৯ মে’র মধ্যে বেতন দিচ্ছে না বেশিরভাগ পোশাক কারখানা

আপডেট : ০৬ মে ২০২১, ০২:৪৩ এএম

শ্রম আইন অনুযায়ী ৯ মে’র মধ্যে শ্রমিকের বেতন-বোনাস (উৎসব ভাতা) পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এ সময়ের মধ্যে বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে অধিকাংশ পোশাক কারখানাই বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে পারছে না। এমনকি বেশকিছু কারখানার বেতন-বোনাস নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কারখানা মালিকরা বলছেন, কিছু কারখানার সক্ষমতার অভাব ও শ্রমিকের গ্রামে যাওয়া ঠেকাতে এমনটা হচ্ছে। সংকটে থাকা মালিকদের উদ্ধারে তাদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ কাজ করছে।

শ্রম আইনের ১২৩ ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো শ্রমিকের যে মজুরিকাল সম্পর্কে তাহার মজুরি প্রদেয় হয় সেই কাল শেষ হওয়ার পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাহার মজুরি পরিশোধ করিতে হইবে।’ তাই আইন অনুযায়ী, আগামী ৯ মে’র মধ্যে শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করতে হবে। তবে হরহামেশাই কারখানা মালিকরা এর ব্যত্যয় ঘটান বলে জানা গেছে। প্রায়ই এ নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ হয়। এবারও একই পথে হাঁটছেন মালিকরা। বোনাস বা উৎসব ভাতার বিষয়ে শ্রম বিধির ১১১ ধারার ৫ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে যাহারা নিরবচ্ছিন্নভাবে ১ (এক) বৎসর চাকরি পূর্ণ করিয়াছেন তাহাদেরকে বৎসরে দুটি উৎসব ভাতা প্রদান করিতে হইবে : তবে শর্ত থাকে যে, প্রতিটি উৎসব ভাতা মাসিক মূল মজুরির অধিক হইবে না, উহা মজুরির অতিরিক্ত হিসাবে বিবেচিত হইবে।’ যদিও কারখানাভেদে যেসব শ্রমিকের চাকরির বয়স তিন বা ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে তারা বোনাস পেয়ে থাকেন।

বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমস্যা হলো, করোনার কারণে আমাদের অনেকেরই অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট হয়ে পড়েছে। অনেকে সময়মতো ক্রেতার কাছ থেকে পেমেন্ট পায়নি। অনেক ব্যাংক লোনও দিতে চাচ্ছে না বলে আমরা জেনেছি। মার্চেও তাই অনেকে বেতন দিতে পারেনি। আমরা এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা শ্রমিকের বেতন সরকারের প্রণোদনায় দেওয়ার জন্য আবেদনও করেছিলাম। আমরা মালিক, সরকার ও ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। দেখা যাক কী হয়। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে ঈদের আগে সবার বেতন-বোনাস পাইয়ে দেওয়ার।’

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ দুই সংগঠন মিলে বর্তমানে দেশে চালু আছে এমন পোশাক কারখানার সংখ্যা সাকল্যে ২২০০-২৩০০ এর মধ্যে হবে। যদিও দুই সংগঠন মিলে হালনাগাদ তিন হাজারের অধিক কারখানা রয়েছে। তবে অনেকেই দুই সংগঠন থেকে সদস্যপদ নিয়েছে। আবার অনেক কারখানার রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। শুধু বিজিএমইএর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য সদস্যপদ হালনাগাদ করেছে। অনেক কারখানা মালিক ভোট বাড়াতে একই ভবনে আলাদা আলাদা নামে নিবন্ধন নিয়েছেন। সব কারখানা মিলে ৩৩ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করেন। বর্তমানে অধিকাংশ শ্রমিকের বেতন ব্যাংকিং/মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছরই কিছু কিছু কারখানায় বেতন-বোনাস বকেয়া থাকে। এ নিয়ে প্রতি বছরই শ্রমিক অসন্তোষ হয়। গত ঈদে সরকারের প্রণোদনার টাকায় শ্রমিকের বেতন দেওয়ার পরও কিছু কারখানায় বোনাস নিয়ে অসন্তোষ হয়। করোনা মহামারীতে অনেক কারখানার সক্ষমতার অনেক কম ক্রয়াদেশ নিয়ে চলছে। আগের তুলনায় পণ্যের দামও অনেক কম। এ কারণে দেড় শতাধিক কারখানা গত মার্চের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। এপ্রিলের বেতনের সঙ্গে ঈদের বোনাস যোগ হওয়ায় অনেক কারখানার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের এক পোশাক কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই টাকাপয়সায় সমস্যা। বায়ার (ক্রেতা) ভুলে আমার ব্যাংক হিসাবে টাকা না দিয়ে অন্য একজনকে দিয়েছে। এখন এই করোনার মধ্যে কার কাছে টাকা পাব? শ্রমিকের বেতনও বা দেব কীভাবে? কয়েক দিন ধরে শুভাকাক্সক্ষী ও ব্যাংকে দৌড়াচ্ছি। অন্তত যাতে ঈদের আগে বেতনটা দিতে পারি।’

এদিকে কয়েকটি বড় কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাদের এই মুহূর্তে বেতন-বোনাস দেওয়ার সক্ষমতা আছে। তবে ১০ তারিখের আগে শুধু শ্রমিকের বোনাস পরিশোধ করতে চাইছেন তারা। আর বেতন পরিশোধ করবেন ঈদ ছুটির আগের দিন। তাদের যুক্তি, আগে শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করলে কারখানা ছুটির আগেই তারা গ্রামের দিকে ছুটবে। সরকার পরিবহন বন্ধ করে দিলে হেঁটে হলেও গ্রামে যাবে। তখন সবাই কারখানার মালিকদের ওপর দায় চাপাবে।

বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘অনেক কারখানার বোনাস ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। আমরা সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ১০ তারিখের মধ্যে আশা করছি প্রায় সব কারখানার বোনাস হয়ে যাবে। তবে কিছু কারখানা হয়তো বোনাস দিতে পারবে না। এটা কিন্তু প্রতি বছরই এমন হয়। তবে সংখ্যায় এটা খুবই সামান্য। যাদের সক্ষমতা নাই তাদের বলে দিয়েছি, শ্রমিকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে। এছাড়া দুই সংগঠনই ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছে যাতে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও সংকটে থাকা মালিকদের ঋণ দেয়। আশা করছি ঈদের আগে অন্তত সব কারখানায় বেতনটা দেওয়া সম্ভব হবে।’

এদিকে ইতিমধ্যে বেশকিছু কারখানা শ্রমিকের বোনাস পরিশোধ করেছে। ওইসব কারখানার মালিকরা বলছেন, শ্রমিকরা গ্রামে যাবে না এমন শর্তের ভিত্তিতেই আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। এ নিয়ে যাতে অন্য কারখানায় অসন্তোষ সৃষ্টি না হয় সেজন্য বেতন পাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতেও বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে এক গ্রিন (পরিবেশবান্ধব) কারখানার মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বোনাস দিয়েছি গত ২৯ এপ্রিল। এত আগে বোনাস দেওয়ার মূল কারণ হলো, শ্রমিকরা যাতে মার্কেটে ভিড় শুরুর আগেই কেনাকাটা করতে পারে। আমার মতো অনেকেই আগে বেতন ও বোনাস দিয়েছে। তবে অন্য কারখানার কথা ভেবে গোপন রাখতে হচ্ছে।’ যাদের সক্ষমতা আছে শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধের অনুরোধ জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত