বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ জনশক্তি এই সেক্টরে নিয়োজিত এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ তাদের জীবিকার জন্য সার্বিকভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি যে অন্নদাত্রী মায়ের মতো, করোনাকালে সেটা আরও বেশি বোঝা যাচ্ছে; অন্যসব সেক্টর স্থবির হয়ে গেলেও কৃষিই এ সময় আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। দেশে খাদ্যশস্য, শাকসবজি, মৎস্য, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু উৎপাদনে অনন্য সাফল্য, অর্থাৎ কৃষির এই অবদান আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কৃষির আবার প্রধান আধার হলো চাষযোগ্য ভূমি, বনভূমি ও জলাভূমি। কিন্তু অকৃষিকাজে ব্যবহারের ফলে আজ কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে ক্রমবর্ধিত হারে; রাস্তার দুই ধারে চোখ মেললেই তা দৃশ্যমান হয়। এ বিষয়ে সরকারি হালনাগাদ তথ্য খুঁজে পেলাম না; তবে গত বছর আগস্টে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে শহিদুজ্জামান খানের প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দেখলাম ১৯৭৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া কৃষিজমির পরিমাণ ৬৯ হাজার হেক্টর। পক্ষান্তরে ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এই জমির পরিমাণ ৩০ হাজার হেক্টর। এই ধারা অব্যাহত থাকলে কৃষির পক্ষে টেকসই অন্নদাত্রীর ভূমিকা কতটুকু পালন করা সম্ভব হবে, তা ভেবে দেখার সময় এসে গেছে।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ; এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনঘনত্ব ১১২৭। পৃথিবীতে ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার নিচের আয়তনের ম্যাকাউ, হংকং, বাহরাইন, সিঙ্গাপুরের মতো পাঁচ-ছয়টি নগর রাষ্ট্র ছাড়া এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ আর দ্বিতীয়টি নেই। এখন আমাদের মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ০.০৪৮ হেক্টর, অর্থাৎ ১২ শতক। জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ১.০১ শতাংশ; বছরে ১৭ থেকে ১৮ লাখ মানুষ নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের মধ্যম বৈকল্পিক প্রাক্কলন অনুসারে ২০৫০ জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২০.১৯ কোটি এবং উচ্চ বৈকল্পিক প্রাক্কলন অনুসারে ২৩.৫৬ কোটি। ওই সময় মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৬ শতকের নিচে নেমে আসবে। এখন চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বছরে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন গম দেশে আমদানি করতে হয়।
বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য বসতি গড়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ, নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ প্রভৃতি কাজে প্রধানত কৃষিজমি বেহাত হচ্ছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ভূমি হারানোর প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে। এক হিসাবে বলা হয় যে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রাক্কলন অনুযায়ী ৫০ মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশ তার ১১ শতাংশ ভূমি হারিয়ে ফেলবে। কাজেই এখন থেকে পরিকল্পনামাফিক ভূমির ব্যবহার, ভূমি উদ্ধার ও তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব জোরালোভাবে মোকাবিলা করা না গেলে আমাদের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের একক কারণ আমরা নই; এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুলাংশে দায়ী। তা ছাড়া এর প্রকৃতি এমন যে, এটাকে মোকাবিলা করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পরিমণ্ডলের সহযোগিতা অপরিহার্য। কিন্তু এখন যেসব কারণে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে, সেগুলো আমাদের সৃষ্ট হওয়ায় আমাদের জ্ঞান, দক্ষতা, দায়বদ্ধতা ও সংযমের মাধ্যমে তার প্রতিকার ও প্রতিবিধান করতে হবে।
ওয়েবে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে দেখলাম যে, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি নামে একটি জিনিস আমাদের আছে, কিন্তু সেটা মান্ধাতার আমলের; ২০০১ সালে প্রণীত। দুর্ভাগ্য এই যে, গত ২০ বছর পৃথিবীর কথা বাদই দিলাম, বাংলাদেশেই অনেক রূপান্তর ঘটেছে, অথচ এ সময়ে এক কথার মানুষের মতো আমরা ওই এক নীতিতে অটল রয়েছি। তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় এই নীতিতে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর প্রস্তাবনা রয়েছে, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের কোনো কৌশল ও দিকনির্দেশনা নেই। শেষের দিকে শুধু বলা হয়েছে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে এই নীতি অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
কিন্তু কীভাবে করা হবে, কারা কখন করবেন, না করলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এর জন্য নতুন কী সব আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রবর্তন করতে হবে, কারা এসব পরিবীক্ষণ করবেন, সেসবের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। শুধু ভূমি মালিকানার প্রত্যয়নপত্র জারির মাধ্যমে সর্বত্র গ্রহণযোগ্য ভূস্বামী স্বত্ব নিশ্চিত করার জন্য একটি স্কিমের কথা বলা হয়েছে, যেটা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম যে, সহসাই নাকি সেটা চালু হতে যাচ্ছে। একেবারে না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াও তো ভালো; লাল ফিতায় বাঁধা নথির এই দেশে ২০ বছর অপচয় তো সামান্য ক্ষতি!
এই নীতিমালায় যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষিজমি অকৃষিকাজে বেদখল হওয়া থেকে যতটা সম্ভব রক্ষা করা, আবাসনের জন্য পরিবারভিত্তিক জমির সিলিং নির্ধারণ করা, গ্রামাঞ্চলে মডেল হাউজ ও বহুতল ভবন নির্মাণ উৎসাহিত করা, বনভূমির সুরক্ষা এবং নতুন বনভূমি সৃজন ও সংরক্ষণ করা, জলাভূমি নিরুপদ্রব রাখা, ভূমির প্রকৃতি ও গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে ফসল উৎপাদন বিন্যাস করা, অপ্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ থেকে মুক্ত রাখা, অব্যবহৃত অধিগৃহীত ভূমি পুনরুদ্ধার করা, নানা শ্রেণির ভূমির হালনাগাদ উপাত্ত সংরক্ষণ করা প্রভৃতি।
আমাদের দেশে কোনো অফিস ভবন বা কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য প্রথমে সীমানা প্রাচীর গড়ে তোলা হয়। তারপর তার ভেতর ছোটখাটো একটি দালান ওঠানো হয়। আর সাহেবি কায়দায় ভেতরে রাখা হয় পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা। অনেক জেলা ও বিভাগীয় শহরে অনেক অফিস ও কর্মকর্তার বাস ভবনের চৌহদ্দি চল্লিশ-পঞ্চাশ একর বলে তারা গর্ববোধ করেন। এগুলো এখন বন্ধ করতে হবে।
গ্রাম ও শহরে আবাসিক ভবনের জন্য ভূমির সিলিঙের কথা বলা হয়েছে। এটা শুধু আক্ষরিক অর্থে নিলে চলবে না; প্রকৃত অর্থে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই দুষ্প্রাপ্য সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্লটের সাইজ যতটা সম্ভব ছোট করে ফেলতে হবে এবং ইমারতের অনুভূমিক উন্নয়নের স্থলে উল্লম্ব উন্নয়নকে প্রধান অবলম্বন করতে হবে। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো আবাসিক এলাকাগুলোতে উচ্চবিত্তদের জন্য যে তিন-চার হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। তিন-চারজন মানুষের বসবাসের জন্য কত বড় বাড়ি বা ফ্ল্যাট দরকার হয়? এদের ভোগ-লিপ্সা লক্ষ করেই সম্ভবত লিও টলস্টয় তার বিখ্যাত প্রতীকী গল্প ঐড়ি গঁপয খধহফ উড়বং ধ গধহ জবয়ঁরৎব রচনা করেছিলেন। আধুনিক নগর রাষ্ট্রগুলোর অনুসরণে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করে নাগরিকদের আবাসন ও কৃষিজমির কুঁচন সমস্যার সমাধান করতে হবে। স্মরণ করা দরকার যে, জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার পর এখনো প্রতি বছর যে অতিরিক্ত জনসংখ্যা যুক্ত হচ্ছে, তাতে প্রতি আড়াই বছরে আমরা দেশে একেকটা সিঙ্গাপুর রাষ্ট্র তৈরি করে চলেছি। জনসংখ্যার দিক দিয়ে যদি এত দ্রুত সিঙ্গাপুর তৈরি করতে পারি, তবে নাগরিকদের বাসস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমি-স্বল্পতার দেশে অবকাঠামো উন্নয়নে সিঙ্গাপুরীয় মডেল কেন অনুসরণ করতে পারি না? সেখানকার ৮০ শতাংশ নাগরিক এইচডিবি (ঐড়ঁংরহম ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইড়ধৎফ) নির্মিত আকাশচুম্বী ভবনের ফ্ল্যাটে বাস করে যার গড় আয়তন ৯৫ বর্গ মিটার। পৃথিবীতে সর্বোচ্চ গণ-আবাসিক ভবন সিঙ্গাপুরেই নির্মিত হয়েছে। ভাড়ার স্থলে লিজের মাধ্যমে ফ্ল্যাটের মালিকানা হস্তান্তর করাতে এই প্রকল্পের অসাধারণ সাফল্য আসে; এই ভবনগুলোতে নাগরিকদের মালিকানার হার ৯১ শতাংশ।
ভূমির জোনিং করে চাষযোগ্য ও বসতি গড়নযোগ্য ভূমি আলাদা করে ফেলতে হবে। গ্রামাঞ্চলে শুধু বসতভিটা হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় বাড়ি নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানেও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বহুতল ভবন ও মডেল টাউন গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। এটা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার শহরের সুবিধা পল্লী অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। এভাবে গুণাগুণ ও প্রকৃতি অনুযায়ী যে ভূমি যেকাজের উপযোগী, তার সেই কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে ভূমি থেকে সর্বোত্তম সুবিধা আহরণ করা সম্ভব হবে, ভূমির অপচয় হ্রাস পাবে এবং ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার তিরোহিত হবে।
বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের একটি বদ্বীপ; উজানের একাধিক দেশ থেকে পানিতে ভেসে আসা পলিমাটি দিয়ে এর অনেক অবয়ব গঠিত। দেশের ভেতর দিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক নদ-নদী প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। অনেক গবেষক দাবি করেন যে, এই সাগরে বছরে গড়পড়তা ২,০০০ মিলিয়ন টন পলিমাটি উজান থেকে পানির সঙ্গে পতিত হয়। এই পলি সাগর থেকে ভূমি উদ্ধার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপ বৈজ্ঞানিক কৌশল প্রয়োগ করে এই পলি মাটির সাহায্যে সাগর থেকে অনেক ভূমি উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে।
পরিশ্রমকে যেমন উন্নতির প্রসূতি মনে করা হয়, তেমনি জমিকে মনে করা হয় সব সম্পদের জনক হিসেবে। প্রকৃতির অনন্য অবদান এই জমির পরিমাণ সীমাবদ্ধ। জমি আমাদের মুখের গ্রাস জোগায়, ভিটেমাটির জোগানদাতা, কল-কারখানার আধার এবং আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার নির্ণায়ক। ভূমির সঙ্গে এ দেশের মানুষের নাড়ির টান রয়েছে; এক হাজার টাকার জমির জন্য মামলা করে পাঁচ হাজার ব্যয় করা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে। এজন্য ভূমির সংস্কারধর্মী নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত গবেষণার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে জনমত গঠনের এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
[email protected]
