বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে মুমূর্ষু হৃদরোগীদের চিকিৎসার ভরসাস্থল করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) সংকট চরম আকার নিয়েছে। বিভাগের সব শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়ায় হাতপাখার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। তীব্র গরমে ত্রাহি দশা রোগী ও স্বজনদের। বিভাগের এনজিওগ্রাম মেশিনটিও দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বিকল। ফলে রোগীদের হৃদযন্ত্রে রিং পরানো ও পেসমেকার বসানোসহ জরুরি অনেক সেবাই বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে হৃদরোগ বিভাগে চিকিৎসক ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল সংকটও তীব্র। এ ছাড়া বিভাগের ওয়ার্ড ও শৌচাগারের টয়লেটগুলোও নোংরা হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী। হাসপাতালের পরিচালকও হৃদরোগ বিভাগের দুরবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। আর প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সিসিইউর শীতাতপ যন্ত্র সচল করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ সালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলের মূল ভবনের পূর্ব পাশে ‘আই’ ও ‘এফ’ ব্লক ঘেঁষে মুমূর্ষু রোগীর উন্নত চিকিৎসার জন্য করোনারি কেয়ার ইউনিট বা সিসিইউ ভবন নির্মাণ করা হয়। যেখানে মোট ১২টি শয্যা রয়েছে। একজন রেজিস্ট্রার এবং তিনজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে সিসিইউ ইউনিটের রোগীদের। এখানে পর্যাপ্ত নার্স থাকলেও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন মাত্র একজন। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হৃদরোগ বিভাগের ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৪৮ জন রোগী। শয্যা ছাড়িয়ে ওয়ার্ডের মেঝেতেও স্থান হয়েছে রোগীদের। সরেজমিনে দেখা গেছে, সিসিইউ ইউনিটে সবসময় পিনপতন নীরবতা থাকার কথা থাকলেও রোগীর ভিড়ে সরগরম। ৮টি শীতাতপ যন্ত্রের সবগুলো বিকল থাকায় অসহ্য গরমে ঘেমে একাকার রোগী ও স্বজনরা। ওয়ার্ডের বৈদ্যুতিক পাখাগুলোও তেমন ঘুরছে না। এ কারণে কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাড়ি থেকে টেবিল ফ্যান এনে, আবার কেউ হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে গরমের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। ওয়ার্ডের সর্বত্র নোংরা। বাথরুমের টয়লেটগুলোও দুর্গন্ধময়, নোরা ও ব্যবহার অনুপযোগী। একমাত্র এনজিওগ্রাম মেশিনটিও দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বিকল। এ কারণে হৃদযন্ত্রে রিং পরানো ও পেসমেকার বসানোসহ সব সেবা বন্ধ রয়েছে।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সিসিইউর চিকিৎসক-নার্সরা সহনশীল নন। চিকিৎসক-নার্সদের কাছে কিছু বলতে বা জানতে চাইলে তারা দুর্ব্যবহার করেন। কর্র্তৃপক্ষের অসহযোগিতা ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ রোগীরা। তারা এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
চিকিৎসা সেবার অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সিসিইউতে ভর্তি এক রোগীর স্বজন হাবিবুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত পরশু রাতে হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে আমার রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু এখানের সব এসি নষ্ট, পাখাও চলে না। গরমে ঘামে ত্রাহি অবস্থা। তাই কখনো হাতপাখা আবার বাড়ি থেকে আনা টেবিল ফ্যান দিয়ে চলতে হচ্ছে।’ শুধু হাবিবুরই নন, হাসপাতালের নোংরা পরিবেশসহ দুরবস্থার অভিযোগ করেছেন আরও অনেক রোগীর স্বজন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ডা. মো. জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর আগে দুই-একটি এসি চালু ছিল। বর্তমানে সবকটি এসি নষ্ট। গরমে রোগী এবং ডাক্তার ও নার্সরা সমস্যার মধ্যে সেবা দিচ্ছেন। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হলেও স্থায়ী সমাধানে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হৃদরোগীদের সিসিইউ বিভাগে ডাক্তার ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল সংকট এবং শীতাতপ মেশিন বিকলসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় সমাধান চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’
আর শেবাচিম হাসপাতাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের মেডিকেল উপ-বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সিসিইউ বিভাগের শীতাতপ মেশিনগুলো বহু পুরনো হওয়ায় সেগুলো কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এর আগে একবার মেরামত করা হলেও বেশিদিন ব্যবহার করা যায়নি। সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে শীতাতপ মেশিন সচল করাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করা হবে।’
