রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের সন্তানের সামনে বাবা সাহিন উদ্দিনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সাংসদ এমএ আউয়ালকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত বুধবার রাতে ভৈরবের একটি মাজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাছাড়া একই ঘটনায় হত্যাকারী দলের আরও চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আউয়াল গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান ও তরীকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিবও। র্যাব বলছে, আউয়ালের নির্দেশে ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবে স্থানীয় সন্ত্রাসী সুমনের বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে সাহিন উদ্দিনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। মিশন শেষ হওয়ার পর কিলার সুমন আউয়ালকে ফোন করে জানায়, ‘স্যার ফিনিশ’। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার আল মঈন এসব তথ্য জানান।
কমান্ডার আল মঈন জানান, ঘটনার পর আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সুমনসহ বাকিরা গা-ঢাকা দেয় দেশের বিভিন্ন জায়গায়। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীসহ তিনজনকে ভৈরব, চাঁদপুর ও পটুয়াখালী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আউয়ালের পাশাপাশি মো. হাসান ও জহিরুল ইসলাম বাবু হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন। গত ১৬ মে রাজধানীর পল্লবীতে নিজ সন্তানের সামনে সাহিন উদ্দিনকে সন্ত্রাসীরা চাপাতি, রামদাসহ বিভিন্ন ধারালো দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মামলা হওয়ার পর থেকেই র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। পরে র্যাবের অভিযানে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি দুই আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিনি আরও জানান, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। ঘটনার চার থেকে পাঁচ দিন আগে আউয়ালের কলাবাগান অফিসে আসামি তাহের (এজাহারে ২ নম্বর আসামি) এবং সুমন (এজাহারের ৩ নম্বর আসামি) হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য সুমনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সুমনের নেতৃত্বে ১০-১২ জন সক্রিয়ভাবে কিলিং মিশনে অংশ নেয়। ১৫ মে সুমন, বাবুসহ কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন পরামর্শ করে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা সুমনের নেতৃত্বে ১৬ মে বিকেলে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। তারপর সাহিন উদ্দিন সন্তানসহ ঘটনাস্থলে আসেন। প্রথমে সুমন, মনির, মানিক, হাসান, ইকবাল ও মুরাদসহ ১০-১২ জন ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করতে থাকে। শেষপর্যায়ে শরীরের ওপরের অংশে মনির এবং হাঁটু ও হাত-পায়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে মানিক। ওই সময়ে বাবুসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নজরদারি করে। হত্যাকাণ্ডটি পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে শেষ করে তারা। ঘটনা শেষে সুমন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আউয়ালকে মোবাইলে ফোন করে জানায়, ‘স্যার ফিনিশ’। তাদের আরও অল্প কিছুক্ষণ কথা হয়। এরপর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা দেশের বিভিন্ন স্থানে গা-ঢাকা দেয়।
আউয়াল সাহিন উদ্দিনকে কেন হত্যা করিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হত্যাকারী সুমন আউয়ালের বিভিন্ন ব্যবসা, জমি দখল ও কাজের সঙ্গে জড়িত। আউয়ালের সঙ্গে সাহিন উদ্দিনের জমি নিয়ে যখন বনিবনা হচ্ছিল না, তখন সুমনদের একটি ক্ষোভ ছিল তাকে মেরে ফেলার জন্য। সাহিনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, এ হত্যাকাণ্ডে ৩০ লাখ টাকা চুক্তি হয়েছিল। কমান্ডার আল মঈন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আউয়াল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। সাহিন উদ্দিনকে সাতটি কোপ মেরেছে হাসান। এলাকায় সুমনের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সে (হাসান)। আউয়াল যে প্রকল্পটি করেছেন সেখানে সাহিনের পরিবারের সঙ্গে আউয়ালের ২০০৪ সাল থেকে জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। আউয়ালের আলীনগর প্রকল্পে সাহিনের বেশকিছু জমি রয়েছে। তিনি আউয়ালকে তার জমি দিতে রাজি হননি। এই জমি দেওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘদিন বনিবনা হচ্ছিল না। তিনি আরও বলেন, আউয়াল একজন আবাসন ও জমি ব্যবসায়ী। তার ছত্রছায়ায় সুমন সন্ত্রাসী গ্রুপ দিয়ে জমি দখল ও আধিপত্য বিস্তার করত। আউয়ালের কাছ থেকে তারা মাসভিত্তিক ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা মাসোহারা পেত এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাজ অনুযায়ী অতিরিক্ত টাকা পেত। সন্ত্রাসী সুমন এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রিকশা টোকেন বাণিজ্য, মাদক, জুয়াসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাত।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের জানান, সন্ত্রাসীরা সাহিন উদ্দিনকে কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় ২০-২৫ বার কুপিয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। এ সময় পাশের কেউ একজন হত্যাকান্ডের দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেন। যা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। এ সময় শিশু সন্তানের চিৎকারে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া সুমন সাহিনের মাথা এবং গলায় এমন ভাবে কোপাতে থাকে যা দেখে আশপাশের অনেক নারী ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাদের অনেকেই ভয়ে রাতে ঘুমোতে পারছেন না। শিশু মাশরাফি বারবারই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
সাহিন হত্যাকান্ডে নিহতের মা আকলিমা বেগম বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় আউয়ালসহ ২০ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। আকলিমা বেগমের অভিযোগ, পল্লবীর সেকশন-১২ বুড়িরটেকে আলীনগর আবাসিক এলাকার হ্যাভেলি প্রপার্টিজ ডেভেলপার লিমিটেডের এমডি এমএ আউয়ালের সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল তাদের। আউয়াল তাদের জমি অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা করলে সাহিন বাধা হয়ে দাঁড়ান। যে জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। মামলায় অন্য আসামিরা হলো সুমন, মো. আবু তাহের, মুরাদ, মানিক, মনির, শফিক, টিটু, কামরুল, কিবরিয়া, দিপু, আবদুর রাজ্জাক, মরন আলী, লিটন, আবুল, বাইট্যা বাবু, বড় শফিক, কালু ওরফে কালা বাবু, নাটা সুমন ও ইয়াবা বাবু। আসামিরা সবাই পল্লবী থানা এলাকার বাসিন্দা। ১৯ মে রাতে রাজধানীর পল্লবী ও রায়েরবাগ এলাকা থেকে মো. সুমন বেপারী (৩৩) ও মো. রকি তালুকদারকে (২৫) গ্রেপ্তার করে ডিবি।
