তিন মুরগি চুরির জরিমানা একটি চড় ও দেড় লাখ টাকা

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২১, ০৬:৩৫ পিএম

তিনটি মুরগি চুরির অভিযোগে শরীয়তপুরে চার ব্যক্তিকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মুরগি তিনটির দাম বর্তমান মূল্যে ৪০০ টাকা। এ ঘটনায় গত ৪ এপ্রিল ও ১০ এপ্রিল দুটি দরবার সালিসও হয়। শেষ দরবারে এক অভিযুক্তকে চড় মারে স্থানীয় গ্রাম্য মাতব্বর মতিন চৌকিদার।

গত ৩১ মার্চ (বুধবার) রাতে সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব সোনামুখী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের নিকটবর্তী পালং মডেল থানা ও ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম্য আদালত থাকলেও গ্রাম্য মাতবররাই বিচারের দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযুক্তরা হলেন ওই গ্রামের শাহাদাত তালুকদার (১৮), টিটু তালুকদার (১৯), বাবু তালুকদার (১৮) ও জহিরুল রাড়ি (১৮)।

এলাকাবাসী জানান, গ্রাম্য মাতবর মান্নান চৌকিদার, সেকেন্দার রাড়ি, ফোরহাদ ঢালী, বোরহান মোল্লা, বোরহান সরদার, ইলিয়াস তালুকদার, গনি তালুকদার, হযরত আলী তালুকদার, আবদুল আলী মাতবর, খালেক তালুকদার, ফরিদ আহম্মদ, মতিন চৌকিদারসহ বেশ কয়েকজন এ বিচার কাজ পরিচালনা করেন। এ সময় সালিস বৈঠকে অন্তত ৪০০/৫০০ জন উপস্থিত ছিলেন।

বুধবার (১৪ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে কয়েকজন ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়, গত ৩১ মার্চ রাতে সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের পূর্ব সোনামুখী গ্রামের জিল্লুর রহমান তালুকদারের ছেলে রাহাত তালুকদারের মুরগি খামার থেকে তিনটি বয়লার মুরগি চুরি হয়। একই গ্রামের শাহাদাত, টিটু, বাবু  ও জহিরুল এ চুরি করেছেন—এমন অভিযোগে গত ৪ এপ্রিল রাহাতের বাড়িতে সালিশি বৈঠক বসে। উল্লেখিত মাতবররা ওই চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে। যা ১০ এপ্রিলের মধ্যে মাতবরদের হাতে জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু পুরো টাকা জমা না দেওয়ায় ওই দিন বিকেলে আবার ১১০ নম্বর সোনামুখী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সালিশি বৈঠক বসে। বৈঠকে ৪০০/৫০০ জন উপস্থিত ছিল। দরবারে অভিযুক্ত শাহাদাতকে চড় মারে স্থানীয় গ্রাম্য মাতবর মতিন চৌকিদার।

অভিযুক্ত টিটু তালুকদার বলেন, বিকেলে আমরা ক্রিকেট খেলি। পরে রাতে শাহাদাত, বাবু  ও জহিরুল মিলে খাওয়ার জন্য তিনটি মুরগি ওই খামার থেকে আনে। পরে আমি যুক্ত হই। সালিসে আমাদের দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

তবে খামার মালিক রাহাত তালুকদার বলেন, আমি এ ব্যাপারে বক্তব্য দিতে রাজি নই। এলাকায় যেহেতু মীমাংসা হয়েছে এ ব্যাপারে আর কিছু বলব না।

স্থানীয় মাতবর সেকেন্দার রাড়ি বলেন, ‘মুরগি চোরেদের হাতেনাতে ধরতে পারে নাই খামারের মালিক। রাতে ঘটনা, পরদিন সকালে যেখানে মুরগি রাখছে, আনতে গিয়ে নিজেদের দোষে ধরা পড়ে যায়। যারা চুরি করছে তারা বলে তিনটা মুরগি, আর খামারের মালিক বলে ১৯৭টা। আমরা সঠিকভাবে মুরগি দেখি নাই। ওদের জবানবন্দিতে যা পাইছি। তিনজন আগেও চুরি করেছে।  আর একজন নতুন যোগ করে চারজন মুরগি চোরের সঙ্গে জড়িত’।

তিনি বলেন, ‘চুরি করলে তো ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। পরে জুরি বোর্ডে বসে তাদের জরিমানা করি। জুরিবোর্ডে সভাপতিত্ব করেন খালেক তালুকদার’। 

‘পেছনে ওদের জের আছে, ওদের একটি জরিমানা করা হয়েছিল। তখন সালিসে বলা হয়েছিল, আবার এ ধরনের অপরাধ করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে, পরে বিচার হবে’।

রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সংরক্ষিত মহিলা মেম্বর পারুল আক্তার বলেন, ‘ঘটনার পরদিন বিষয়টি আমি জানতে পারি। স্থানীয় রাহাত তালুকদারের মুরগির খামার থেকে ওই চারজন তিনটি বয়লার মুরগি চুরি করে একটি ঝোপঝাড়ে রাখে। রাতে একটি মুরগি শিয়ালে নিয়ে যায়। পরে আমরা ওই চারজনকে জিজ্ঞেস করি, ওরা বলে পিকনিক করবে বলে ওরা তিনটি মুরগি চুরি করেছে। স্থানীয় মাতবররা সালিস দরবার বসিয়ে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে’।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান বলেন, ‘গরু চুরি হোক, আর মুরগি চুরি হোক মাতবরদের গ্রাম্য সালিসে এ ধরনের কোনো বিচার করার আইনি বিধান নাই। যদি প্রকৃতপক্ষে মুরগি চুরির ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে গ্রাম্য আদালত আছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানের গ্রাম্য আদালতে আবেদন করতে পারে। সেই মোতাবেক দোষী সাব্যস্ত হলে গ্রাম্য আদালত বিচার করবে। অথবা আইনপ্রয়োগকারী তার বিচার করবে। আমি মনে করি মুরগি চোরের বিচার করে গ্রাম্য মাতবররা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তারা সমঅপরাধী বলে আমি বিশ্বাস করি।

শরীয়তপুরের সদরের পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আক্তার  হোসেন বলেন, বিষয়টা আমি জানলাম। এ ধরনের ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান সর্বোচ্চ জরিমানা করতে পারে ৪ হাজার ৪৯৯ টাকা। স্থানীয়  মাতবরদের গ্রাম্য সালিসে এ ধরনের কোনো বিচার করা আইনি বিধান নাই। আমি অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত