আইসিডি থেকে সব পণ্যের সরবরাহ চায় বন্দর

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৩৭ এএম

আমদানিকৃত পণ্যের ৩৭টি বাদে বাকি পণ্য এতদিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই হস্তান্তর করে আসছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু এতে বন্দরে যানজট লেগে যাওয়াসহ বিভিন্ন ঝামেলার সৃষ্টি হয়। তাই এখন থেকে ক্রমান্বয়ে সব পণ্য বেসরকারি অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল (আইসিডি বা অফ ডগ) থেকে হস্তান্তরের চিন্তা করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ (চবক)। এ লক্ষ্যে গত ১৪ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রক্রিয়ায় আপত্তি তুলে তৈরি পোশাক মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ বলছে, এতে তাদের খরচ ও সময় দুটোই বেশি লাগবে। তাই আগের মতো বন্দর থেকেই পণ্য হস্তান্তর করা হোক।

অন্যদিকে নৌ মন্ত্রণালয় চাইছে এখন থেকে কিছু পণ্য বন্দরের পাশাপাশি আইসিডি থেকে খালাস হোক। এতে আইসিডির অভিজ্ঞতা বাড়বে। পরবর্তীতে সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বাড়লে সব পণ্য আইসিডি থেকে হস্তান্তর করা যাবে। বিষয়টি নিয়ে আজ মঙ্গলবার নৌপরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন পোশাক কারখানার মালিকরা। মালিকরা বলছেন, আইসিডি মালিকদের সুবিধা দিতে চবক এমন সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, শুরুতে ১৬টি পণ্যের মাধ্যমে আইসিডির কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে আমদানির ৩৭টি পণ্য বন্দর থেকে আইসিডিতে চলে যায়। সেখান থেকে আমদানিকারকদের হস্তান্তর করা হয়। আইসিডি অ্যাসোসিয়েশন চাইছে, তাদের মাধ্যমে আরও অধিক পণ্য হস্তান্তর করা হোক। এতে করে তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে। তাদের দাবি, আরও অধিক পণ্য রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে কাস্টমসের ওপর।

বন্দরের পরিবর্তে আইসিডি থেকে পণ্য হস্তান্তরের পরিকল্পনার বিষয়ে চবক সচিব ওমর ফারুক দেশ রূপান্তর বলেন, ‘পোর্টকে আধুনিক ও গতিশীল রাখতে হলে বাইরে থেকে ডেলিভারি নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর কোনো দেশেই পোর্টের  ভেতর থেকে ডেলিভারির নিয়ম নেই। এজন্য সব পণ্যই (অফ ডগ) বাইরে থেকে ডেলিভারি করতে চাচ্ছি। প্রতিদিন ৫-৬ হাজার যানবাহন ঢোকায় যানজট লেগেই থাকে। তাই আমরা আইসিডি থেকে পণ্য হস্তান্তর করতে চাচ্ছি। এখানে শুল্কের বিষয় আছে। তাই বন্দরের ভেতর থেকে নাকি বাইরে থেকে ডেলিভারি হবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করে এনবিআরের ওপর। আমরা সেটা ফলো করি।’ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তবে তৈরি পোশাক খাতের আমদানিকৃত পণ্য যেহেতু বন্ড লাইসেন্সের আওতায় আসে তাই এগুলো বন্দর থেকেই খালাস করা হয়। অন্য পণ্যগুলো বন্দর ও আইসিডি থেকে খালাস হয়ে আসছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পণ্য হস্তান্তর করতে গিয়ে প্রায়ই বন্দর এলাকায় যানজট লেগে থাকে। সম্প্রতি চবক বন্দরের আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ চাইছে সব পণ্য আইসিডি থেকে হস্তান্তর করতে। তাদের দাবি, বিশ্বের সব বন্দরেই আইসিডি থেকে পণ্য হস্তান্তর হয়।

অন্যদিকে আমদানিকারকরা বলছেন, বন্দরের আধুনিকায়নে তারাও বিশ্বাসী। কিন্তু বর্তমানে বন্দর ও আইসিডির যে সক্ষমতা তাতে রপ্তানি পণ্যে এমনিতেই বাড়তি সময় লাগছে তাদের। এর মধ্যে যদি আবার আমদানিকৃত সব পণ্য আইসিডি থেকে হস্তান্তর করা হয় তাতে বর্তমান সময়ের চেয়ে আরও ৩-৪ দিন বেশি সময় লাগবে। এতে একদিকে তাদের বাড়তি সময় নষ্ট হবে, অন্যদিকে বাড়তি সময়ের জন্য আইসিডিকে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে। এতে করে তারা ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।

ইতিমধ্যে পোশাক কারখানা মালিকরা এমন খবরে উদ্বেগ জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। এছাড়া কাস্টমস কমিশনার ও চবক চেয়ারম্যানকে চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হয়। রপ্তানি কার্যক্রম বেসরকারি আইসিডির মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও আমদানি পণ্য খালাস চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। ফলে লকডাউনের মধ্যেও কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আমদানি হওয়া কাঁচামাল পূর্বের নিয়মে খালাস করা হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে আমদানি হওয়া সব পণ্য বেসরকারি আইসিডি থেকে খালাসের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। বেসরকারি আইসিডিতে পর্যাপ্ত জায়গা, যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক স্বল্পতার কারণে পণ্য খালাসে সময়ক্ষেপণ হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দুই দিনের মধ্যে আমদানি পণ্য খালাস করা গেলেও বেসরকারি আইসিডিতে লাগে ছয় থেকে সাত দিন।  তা ছাড়া বেসরকারি আইসিডির চার্জও চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে অনেক বেশি। কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এই অতিরিক্ত খরচ ও সময়ক্ষেপণের ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সক্ষমতা হারাবে, যা আমাদের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তাই এই সংকটময় মুহূর্তে অতিরিক্ত চার্জ দিয়ে বেসরকারি আইসিডি থেকে আমদানি করা কাঁচামাল খালাস করা সম্ভব নয়।

চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওরা (চবক) চাইছে আইসিডি থেকে পণ্য দিতে। কিন্তু এতে তো আমাদের বাড়তি সময় ও অর্থ যাবে। তাছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে তো এমনিতেই বন্দরে তেমন চাপ নেই। তাই এই মুহূর্তে সবাইকে আইসিডিতে পাঠানোর কোনো মানে দেখছি না। আমরা এনবিআর ও নৌ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি। আগামীকাল (আজ) নৌমন্ত্রীর (খালিদ মাহমুদ চৌধুরী) সঙ্গে কথা বলব। আমরা চাই আগের মতোই আমাদের পণ্য বন্দর থেকে হস্তান্তর করা হোক।’

বিকেএমইএর সহ-সভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিচ্ছে। আমরাও চাই আমাদের বন্দর সিঙ্গাপুরের মতো হোক। কিন্তু সেজন্য তো তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সব পণ্য যদি আইসিডি থেকে হস্তান্তর করতে যায় তাহলে তো বিশাল জট সৃষ্টি হবে। বর্তমানে আইসিডির এই সক্ষমতা নেই। আমাদের সাফ কথা, যেদিন আইসিডিতে পণ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে হস্তান্তর করতে পারবে সেদিন থেকেই আমরা আইসিডি থেকে পণ্য নেব। এর আগ পর্যন্ত বন্দর থেকেই পণ্য নিতে চাই।’

ব্যবসায়ী ও চবক কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে যখন এমন টানাপড়েন চলছে তখন নৌ মন্ত্রণালয় কিছুটা মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে চাইছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারাও চাইছেন পণ্যগুলো আইসিডি থেকেই হস্তান্তর করা হোক। তবে সব পণ্য এখনই সেখানে পাঠাতে চাইছেন না। বন্দরে চাপ বেড়ে গেলে অতিরক্ত পণ্য আইসিডিতে পাঠানোর পক্ষেই মত তাদের। বিষয়টি নিয়ে তারা সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা করবেন।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্রমান্বয়ে বন্দর থেকে আইসিডিতে যেতে চাই। এজন্য আমাদের গত বছরের করোনাকালীন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাই। মন্ত্রণালয় ভাবছে এখন থেকে আইসিডি থেকেও কিছু পণ্য হস্তান্তর হোক। কাজ না করলে তো অভিজ্ঞতা বাড়বে না। এজন্য আমরা সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলব। কিছু স্টেক হোল্ডার হয়তো আপত্তি তুলেছে। আমরা তাদের সঙ্গেও কথা বলব। এটা আসলে মোটিভেশনেরও বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বন্দর থেকে পণ্য হস্তান্তর করতে গেলে ঝামেলা অনেক বেশি। এই ঝামেলা কিছুটা কমিয়ে দিতে পারলে গতিও ফিরবে। আমরা সবার সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত