তিন সপ্তাহের অধিক ২২ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীজুড়ে গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়। ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ কিংবা ‘সর্বাত্মক লকডাউনে’ রাজধানীতে থেমে থেমে যানজট বা গাড়ির জটলা তৈরি হলেও গণপরিবহন খোলার প্রথম দিনেই নগরী যেন ফিরে পায় তার চেনা রূপ। রাজধানীর বেশিরভাগ প্রধান সড়কে মিনিটের পর মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। নগরীর বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি, ঝিগাতলা, মোহাম্মদপুর, বসিলা, মৌচাক-মগবাজার, কাকরাইল, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, নয়াবাজার, পল্টন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি বিপণিবিতানগুলোর সামনের সড়কে যানজটের মাত্রা ছিল আরও বেশি। সকালের আলো ফুটতেই নগরীতে ঘুরতে শুরু করে বাসের চাকা। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বাস চালু করতে পেরে খুশি পরিবহন শ্রমিকরা। তারা বলছেন, ‘বাস চলতেছে দেইখা কয়ডা টাকা কামাই হইব। দুইডা ডাল-ভাত খাইয়া বাঁচতে পারমু। সবই চলছে, খালি বাস বন্ধ কইরা রাখছিল সরকার। তবে এমনে চললে পরিবার লইয়া কোনোমতে ঈদ করতে পারমু।’
গণপরিবহন চলাচল সামনে রেখে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তঃজেলা গণপরিবহন বন্ধ থাকবে; কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটে উল্লিখিত মোট আসন সংখ্যার অর্ধেকের (৫০ শতাংশ) বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না; কোনোভাবেই সমন্বয়কৃত ভাড়ার (বিদ্যমান ভাড়ার ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি) অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না; ট্রিপের শুরু ও শেষে জীবাণুনাশক দিয়ে গাড়ি জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট মোটরযান চালক, অন্যান্য শ্রমিক-কর্মচারী ও যাত্রীদের বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে পরিবহনের মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে সরেজমিনে রাজধানী ঘুরে দেখা যায়, এসব শর্ত বেশিরভাগ পরিবহনেই মানা হয়নি। অর্ধেক আসন খালি রাখার যে বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও ছিল অনুপস্থিত। কখনো কখনো মানা হলেও আবার হয়ে গেছে উধাও। তবে লোকাল বাসগুলো এ নিয়ম বেশি ভেঙেছে বলে দেখা যায়।
বাসের চালক, কন্ডাক্টর, হেলপার তো বটেই যাত্রীদের অনেককেই মাস্ক পরতে দেখা যায়নি। অনেকেই মাস্ক পরলেও তা ছিল থুতনির নিচে। বেশিরভাগ পরিবহনেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। তবে বেশ কয়েকটি বাসে দেখা যায়, পরিবহন শ্রমিকরা নিজেরাই স্যাভলন পানি গুলিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়েছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি সার্ভিসে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব নয়। তবে দূরপাল্লার গাড়িতে এগুলো মানা সম্ভব।
মানুষ ভেঙে ভেঙে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে করোনা সংক্রমণ বাড়বে। কয়েকটি গাড়ি পরিবর্তন করে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। দূরপাল্লার গণপরিবহন চালু হলে এখনকার চেয়ে করোনা সংক্রমণ কমবে বলে মনে করেন বাস মালিক নেতা।
তবে দূরপাল্লার পরিবহন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকলেও প্রতিদিনই গোপনে দেশজুড়ে বাস চলাচল করছে। অনেক বাসে ‘জরুরি ধান কাটার শ্রমিক’ স্টিকার লাগিয়ে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি শুধু কাগজে আছে। রাস্তায় নাই। গাড়িতে নাই। এসি রুমে বসে প্রজ্ঞাপন জারি করলেই তো স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়। পরিবহন শ্রমিক এবং বাস মালিকদের এ নিয়ে কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নাই।’
তিনি বলেন, ‘যদি জীবন-জীবিকার জন্য গাড়ি খুলতেই হয় তাহলে সেনাবাহিনীকে এই দায়িত্ব দিয়ে তারপর বাস চালু করা উচিত ছিল। কারণ আমাদের প্রতিবেশী দেশের থেকে তো শিক্ষা নিতে হবে।’
ঘাটারচর এলাকায় রজনীগন্ধা পরিবহনের চালক বাবু বলেন, ‘যদি এ রকম চলে আল্লাহর রহমতে আমদের পরিস্থিতি ভালো হবে। আমরা তো কোনো সাহায্য পাই নাই। কেউ আমাগো দেখে নাই। এ রকম চললে দুইডা ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারমু। সরকার, মালিক সমিতি কেউ আমাদের দেখে নাই।’
যাত্রাবাড়ী থেকে ট্রান্সসিলভা পরিবহনে নিয়মিত যাতায়াত করা যাত্রী রাকিবুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেখি নাই। তবে এক সিট ফাঁকা রেখেই সবাই বসছে। তবে যাত্রীর চাপ থাকলে তা কেউ মানছে না।’
পরিস্থান পরিবহনের চালক আকরাম হোসেন বলেন, ‘সব গাড়ি তো এক দিনে ভালো চলে না। আজকে যাত্রীর চাপ পাই নাই। যাত্রী কম উঠছে। ‘ভাই, লেইখা কী করবেন? পারলে এইটা লিখেন যে আমরা কোনো সাহায্য পাই নাই। সব সচিব, মালিক গো লাগে। হেগো পেটই ভরে না। আমগো দেখব কখন। সরকার যদি মালিক গো কইত যে শ্রমিকদের সাহায্য করতে হইব। তাইলে আমরা কিছু টাকা পাইতাম।’
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে ২০২০ সালের ২১ মার্চ থেকে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় সরকার। দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর গেল বছরের ১ জুন থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার। তখন ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলার পর করোনা সংক্রমণ কমলে গত সেপ্টেম্বর মাসে শতভাগ আসনে যাত্রী নিয়ে চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার। তখন থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ আসনেই যাত্রী নিয়ে চলছিল গণপরিবহন। পরে গত ৩১ মার্চ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়তি ভাড়ায় অর্ধেক যাত্রী নিয়ে শুরু হয় গণপরিবহনের চলাচল। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে ৫ ও ৬ এপ্রিল বন্ধ থাকে গণপরিবহন চলাচল। অফিস খোলা রেখে গণপরিবহন বন্ধ রাখার তীব্র সমালোচনার মুখে ৭ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবার গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়। তবে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে কঠোর বিধিনিষেধের দ্বিতীয় ধাপে ১৪ এপ্রিল থেকে দেশে জরুরি কাজ ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যা ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ নামে পরিচিতি পায়। এই বিধিনিষেধের মধ্যে জরুরি সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিস ও গণপরিবহন আগের মতোই বন্ধ ছিল। তবে উৎপাদনমুখী শিল্প কারখানা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চালাতে পারবে। সম্প্রতি দোকানপাট, শপিং মল ও বাণিজ্যিক ফ্লাইট এবং গণপরিহন চালু করা হলেও নৌ ও রেলপথে যাত্রী পরিবহন এখনো বন্ধ রয়েছে।
