করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যে ৩১ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। এ মহামারী বহু মানুষকে গরিব থেকে আরও গরিব করেছে। বহু মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বৈশ্বিক মহামারীটি মোকাবিলায় যে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল, শুরুতে তা নিশ্চিত করতে না পারলেও বাংলাদেশ এখন মোটামুটিভাবে করোনার বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। তবে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা কঠিন। এটি মোকাবিলায় সুস্পষ্টভাবে সবার কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত একটি বৈশ্বিক রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন। যত দ্রুত বিশ্বনেতারা এটি অনুধাবন করতে পারবেন, ততই মঙ্গল।
সম্প্রতি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসকাপ) ৭৭তম অধিবেশন হয়। ভার্চুয়াল এ অধিবেশনে এসকাপ সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রনেতারা অংশ নেন। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখেন। তিনি তার বক্তব্যে পরিবহন, জ্বালানি ও আইসিটি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের পথ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। করোনাভাইরাস মহামারী সংকটে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্বনেতাদের একমত হওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে চারটি প্রস্তাবনার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে প্রথমত, করোনা আক্রান্ত সময়কে পাশ কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে উন্নত বিশ্ব, উন্নয়ন সহযোগীদের এগিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরবর্তী যেকোনো সংকটে উন্নয়ন পথ অন্তর্ভুক্তিমূলক, নমনীয় এবং পরিবেশবান্ধব হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও সর্বজনীন করতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কার্যকর পলিসি এবং কৌশল নির্ধারণ করা উচিত। চতুর্থত, বাণিজ্য, পরিবহন, জ্বালানি এবং আইসিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্বিঘ্ন যোগাযোগ প্রবর্তন করার তাগিদ।
করোনাভাইরাস মহামারী পুরো বিশ্বের অর্থনীতি আর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। অনেক দেশ এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে নানা কর্মসূচি ও প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা, চাকরি ধরে রাখা এবং অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ১৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন (১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা) ডলারের একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যা জিডিপির ৪ দশমিক ৪৪ ভাগ। আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) থেকে মুক্তির কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশে পদায়নের পথ টেকসই করতে বাংলাদেশকে প্রস্তুত করা, এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উত্তরণের পথ প্রস্তুত করার বিষয়টিও রয়েছে। বাংলাদেশকে করোনার এ চলমান মহামারীর মধ্যেও মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এ সংকটের কার্যকর সমাধান ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। এজন্য সার্ক, বিমসটেক, বিবিআইএন, বিসিআইএম-ইসি এবং ট্রাইলেটারাল হাইওয়ে উদ্যোগের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছে। সাউথ সাউথ নেটওয়ার্ক ফর পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন বাংলাদেশকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে সহযোগিতা করেছে। ক্রমবর্ধমান সংযোগ এবং ইএসসিএপির এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে উদ্যোগের বাংলাদেশ একজন সমর্থক। এছাড়াও জাতিসংঘ-ইএসসিএপির ক্রস বর্ডার পেপারলেস ট্রেড, এশিয়া-প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তি, পিপিপি নেটওয়ার্কিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ অন্যান্য উদ্যোগে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এসব পারস্পরিক স্বার্থ সম্পৃক্ত সংগঠন ও কর্মসূচির মাধ্যমে বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে।
করোনায় কার্যত প্রায় এক বছর বিশ্বের অধিকাংশ দেশজুড়েই চলেছে লকডাউন। বন্ধ হয়েছে সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা। এতে করে রপ্তানি বাণিজ্য তলানিতে ঠেকেছে অনেক দেশের। এ সংকট থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য উন্নত বিশ্ব, উন্নয়ন অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে একটি আঞ্চলিক শক্তিশালী এবং সর্বজনীন জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা। তবেই করোনার ক্ষতি সামলে এগিয়ে যাওয়া যাবে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই বেশকিছু দেশ ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী প্রভৃতি সহায়তা নিয়ে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে, এমন উদ্যোগ মহামারীর মধ্যেও আশাবাদ জাগিয়ে রেখেছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংকট থেকে আরও ভালোভাবে উত্তরণ করতে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধানদের একমত হতে হবে।
