নামের মিলে মাদক মামলায় প্রায় সাড়ে ১৬ মাস জেল খেটেছেন এক নারী। অবশেষে চট্টগ্রামে একটি আদালতের নির্দেশে হাসিনা বেগম (৪০) নামে ওই নারীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুুপুরে চট্টগ্রামের পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক শরীফুল আলম ভূঞা এ আদেশ দেন। ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী ওমর ফুয়াদ বলেন, ‘হাসিনা বেগমকে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন আদালত। পাশপাশি পুলিশকে প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।’ এদিকে গতকাল বিকেলেই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নামের মিলের কারণে বিনা দোষে সাজা ভোগ করা হাসিনা বেগম মুক্তি পান।
হাসিনা বেগমের আইনজীবী গোলাম মওলা মুরাদ বলেন, ‘পুলিশ ও কারাগারের প্রতিবেদন যাচাই শেষে আদালতের আদেশে অন্যের সাজা ভোগকারী হাসিনা বেগমকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন। বিকেলে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।’
এর আগে টেকনাফ থানা পুলিশের প্রতিবেদন এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের রেজিস্টার যাচাই করে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, সাজা ভোগকারী নারী প্রকৃত আসামি নন।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক এলাকা থেকে দুই হাজার ইয়াবাসহ হাসিনা আক্তার (২৭) ও তার স্বামী হামিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা কক্সবাজারের টেকনাফের পৌর সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরীবাড়ির বাসিন্দা। পরে ওই বছরের ২৭ নভেম্বর তারা জামিনে বের হন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তাদের অনুপস্থিতিতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ দুই আসামিকে পাঁচ বছর করে কারাদ- দেন। সেই সাজা পরোয়ানা টেকনাফ থানায় পৌঁছলে ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৌর সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইসমাইল হাজি বাড়ির হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অ্যাডভোকেট গোলাম মওলা মুরাদ জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় জেল খেটেছেন হাসিনা বেগম। যিনি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইসমাইল হাজি বাড়ির হামিদ হোসেনের স্ত্রী। হাসিনা বেগম টেকনাফ পৌর সদরে একটি পান দোকান করতেন। পুলিশ তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই তাকে গ্রেপ্তার করে। যে মামলায় হাসিনা বেগম জেল খাটছেন সেই মামলার প্রকৃত আসামি টেকনাফ পৌর সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরীবাড়ির হাসিনা আক্তার, তার স্বামীর নামও হামিদ হোসেন। হাসিনা বেগমকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর তার দিনমজুর স্বামী হামিদ হোসেন এলাকা ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে তাদের দুই মেয়ে নানির কাছে থাকছে আর বড় ছেলে শামীম নগরীর একটি বাসায় পরিচারকের কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, হাসিনা বেগমের ছেলে শামীম নেওয়াজের কাছ থেকে বিনা দোষে তার মায়ের কারাগারে সাজা ভোগ করার বিষয়টি জানতে পেরে আমি আদালতে আবেদন করি গত ২২ মার্চ। আদালত টেকনাফ থানার পুলিশকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেয়। গত বৃহস্পতিবার পুলিশ আদালতে জানায়, প্রকৃত আসামি হাসিনা আক্তারের বদলে কারাগারে আছে হাসিনা বেগম। তাদের স্বামীর নাম এক, তবে অনেক তথ্যে পার্থক্য আছে। সেদিনই হাসিনা বেগমের জামিনের আবেদন করি আদালতে। এরপর আদালত ২০১৭ ও ২০১৯ সালের রেজিস্টার যাচাই করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। গতকাল কারাগার থেকে প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানানো হয়, ২০১৭ সালের হাসিনা আক্তার এবং ২০১৯ সালের কারাগারে আসা হাসিনা বেগম এক ব্যক্তি নন।
এই আইনজীবী জানান, হাসিনা বেগম সাজা ভোগ করায় এ বিষয়ে আদালতের লিখিত আদেশ পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি হাসিনা বেগমের ক্ষতিপূরণের দাবির আবেদনও করা হবে।
কারাগার থেকে মুক্তির পর হাসিনা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে পুলিশ যখন টেকনাফ থানায় নিয়ে আসে তখনই আমি বারবার বলেছি আমি আসামি না, আমি কোনো অপরাধ করিনি। কিন্তু উনারা আমার কোনো কথা শুনতে চায়নি। বিনা দোষে জেল খেটেছি। পরিবার পথে বসেছে, ছেলেমেয়েরা অনেক কষ্ট পেয়েছে।’
