করোনাভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী চলমান লকডাউনে চরম খাদ্যাভাবে পড়েছে ভাসমান ও নিম্নআয়ের মানুষ। কাজ ও খাবারের সংস্থান না থাকায় চরম খাদ্যকষ্টে ভুগছে তারা। এমনকি মানুষের দান ও দক্ষিণায় নির্ভরশীলরাও পড়েছে মহাসংকটে। গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে ক্ষুধার্ত মানুষের চরম খাদ্য সংকটের যে বর্ণনা উঠে এসেছে, তা খুবই বেদনার।
মহামারী ও লকডাউনে ছিন্নমূল মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা ও অসহায়ত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে, ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজ, রেল ও বাসস্টেশনে বসবাস করা মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। অপরদিকে, করোনায় চাকরি হারিয়ে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ভাসমান ও কর্মহীন উভয় শ্রেণির সহায় হয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। যারা বেকার হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য দ্রুত কর্মস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকা প্রণয়ন করে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। এদের মধ্যে যারা কর্মক্ষম, তাদের যাচাই করে সহনীয় হারে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যা দিয়ে কর্মহীন লোকেরা নিজেরাই উপার্জনের পথ খুঁজে নিতে পারে।
অপরদিকে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কঠোর বিধিনিষেধের বেড়াজালে নির্দিষ্ট সময়ের পরে বন্ধ থাকছে হোটেল, রেস্তোরাঁ। করোনার সংক্রমণ এড়াতে হোটেল, রেস্তোরাঁগুলোতে আগের মতো ভিড় করছে না ক্রেতারা। আর এতে খাবার সংকটে পড়েছে সমাজের একটি বড় অংশের মানুষ। এই মানুষেরা খাবারের জন্য মূলত অপরের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিক সময়ে হোটেল রেস্তোরাঁর সামনে ভিড় জমিয়ে খাবার সংগ্রহ করা এই মানুষেরা পড়েছে তীব্র খাবারের সংকটে। যারা বয়স্ক, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। খাবারের খোঁজে তারা বাণিজ্যিক এলাকা ছেড়ে শহরের আবাসিক এলাকায় চলে যাচ্ছে। করোনা আতঙ্কের মধ্যে খাবারের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তা অনেককে অপরাধের পথেও পরিচালিত করছে। এতে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক নানা নৈরাজ্য রোধে তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রতিবন্ধী, বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষেরা। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ১ হাজার ৬০০ মানুষের ওপর করা এক সাম্প্রতিক জরিপে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর নিম্নআয়ের মানুষের ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারই আর্থিক সংকটে পড়েছে। আয় কমে যাওয়ায় তারা খাবার গ্রহণ কমিয়ে দিয়েছে। পেটের ক্ষুধা মেটাতে ঋণ করে চলছে। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধও করতে পারছে না তারা।
করোনার সময়ে ক্ষুধায় কাতর মানুষের পাশে অনেক মানুষ দাঁড়াচ্ছেন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তবে গত বছরের মতো এবার নাগরিক উদ্যোগে খাবার ও সাহায্যসামগ্রী পৌঁছানোর উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে কম। অবশ্য যথেষ্ট উদ্যোগ থাকলেও বিপুল সংখ্যক অভাবী মানুষের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। আর বিধিনিষেধের মধ্যে খাবার ও অর্থসংগ্রহের জন্য বের হতে বেগ পেতে হচ্ছে ছিন্নমূল মানুষদের। শুধু তাই নয়, যারা সাহায্য করবে তাদের আয়ও কমে গেছে। নি¤œ ও নির্দিষ্ট আয়ের অনেক মানুষ বাসাভাড়া ও অন্যান্য খরচের সংকুলান করতে না পেরে ঢাকা ছেড়েছেন। কিন্তু ছিন্নমূল মানুষের তো ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই। তাই পেটে ক্ষুধা নিয়ে ফুটপাতে খাদ্যের অপেক্ষায় থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ভাসমান এ শ্রেণির মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর রয়েছে, এই সময়ে তাদের সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা, যারা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর তারা অঞ্চলভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন, অঞ্চল ভেদে নিরন্নদের জন্য দুইবেলা ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করা কঠিন কিছু নয়। এর জন্য যেটা সবচেয়ে জরুরি, সেটি হচ্ছে আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ গ্রহণ। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও অবস্থাপন্নদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের খাবারের অপচয় কমিয়ে সামান্য একটু খেয়াল রাখলেই আমাদের আশপাশের ক্ষুধার্ত মানুষটির মুখে খাবার জুটতে পারে। করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে খাবারের অভাবে কেউ অনাহারে থাকবে এটা প্রত্যাশিত নয়।
