বাংলাদেশের সংবিধান ও বাবুনগরীর বিবৃতি

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:৪৩ এএম

হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। তার কয়েক দিন আগে গত ২২ এপ্রিলে হেফাজতের আমির হিসেবে তার একটি বিবৃতি দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে হেফাজত নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপটে বিবৃতিতে তিনি সরকার ও লকডাউনের সমালোচনা করে অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জেলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বিনিময়ে ‘দেশের নিম্ন আয়ের গরিব মানুষকে আর হয়রানি ও কষ্ট না দিয়ে’ সরকারকে লকডাউন তুলে নিতে বলেন। বিবৃতির এ অংশে তাকে ও তাদের বেশ দরিদ্রানুরাগী মনে হয়, যদিও এর সত্যতা সম্পর্কে অনেকেই যথেষ্ট সন্দিহান। কারণ ‘নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ’-এর অনুকূলে তাদের কার্যক্রমের কোনো নমুনা দেখতে পাওয়া যায়নি। এমনকি গত এক বছরের করোনাকালীন সংকট মুহূর্তেও না।

‘হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন সব সময় শান্তিপূর্ণ ছিল’ দাবি করে ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করা দেশবাসীর সাংবিধানিক অধিকার। কোনো সরকারই জনগণের এই মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।’ ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত হেফাজতের ‘আন্দোলন’-এর সচিত্র বিবরণ পত্রপত্রিকায় আছে। কাজেই সেগুলো শান্তিপূর্ণ ছিল কি না তার সুরাহা পত্রপত্রিকার সূত্রেই হতে পারে। তবে অনেকেরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে বিবৃতিতে সংবিধানের রেফারেন্স দেওয়ার বিষয়টিতে। আমি এখানে সে বিষয় নিয়েই কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

উদ্ধৃতিতে ধারণা হয়, হেফাজত এবং তার নেতাকর্মীরা বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তারা তা খুব মেনে চলেন। যদি তাই- হয় তাহলে তাদের কাছে প্রশ্ন রাখা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের, বিশেষ করে নারী এবং মুসলিম ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের যে শর্ত আছে, তা তারা মানেন কি না? ২০১৩ সালে অবমুক্ত হেফাজতের ১৩ দফা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি, যার পরতে পরতে ছিল নারী, সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠী ও মুক্তচিন্তার মানুষের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষ। এরপর গত ৮ বছরে হেফাজতের প্রয়াত আমির আহমদ শফী, বিলুপ্তিকালীন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, বর্তমানে রিমান্ডে থাকা যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ বিভিন্ন নেতার বক্তৃতা, বিবৃতি, ওয়াজ মানুষকে কম শুনতে হয়নি। কিন্তু ওসব বক্তৃতা-বিবৃতি-ওয়াজের কোথাওই রাষ্ট্রের নাগরিকদের অর্ধেক অংশ নারীর সমান অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি। কিংবা শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখা যায়নি নাগরিকদের ১০ শতাংশ সংখ্যাল্প ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বা তাদের সমান অধিকারের প্রতিও।

মানুষ জানে, বিভিন্ন ওয়াজে তারা অপ্রাসঙ্গিকভাবে নারীকে এমনভাবে তুলে ধরেন, যা রীতিমতো অশ্লীল। ওয়াজসমূহের ভাষ্য অনুযায়ী দেখলে নারীকে ভোগ্যবস্তু ছাড়া কিছু মনে হয় না, যার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হওয়া উচিত স্বামীর তথা পুরুষের মনোরঞ্জন করা এবং বিনা বাক্যব্যয়ে দাসীর মতো ঘরের কাজের ঘানি টানা। এসব ওয়ায়েজিনের কাছ থেকেই মানুষ শুনেছে গার্মেন্টসে কাজ করা মেয়েরা বেশ্যা, মেয়েদের পড়াশোনা কেবল ততটুকুই দরকার, যা দিয়ে তারা স্বামীকে চিঠি লিখতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধান কি নারীকে এ রকম দৃষ্টিতে দেখতে বলেছে?

সংবিধান ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতিসত্তা নির্বিশেষে সবাইকে সব ক্ষেত্রে সমান অধিকার দিলেও হেফাজত-সংশ্লিষ্টরা উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের বিরোধিতা করেন, নারীরা সব ধরনের কাজে যুক্ত হোক সেটা চান না, রাজনীতিতে নারীর সমান অংশগ্রহণ বা নেতৃত্ব মানেন না। তাহলে কি আমাদের এটা ধরে নেওয়াই সংগত নয় যে, নিজেদের তাণ্ডবের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্যই তিনি সংবিধানকে সাক্ষী মেনেছেন?

বিবৃতিতে তিনি ‘ফিতনা-ফ্যাসাদ এবং প্রতিহিংসা পরিহার করা’কে ইসলামের শিক্ষা হিসেবে স্বীকার করেছেন। অথচ হেফাজতের এতদিনকার সামাজিক-রাজনৈতিক কার্যকলাপে ফিতনা-ফ্যাসাদ এবং প্রতিহিংসার ছবিই বেশি করে স্পষ্ট হয়েছে। ওয়াজের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ঘৃণ্য উক্তি করে নারী ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রে তারা ফিতনা-ফ্যাসাদ এবং প্রতিহিংসারই চাষ করে গেছেন ও যাচ্ছেন। তাদের ইন্ধনে ও অংশগ্রহণে সম্প্রতি সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুরে যেসব জঘন্য ও নির্দয় সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে এবং ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব ভাঙচুর-তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে, সেসবেও মানুষ ফিতনা-ফ্যাসাদ, প্রতিহিংসাই দেখেছে।

সংখ্যাল্প মানুষের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যে স্পষ্টতই সংবিধানবিরোধী তার প্রতিফলন ঘটেছে এমনকি বাবুনগরীর কথিত বিবৃতিতেও। তিনি সরকারকে ‘রিমান্ডে নেওয়া আলেম-ওলামাদের বিধর্মী এবং অবিশ্বাসীদের দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ’ না করাতে বলেছেন। এ রকম সাম্প্রদায়িক আবদার সংবিধানের দোহাই দেওয়া একজন মানুষের মুখে মানায় না। যেখানে বাংলাদেশের আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে মুসলমান নয় এমন যোগ্য নাগরিকদের নিয়োগে কোনো বাধা নেই, কিংবা বাহিনীতে নিয়োগের সময় কেউ ধর্মে ‘অবিশ্বাসী’ কি না তা যাচাই করারও কোনো আইনি বিধান নেই।

এ বছর বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। একই সঙ্গে পালিত হচ্ছে জাতির জনকের জন্মশতবর্ষও। এ সময় তারা তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তাদের যে রূপ তুলে ধরেছেন, তাতে তাদের সংবিধান ও দেশবিরোধী চেহারাই স্পষ্ট হয়েছে। যেসব কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার দিকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পথের একটি অন্তরায়। সুতরাং এখন তাদের এ কথা বলার সময় হয়েছে যে, কেবল নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধানের দোহাই না দিয়ে আসুন এর মৌলিক শর্তাবলির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই এবং ফিতনা-ফ্যাসাদ এবং প্রতিহিংসা পরিহার করে সবাই মিলে একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ায় মনোনিবেশ করি।

মোদিকে ইসলামবিরোধী বলে তাকে প্রতিহত করার জন্য তারা কর্মসূচি দিয়েছেন বলে তারা দাবি করেছেন। সেজন্যই তারা তার বিরোধিতা করেছেন ইসলামপছন্দ গোষ্ঠী বা ইসলামের হেফাজতকারী হিসেবে। তারা যেসব রাষ্ট্রকে ইসলাম রক্ষার বরদার হিসেবে মানেন, যেসব দেশ থেকে তারা বাংলাদেশে ইসলামকে হেফাজত করার জন্য প্রচুর পরিমাণে টাকা আনছেন কয়েক দশক ধরে, সেসব দেশের নেতা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মোদিকে রক্ষার জন্য কভিড চিকিৎসার সহায়তা হিসেবে তরল অক্সিজেন পাঠাচ্ছেন। সেখানে তাদের কোনো উচ্চবাচ্য নেই কেন?

বর্তমানে পত্রপত্রিকাসহ মূলধারার সংবাদমাধ্যমে যেসব খবর বের হচ্ছে তাদের বিলাসব্যসন এবং নারীকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে ভোগের বস্তু হিসেবে ব্যবহারের, তারই একটি নমুনা হলো তথাকথিত ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’। এ সম্পর্কে জনগণ যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র এবং সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, যেসব গোষ্ঠী বা ব্যক্তি রাষ্ট্রের মূল আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, তাদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ বিচারের সম্মুখীন করা। এর পাশাপাশি আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করা, যাতে এসব বিষাক্ত সাপ ঘরে ঢুকতে না পারে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে উত্তরাধিকারে সমানাধিকার (পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পদের উত্তরাধিকার এ দুই ক্ষেত্রেই। এ ছাড়া, একের অধিক বিয়ে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা দরকার, কারণ তাতে সংবিধান ও ধর্মের বিধান লঙ্ঘিত হয়। যেমনÑ সংবিধানের সমান অধিকার নীতিতে এক ব্যক্তির এক ভোট হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়ের ভোটের ওজন সমান, তেমনি এক ব্যক্তির এক স্ত্রী বা স্বামী এভাবেই দেখতে হবে। ধর্মেই আছে, এক ব্যক্তি একাধিক বিয়ে তখনই করতে পারবে যখন সবাইকে সমান ভালোবাসা ও মর্যাদা দিতে পারবে, যা বাস্তবে কখনো সম্ভব নয়। তাই একের অধিক বিয়ে, অর্থাৎ এক স্ত্রী বর্তমান থাকতে আরেক বিয়ে করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা উচিত।

বাংলাদেশকে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিয়ে বসবাসের যোগ্য করে গড়ে তুলতে দরকার সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ। পাশাপাশি দরকার জনগণের সচেতন প্রহরা।

লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত