে ফারহান আরও জানায়, সে তার ছোট বোন ও নানিকে হত্যা করবে। আর তার বড় ভাই খুন করবে তাদের মা-বাবাকে। সবাইকে শেষ করে দেওয়ার পর তারা নিজেরা আত্মহত্যা করবে। ফলে কষ্ট পাওয়ার মতো আর কেউ থাকবে না।

পাবনায় স্বজনদের শোকের মাতম : পাবনা শহরতলির দোহারপাড়ার মেয়ে আইরিন ইসলাম মেরীর সঙ্গে প্রায় ২৫ বছর আগে বিয়ে হয় পুরান ঢাকার তৌহিদুল ইসলামের। প্রায় ২২ বছর আগে ডিভি ভিসায় তৌহিদুল যুক্তরাষ্ট্রে যান। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। পরিবার নিয়ে প্রথম দুই বছর নিউ ইয়র্কে ছিলেন। ২০ বছর আগে তারা টেক্সাসে স্থানান্তর হন। প্রথমে তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করলেও সম্প্রতি সিটি ব্যাংকের ভালো পদে কাজ করছিলেন তৌহিদুল। বিয়ের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এ দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ছিল সুখী পরিবার। দুই বছর আগে পাবনা থেকে মা আলতাফুন নেসাকে ডালাসে নিয়ে যান মেরী। সোমবার ডালাসের অ্যালেন সিটির বাসা থেকে পরিবারটির ছয় সদস্যের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ বলছে, পরিবারের সব সদস্যকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছে আইরিন তৌহিদ দম্পতির দুই ছেলে ফারহান ও তানভীর। গতকাল সকালে স্বজনদের মৃত্যুর সংবাদ পাবনার বাড়িতে পৌঁছানোর পর সেখানে শুরু হয়েছে শোকের মাতম। স্বজনরা জানান, ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ফারহান ও তানভীর। পরিবারেও ছিল না তেমন কোনো সংকট। হতাশার কারণে পরিবারের সবাইকে হত্যা করে তারা আত্মহত্যা করেছে এমন কথা মানতে পারছেন না কেউ।

আকস্মিক এ মৃত্যুর খবরে গতকাল সকাল থেকেই আলতাফুন নেসার বাড়িতে ভিড় জমান স্বজন-প্রতিবেশীরা। তাদের কান্নার রোলে সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। এমন মৃত্যুকে রহস্যজনক বলে দাবি করে সুষ্ঠ তদন্তও দাবি করেছেন তারা।

নিহত আলতাফুন নেসার বড় ছেলে আরিফুর রহমান আলফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বোন শুধু তার পরিবারই নয়, আমাদেরও সবকিছু দেখভাল করত। তার নিজের সংসারে কখনই অশান্তি ছিল না। ছেলেমেয়েরাও প্রতিভাবান, মেধাবী ও ভদ্র। তারা বাবা-মায়ের পাশাপাশি সেখানে বেড়াতে যাওয়া তাদের নানিরও যত্ন নিত। এমন ছেলেরা বাড়ির সবাইকে হত্যা করেছে তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না।’

নিহত আলতাফুন নেসার ছোট ছেলে আবুল কালাম আজাদ হিরণ বলেন, ‘মা গত বছর আমেরিকায় বোনের বাড়িতে গিয়েছেন। করোনার কারণে আটকে গিয়েছিলেন। আগামী ৭ এপ্রিল (আজ) তার পাবনায় ফেরার কথা ছিল। পরিবারের সবাই মিলে মাকে বিদায় জানাতে টেক্সাস ইউনিভার্সিটি থেকে আমার ভাগ্নি পারভিনকেও নিয়ে এসেছিল। কে জানত তাদের এমন মৃত্যু হবে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, বিষয়টি যেন সুষ্ঠ তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়।’

স্বজনরা জানান, নিউ ইয়র্ক থেকে নিহত আলতাফুন নেসার বড় ছেলে টেক্সাস পৌঁছলে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন পাবনা প্রতিনিধি রিজভী রাইসুল ইসলাম

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত