করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা নাকাল। চাকরি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ও কমে গেছে ব্যাপকভাবে। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থার মধ্যে আগামী ৩ জুন জাতীয় সংসদে আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেটে করের জাল নতুন করে বিস্তৃত করা অনুচিত হবে। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের গতি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা কমাতে হবে। এর মধ্যে করপোরেট করহার কমানো, স্থানীয় শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও শুল্কে ছাড় দিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ থাকতে হবে। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন বাজেটে করের বোঝা কমানো হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে বাণিজ্য সম্প্রসারণে পদক্ষেপ থাকবে। এর মধ্যে এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে টার্নওভারের বিপরীতে কর অব্যাহতির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। আইটি খাতের সম্প্রসারণে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও কর অব্যাহতির সুবিধা পাবে। প্রযুক্তির বিকাশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য যেমন রাউটার, হার্ডডিস্ক, প্রিন্টারে কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। কৃষির সম্প্রসারণে কৃষি পণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হবে। তবে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর সীমা বাড়ছে না। এটা অপরিবর্তিত রাখা হবে। নন-এসি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ওপর ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে করারোপ করা রয়েছে বিদ্যমান বাজেটে, আসছে বাজেটে এটি ৫ শতাংশ করা হবে।
অন্যদিকে করোনা মহামারীকালে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী উৎপাদন ও কাঁচামাল সামগ্রীর আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। এছাড়া করোনা পরীক্ষার কিটের আমদানি শুল্ক আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত রেয়াত দেওয়া আছে তা ২০২২ সালের জুন নাগাদ বাড়ানো হবে।
এছাড়া আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজারে অ-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হচ্ছে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকেও একই হারে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া একক ব্যক্তির কোম্পানির জন্য করপোরেট করে সাড়ে ৭ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। করোনার কারণে ছয় বছর পর চলতি অর্থবছর (২০২০-২১) ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর কমানো হয়েছে। একই বিবেচনায় আসছে বাজেটেও করহার কমানো হবে। বাজেটে করপোরেট কর থেকে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আসে। বিদ্যমান কর কাঠামো অনুযায়ী, করপোরেট করের স্তর রয়েছে আটটি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত কোম্পানি ৩২ দশমিক ৫, একক ব্যক্তি কোম্পানির ৩২ দশমিক ৫, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নতুন ব্যাংক ৩৭ দশমিক ৫, তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক ৪০ এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয়।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে কর ও ভ্যাট কাঠামোতে পরিবর্তন আনার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাকসিনের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। করোনা পরিস্থিতি সহসাই উত্তরণ করা সম্ভব হবে না। তবে যদি ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খুব সহজেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল করা সম্ভব হবে।’
এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় পণ্য আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিদ্যমান আগাম কর চার স্তরের পরিবর্তে ছয় স্তরে আদায় করা হবে। তবে স্থানীয় শিল্পে এআইটিতে ছাড় এলেও বিলাসী পণ্যে বাড়তি এআইটি দিতে হবে। এআইটির সর্বোচ্চ হার ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানির এআইটি বিদ্যমান ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ, সমুদ্রগামী জাহাজশিল্পের এআইটি ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। অন্যদিকে কৃষিভিত্তিক শিল্পকে উৎসাহিত করতে এ ধরনের চারটি খাতের শিল্প স্থাপনে ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গতকাল সোমবার ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপলক্ষে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, আসন্ন বাজেটে নতুন কর আরোপ না করে কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করার পদক্ষেপ নিয়ে সম্প্রসারণমূলক বাজেট করা উচিত। নীতি পরিকল্পনায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির চিন্তা থেকে বেরিয়ে বৈষম্য রোধ ও সুষম বণ্টনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
সিপিডির প্রবন্ধে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন চিত্র হতাশাজনক মনে হচ্ছে। ১০ মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে ৪২ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কম। ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৯ শতাংশ। আর স্বাস্থ্য খাতের এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩১ শতাংশ। এছাড়া ব্যক্তি খাতে ঋণ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল যেখানে ১৫ শতাংশ, প্রথম আট মাসে তা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। সম্প্রসারণমূলক বা বড় বাজেট করার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, জিডিপির তুলনায় ঋণ এখনো ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশের ঘরে রয়েছে। এখনো ঋণ করার অনেক সুযোগ রয়েছে।
প্রণোদনা বাস্তবায়নে বহুপক্ষীয় টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী বাজেটটি করতে হবে। তারা আরও বলেছে, এ সময়ে নতুন করারোপ করা কঠিন। কিন্তু বাজেট তো করতে হবে। অর্থের দরকার। ফলে এখন দরকার হচ্ছে কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং অর্থ পাচার বন্ধের দিকে নজর দেওয়া।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান অনুষ্ঠানে বাজেট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকার বলছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশ। বাস্তবে এটা দেড় শতাংশ হবে। এটা আরও বাড়াতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য বাজেটে ব্যয়ের সম্ভাব্য আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয় পরিকল্পনা এরই মধ্যে অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। বাজেটে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকতে পারে। এর মধ্যে এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে চলতি অর্থবছরের মতো ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এছাড়া এনবিআরবহির্ভূত কর ও কর-ব্যতীত সরকারের প্রাপ্তি থেকে রাজস্বের বাকি ৫৯ হাজার কোটি টাকা আসবে। ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।