মহামারীর এক বছরে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে, সেই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আসন্ন বাজেটে প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছে সানেম। গতকাল গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং সানেম-এর বাজেট পূর্ববর্তী ওয়েবিনারে এমন পরামর্শ দেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান।
‘বাজেট ২০২১-২২: বাস্তবতা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনায় সভায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে এবারের বাজেটের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বক্তারা জানিয়েছেন, প্রতি বছর সম্পদ কর নিয়ে আলোচনা হয়, কর জালের আওতা বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ডিজিটালাইজেশন বা অন্যান্য সংস্কার বাস্তবে হচ্ছে না। ফলে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ছে না। বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে, বিশ্বে যাদের কর-জিডিপির অনুপাত কম, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এডিপি বাস্তবায়নে আরও তৎপর ও কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, আমার প্রত্যাশা থাকবে অর্থমন্ত্রী যখন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতা দেবেন, সেখানে যেন বর্তমান বাস্তবতাকে সঠিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। বর্তমানে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিভিন্নভাবে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি, এজন্য বাজেটে কভিড ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। কভিডের কারণে স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, দারিদ্র্য, জেন্ডার বৈষম্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, আগামী বাজেটে তা স্বীকার করা হবে, আমরা এমনটা প্রত্যাশা করি।
আমাদের আরেকটি প্রত্যাশাও ছিল করোনাকালীন সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সঠিক তথ্যউপাত্ত সরবরাহ করবে। কারণ যদি সঠিক তথ্যউপাত্ত না থাকে তাহলে এরকম একটি সংকটকালীন সঠিক নীতিনির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে যাদের এই তথ্যউপাত্তগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরার কথা, তারা তা করেননি বলে হতাশা প্রকাশ করেন সেলিম রায়হান। করোনাকালীন সানেমসহ দেশের অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করলেও যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের জরিপ পরিচালনার জন্য দায়বদ্ধ তারা কেন করছে না, তা একটি বড় প্রশ্ন।
সেলিম রায়হান জানান, সানেমের ত্রৈমাসিক ব্যবসায় আস্থা জরিপে দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো কভিডের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। আমরা আশা করব এই বাস্তবতা বাজেট ঘোষণায় প্রতিফলিত হবে।
কর, ব্যাংক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাতে আটকে থাকা সংস্কার শুরুর প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সংকট আমরা একেবারে সরাসরি দেখতে পাচ্ছি, বাজেট বাড়ানোর পরেও সেটি খরচ করা যায় না। স্বাস্থ্য খাতের সামর্থ্য বাড়ে না, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি দূর হয় না। স্বাস্থ্য খাতসহ অন্যান্য খাতে যতটুকুই সম্ভব সংস্কারের একটি রূপরেখা বাজেট ঘোষণায় রাখার দাবি জানান সেলিম রায়হান।
সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির যখন প্রবৃদ্ধি হয়, মাথাপিছু আয় যখন বাড়ে তখন আমরাও খুশি হই; কিন্তু আমরা যাতে প্রবৃদ্ধিতে ‘আসক্ত’ না হয়ে যাই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে প্রবৃদ্ধি কোনো জাদুর কাঠি নয়, প্রবৃদ্ধির ধূম্রজালে আমরা যেন আসল বিষয়গুলো ভুলে না যাই। গত পাঁচ দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে আমাদের যে সাফল্য, করোনার ধাক্কায় তা কিন্তু এখন টলটলায়মান। করোনার সময়ে আমাদের ‘জবলেস গ্রোথ’-এর বিষয়টি আরও তীব্র হয়েছে। ডিজিটাল ডিভাইসের মতো নতুন বৈষম্য আমাদের সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোকে যদি আমরা সামনে না আনি, আমরা যদি শুধু একমাত্র প্রবৃদ্ধির রঙিন চশমা দিয়ে সবকিছু দেখি তাহলে কিন্তু আমরা প্রবৃদ্ধির ধূম্রজালে হারিয়ে যাব।
ওয়েবিনারের মূল উপস্থাপনায় সানেমের গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, মহামারীর ধাক্কা সামাল দেওয়া ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও কৃষি খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে এনে এবারের বাজেটকে সাজাতে হবে। আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, বাজেটের আয়ের উৎস, কর-জিডিপি হার খুব কম, যদিও রাতারাতি এর ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব নয়, তারপরেও যতটুকু সম্ভব কর আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই খাতের জন্য ডিজিটাল ডাটাবেজ দরকার। নতুন দরিদ্রদেরও এর আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা যে প্রযুক্তিগত বিভাজনের শিকার হয়েছে, সেদিক বিবেচনা করে এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
