‘রাষ্ট্রীয় গোপন নথি’ সরিয়েছিলেন রোজিনা : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আপডেট : ১৯ মে ২০২১, ০৩:৪২ এএম

সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও পরে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার মধ্যে মুখ খুলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি দাবি করেছেন, সচিবালয়ে রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন করা হয়নি। এমনকি প্রথম আলোর ওই জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক টিকা আমদানি সংক্রান্ত এমন কিছু নথি সরিয়েছিলেন যেগুলো প্রকাশ হলে দেশের ক্ষতি হতে পারত। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন জাহিদ মালেক। 

এদিন রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সচিবালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) তা বর্জন করে।

জাহিদ মালেক বলেন, ‘সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে যেটুকু তিনি শুনেছেন, তাতে স্বাস্থ্য সচিবের পিএসের অনুপস্থিতিতে সোমবার দুপুরে তার কক্ষে ঢুকেছিলেন রোজিনা। ওখানে যে ডিউটিতে ছিল, সে দেখল যে একজন ব্যক্তি ওখানে ফাইলের ছবি তুলছে, ফাইল কিছু বের করে ব্যাগে ঢুকাচ্ছে, শরীরেও ঢুকাচ্ছে। তখন সে চিল্লাচিল্লি করেছে, আমাদের মহিলা অফিসাররা এসেছেন, এসে তারা ধরেছেন যে আপনি কেন এসব করছেন? তখন তার কাছ থেকে ওই কাগজ আর ফাইলগুলো নিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশে খবর দিয়েছে, পুলিশ কর্মকর্তারা আসেন এবং তারা এটা টেকওভার করেছেন। প্লাস মোবাইলটাও নিয়েছেন, মোবাইলেও অনেক ছবি পেয়েছেন।’

গত সোমবার দুপুরের পর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম ভূঞার কক্ষে রোজিনা ইসলামকে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন উপসচিব তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেখানে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারায় চুরি এবং ১৯২৩ সালের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের’ ৩ ও ৫ ধারায় গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রীয় গোপন নথি নিজের দখলে রাখার অভিযোগ আনা হয় এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।

এজাহারে বলা হয়েছে, রোজিনা যেসব নথির ছবি তুলেছেন তার মধ্যে ‘টিকা আমদানি’ সংক্রান্ত কাগজপত্রও ছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই জিনিসটাও দুঃখজনক। কেননা এই ফাইলগুলো ছিল টিকা সংক্রান্ত। আমরা যে রাশিয়ার সঙ্গে টিকার চুক্তি করছি, চায়নার সঙ্গে টিকার চুক্তি করছি। সেগুলো নন-ডিসক্লোজার আইটেম। আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বলেছি, আমরা এটা গোপনে রাখব, এগুলো বলব না। তো সেইগুলো যদি বাইরে চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলাম, এবং আমরা টিকা নাও পেতে পারি। এতে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য বিরাট ক্ষতি হতে পারে। এগুলো সিক্রেট ডকুমেন্ট, বাইরে যাওয়া ঠিক হয়নি।’

রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে আটকে রেখে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বামী মনিরুল ইসলাম মিঠু। ওই অভিযোগ অস্বীকার করে জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেটা শুনলাম, তাকে অনেকক্ষণ আটকিয়ে  রেখেছে। এটা পুলিশ ছিলৃ সে নিজেই শুয়ে পড়েছে, বসে পড়েছে। তাকে নিতে পারছিল না। শারীরিকভাবে কোনো নির্যাতন বা আঘাত করা হয়নি। এটা সঠিক নয়।’

রোজিনা ইসলাম ওই অফিস থেকে কোনো নথি সরানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর তার সহকর্মীরা বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করায় এখন ‘অন্যায়ের’ শিকার হচ্ছেন এই সাংবাদিক। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতির রিপোর্টিংয়ের জন্য তো আজকের ঘটনা না। ওটা ওখানের ঘটনা, এর ওপরই পরবর্তী ঘটনা ঘটেছে।’ তিনি বলেন, সিনিয়র অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি ও ডেপুটি সেক্রেটারি লেভেলের দুজন ছিলেন, প্রাথমিকভাবে তারাই ডিল করেছেন। পরে যখন রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার বিষয় এসেছে, তখন তারা পুলিশ ডাকা হয়েছে।

বর্তমান সরকার যেখানে দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের পুরস্কৃত করার নিয়ম করেছে, সেখানে রোজিনার বিরুদ্ধে কেন ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস’ আইনে মামলা দেওয়া হলো সেই প্রশ্ন রেখেছিলেন একজন সাংবাদিক। উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো আইনজ্ঞ না। আইনের বিষয়ে কিছু বলব না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত