সম্ভবত সবচেয়ে উচ্চারিত কথাগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’। শিক্ষা আচরণের পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং কোনো একটি জাতিকে যূথবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা একটি শিশুর মননকে নতুন করে গড়তে সহযোগিতা করে এবং এর ফলে তার সামনে ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই শিক্ষার্থীর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীকে শুধু কিছু বুলিই শেখায় না, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বা আদর্শ থাকে তার আলোকে শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে থাকে। প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সে নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কোনো কোনো শিক্ষাব্যবস্থা অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত, যেখানে শিক্ষার্থীদের পরিবার ও সমাজ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়; শিক্ষার্থীদের নিজস্ব পরিম-লে নিয়ে এসে সম্পূর্ণভাবে একটি নতুন ব্যবস্থায় রাখা হয়। তখন শিক্ষাজীবন শেষে ঐ শিক্ষার্থী আবার যখন পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে ফিরে আসে সেটা তার কাছে অনেকটাই অপরিচিত বা ভিন্ন কিছু মনে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ না। প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু উদ্দেশ্য থাকে যেখানে শিক্ষার্থীরা সেই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুব কমই দেখা যায় যেখানে শিক্ষার্থীকে মুক্তভাবে বা বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনদর্শনে অভ্যস্ত করা হয়।
এমনিতেই কিছু না কিছু শিক্ষা আমরা পরিবার থেকে পাই। পরিবারের সদস্যরা, বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত অল্পবয়স্ক সদস্যদের শিক্ষা দিয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাও উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ না। পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিজস্ব বিশ্বাস, দর্শন ও চিন্তা জগতের প্রচ্ছন্ন প্রতিফলন এতে থাকে। যদিও আধুনিক পরিবারসমূহ শিশুদের জন্য চিন্তার দ্বার উন্মোচন করে রাখে যার মাধ্যমে শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর মাধ্যমে তাদের একধরনের নিজস্ব বিশ্লেষণী ক্ষমতা গড়ে ওঠে। এভাবেই একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের ও অন্য বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষাকে ব্যক্তির সঙ্গে বিশ্বব্রহ্মা-ের যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি শিক্ষার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়ের দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, শিক্ষা মানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম অধ্যয়ন না, শিক্ষা হচ্ছে বিভিন্ন জ্ঞানের সমন্বয় যা পরবর্তী সময়ে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা পালন করতে পারে। সেই বিচারে শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতি, ধর্ম, সামাজিক সম্প্রীতি ও সুরক্ষা সবকিছুই যুক্ত।
যেকোনো জাতীয় শিক্ষাক্রমে সাধারণ বা কমন কিছু বিষয় থাকতে হয়। যা মূলত কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে মানুষ গড়ার দর্শনগত মূল ভিত্তি। এই দর্শনগত ভিত্তির মধ্যে ন্যূনতম যুক্ততা না থাকলে একটি জাতি কখনই নিজেকে সামষ্টিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। কোনো সমাজে ব্যক্তি নিজে যেমন স্বাতন্ত্র্য তেমনি স্বাতন্ত্র্যের বৈচিত্র্যপূর্ণ সমন্বয়েই তৈরি হয় একটি শক্তিশালী সমষ্টি। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সমন্বয়ই হচ্ছে একটি জাতির শক্তির জায়গা। জাতীয় দর্শনগত দিকনির্দেশনা প্রদানে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একটি ব্যাপক যোগাযোগ আছে বা থাকতে হয়। বলা হয় শিক্ষা অন্যতম মৌলিক অধিকার। সর্বজনীন গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে এবং একই সঙ্গে এতে শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের এই অন্তর্ভুক্তি দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায় একটি নতুন রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালনা করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক চেতনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গণমুখী ও সর্বজনীনতার পথে খুব বেশি এগোতে পারেনি, একমুখী তো নয়ই। ফলে দেখা যায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষা ঐক্যের পরিবর্তে বিভক্তি তৈরি করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক অনেকগুলো সহিংসতার ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের আর্থিক সামর্থ্য অনেক বেড়েছে। ১৯৯০ সালের রাষ্ট্র বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের সমাজে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে বা যথাযথভাবে অর্থনৈতিক প্রণোদনা না থাকার কারণে আনেক শিশুর অভিভাবক এখনো সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন না বা শিক্ষালাভের জন্য বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দারস্থ হতে হয়। উল্লেখ্য, এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাক্রম শিক্ষার ন্যূনতম মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।
ইউনিসেফের মতে, বংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ যার মধ্যে মাত্র ৬৭ শতাংশ বা তার চেয়ে কম মাধ্যমিকের যোগ্যতা অর্জন করে। শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন অনেক পুরনো। সব ধরনের শিক্ষায় অবশ্যই গুণগত মান অর্জন করতে হবে। বেশ কিছুদিন ধরে স্কুলে ভর্তির হার বাড়ানোর জন্য সরকার নির্দিষ্ট হারে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দিয়ে আসছে। এই উপবৃত্তি সার্বিকভাবে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। কিন্তু শিক্ষাকে এখনো বৈষম্য বা বিভক্তি দূর করার উপায় হিসেবে কার্যকর করা যায়নি। রাষ্ট্রকে বিবেচনা করতে হবে যাতে অন্তত আর্থিক অবস্থার কারণে কোনো শিশুকে গুণগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। প্রয়োজনে সমাজের দরিদ্রতম ২০ শতাংশ মানুষের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে যাতে এই পরিবারের সন্তানরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত হয়, পাশাপাশি তাদের অন্যান্য মৌলিক অধিকারও নিশ্চিত হয়।
ইউনিসেফ আরও বলছে, স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত প্রায় ৬২ লাখ শিশু এখনো শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে এবং এদের বেশির ভাগেরই বাস শহরের বস্তি বা দুর্গম অঞ্চলে। এই ৬২ লাখ শিশুর মধ্যে ৪৬ লাখ শিশুই প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার বয়সী। এই শিশুদের নিয়ে রাষ্ট্র কোনোভাবেই নীরব থাকতে পারে না। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এদের যদি মানবসম্পদ ও যৌক্তিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায় তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। পশ্চাৎপদতা আঁকড়ে ধরে নয়, ধারাবাহিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আধুনিক সমাজ তৈরিতে তারা গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে। তাই এই শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব যদি শুধুমাত্র তথাকথিত কিছু দানশীল ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বেরই অবহেলা । এই শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ অবশ্যই কাম্য। কারণ এই অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে সমাজের মধ্যকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তার কায়েমি স্বার্থ হাসিলে এদের ব্যবহারে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
